নয়াদিল্লি: জাতিগণনার বর্তমান প্রশ্নপত্র বাতিল করে রাজনৈতিক দল, বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে আলোচনা করে নতুন প্রশ্নপত্র তৈরির দাবি জানালেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে এবং লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে লেখা যৌথ চিঠিতে তাঁদের অভিযোগ, বর্তমান পদ্ধতিতে নির্ভুল তথ্যের বদলে তৈরি হতে পারে বিভ্রান্তিকর পরিসংখ্যান।

২০ আগস্ট লেখা চিঠিটির বিষয়বস্তু মঙ্গলবার প্রকাশ্যে আনেন কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ। তাঁর দাবি, জাতিগণনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে এটি কংগ্রেস নেতৃত্বের তৃতীয় চিঠি। আগের দু’টির কোনওটিরই জবাব মেলেনি। কেন্দ্রের বর্তমান উদ্যোগকে কটাক্ষ করে তিনি একে জাতিগণনার নামে ‘লোকদেখানো ব্যবস্থা’ বলেও মন্তব্য করেন।

আপত্তি কোথায়?

কংগ্রেসের মূল আপত্তি জাতি-পরিচয় নথিভুক্ত করার পদ্ধতি নিয়ে। প্রস্তাবিত প্রশ্নপত্রে রয়েছে একটি ‘উন্মুক্ত প্রশ্ন’। অর্থাৎ, কোনও ব্যক্তি নিজের জাতির যে নাম বলবেন, গণনাকারী সেটিই হুবহু নথিভুক্ত করবেন।

খড়্গে ও রাহুলের যুক্তি, ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে একই জাতি নানা নামে, স্থানীয় পরিচয়ে, উপজাতীয় নামে বা ভাষাগত ভিন্নতায় পরিচিত। ফলে একই জনগোষ্ঠীর মানুষ আলাদা আলাদা নাম বললে একটি জাতিই অসংখ্য পৃথক পরিচয়ে ভাগ হয়ে যেতে পারে।

তাতে শেষ পর্যন্ত তৈরি হতে পারে লক্ষ লক্ষ আলাদা জাতিনামের তালিকা। আর সেই বিশাল ও খণ্ডিত তথ্য বাস্তবে বিশ্লেষণ বা নীতিনির্ধারণের কাজে কতটা ব্যবহারযোগ্য হবে, তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে কংগ্রেস।

ভুল সংখ্যা, ভুল নীতি?

কংগ্রেস নেতৃত্বের বক্তব্য, কোনও জনগোষ্ঠীর প্রকৃত জনসংখ্যাই যদি নির্ভুল ভাবে জানা না যায়, তবে তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার মূল্যায়নও ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, জনকল্যাণমূলক প্রকল্প, সংরক্ষণ এবং সামাজিক ন্যায়ের নীতিতে। বিশেষ করে অনগ্রসর, অতি-অনগ্রসর ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এর ফলে বঞ্চিত হতে পারে বলে আশঙ্কা দুই কংগ্রেস নেতার।

ওবিসি-র হিসাব কোথায়?

প্রস্তাবিত প্রশ্নপত্রে ‘অনগ্রসর শ্রেণি’ নামে পৃথক কোনও বিভাগ না থাকাও তাঁদের অন্যতম বড় আপত্তি। তাঁদের মতে, এর ফলে দেশে অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি বা ওবিসি জনগোষ্ঠীর প্রকৃত সংখ্যা স্পষ্ট ভাবে জানা সম্ভব হবে না।

সমাধান হিসেবে তাঁরা জাতিগুলির একটি নির্দিষ্ট ও মানসম্মত তালিকা তৈরির প্রস্তাব দিয়েছেন। উত্তরদাতাকে সেই তালিকা থেকে নিজের জাতি বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে বলে তাঁদের মত।

তফসিলি জাতি ও তফসিলি জনজাতির গণনায় ইতিমধ্যেই এই ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় বলেও চিঠিতে উল্লেখ করেছেন তাঁরা।

বিহার-তেলঙ্গানার মডেল

প্রস্তাবিত তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের সামাজিক ও শিক্ষাগত ভাবে অনগ্রসর শ্রেণির তালিকা এবং ভারতের নৃতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণের তথ্য ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছেন খড়্গে ও রাহুল।

বিহার ও তেলঙ্গানায় হওয়া জাতিভিত্তিক সমীক্ষার পদ্ধতিকেও উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন তাঁরা। ওই দুই রাজ্যে ব্যবহৃত জাতি-তালিকার প্রতিলিপিও চিঠির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়েছে।

‘এই পদ্ধতি মানা হবে না’

কংগ্রেস নেতৃত্বের অবস্থান স্পষ্ট—বর্তমান কাঠামোয় জাতিগণনা মেনে নেওয়া হবে না। তাঁদের মতে, শুধু জাতির সংখ্যা গোনা যথেষ্ট নয়; সেই তথ্য হতে হবে নির্ভুল, তুলনাযোগ্য এবং নীতিনির্ধারণের উপযোগী।

তাই বর্তমান প্রশ্নপত্র প্রত্যাহার করে রাজনৈতিক দল, বিশেষজ্ঞ এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে আলোচনা করে সর্বসম্মত একটি নতুন কাঠামো তৈরির দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

এখনও পর্যন্ত এই দাবির বিষয়ে কেন্দ্রের পক্ষ থেকে কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ফলে জাতিগণনার পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক যে আরও তীব্র হতে চলেছে, তা বলাই যায়।