বাংলাস্ফিয়ার: একের পর এক এফআইআর দায়ের নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে তিনটি মামলায় অন্তর্বর্তী সুরক্ষা দিল কলকাতা হাই কোর্ট। সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য নির্দেশ দিয়েছেন, আগামী ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত অথবা তার আগে অন্য নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতার-সহ কোনও কঠোর পদক্ষেপ করতে পারবে না পুলিশ।

শুনানিতে বিচারপতির মন্তব্য, ‘যথেষ্ট হয়েছে।’ অভিষেকের বিরুদ্ধে বারবার মামলা দায়েরের ধরন নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি জানান, এমন চলতে থাকলে আদালতের অনুমতি ছাড়া নতুন এফআইআর দায়ের করা যাবে না—এই মর্মে নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করবেন। প্রসঙ্গত, নতুন এফআইআর দায়েরের উপর এমন সামগ্রিক বিধিনিষেধ সোমবারের লিখিত আদেশে জারি করা হয়নি।

এই প্রসঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর মামলায় হাই কোর্টের অন্য বেঞ্চের দেওয়া সুরক্ষার নজির উঠে আসে। অভিষেকের আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণন একই ধরনের সুরক্ষা চান। তাঁর বক্তব্য, আগের নির্দেশে পাওয়া সুরক্ষা নিষ্ফল করতেই পরপর নতুন অভিযোগ আনা হচ্ছে। রাজনৈতিক কারণে অতীতে এমন মামলা দায়ের করা যেমন ভুল ছিল, এখনও তা ভুল—আদালতে যুক্তি দেন তিনি।

বর্তমান আবেদনটি বিষ্ণুপুর থানার দুটি এবং রবীন্দ্রনগর থানার একটি এফআইআরকে কেন্দ্র করে। অভিযোগগুলির মধ্যে রয়েছে ‘সেবাশ্রয়’ স্বাস্থ্যশিবিরে প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়াই চিকিৎসা পরিষেবা চালানো এবং চিকিৎসায় গাফিলতি। অন্য একটি অভিযোগে শিবিরের চিকিৎসক ও কর্মীদের জন্য পৈলান পার্কের একটি রিসর্টে ঘর বরাদ্দের ফলে আর্থিক ক্ষতির কথা বলা হয়েছে।

এক রোগীর পা বাদ যাওয়ার অভিযোগও আদালতের সামনে আসে। লিখিত আদেশ অনুযায়ী, সেবাশ্রয়ের চিকিৎসকদের সুপারিশে ওই রোগীর অস্ত্রোপচার হয় কলকাতা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজে। পরে অস্ত্রোপচার-পরবর্তী জটিলতায় তাঁর ডান পা বাদ দিতে হয় বলে অভিযোগ। আদালতের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ, চিকিৎসায় গাফিলতির বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন হলেও তার সঙ্গে অভিষেকের সরাসরি যোগ আপাতত স্পষ্ট নয়।

রাজ্যের তরফে পাল্টা যুক্তি দেওয়া হয়, তদন্ত এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে। অভিষেক নিজে সংশ্লিষ্ট কাজ না করলেও অধীনস্থদের মাধ্যমে তাঁর যোগসূত্র পাওয়া যেতে পারে। শিবিরে ওষুধ ও চিকিৎসা সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগের কথাও তুলে ধরা হয়। বিচারপতি প্রশ্ন তোলেন, অভিযোগগুলির সঙ্গে সাংসদের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত না হলে এই পর্যায়ে তাঁকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন কোথায়?

একই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর একাধিক অভিযোগ নিয়েও প্রশ্ন তোলে আদালত। শুনানিতে উল্লেখ করা হয়, ওই ব্যক্তি লোকসভা নির্বাচনে অভিষেকের কাছে দুবার পরাজিত হয়েছেন। অভিষেকের আইনজীবীর অভিযোগ, তাঁর মক্কেলের বিরুদ্ধে মোট ১৬টি অভিযোগের সাতটিই করেছেন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। এই ধারাবাহিকতায় আদালতের সময় বারবার ব্যয় হচ্ছে বলেও তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

তবে অন্তর্বর্তী সুরক্ষা দিলেও তদন্তে বাধা দেয়নি হাই কোর্ট। অভিষেককে তদন্তে সহযোগিতা করতে এবং তদন্তকারীদের নোটিস মেনে চলতে হবে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হাজিরা চাইলে তাঁকে অন্তত ৪৮ ঘণ্টা সময় দিয়ে নোটিস পাঠাতে হবে। সহযোগিতা না করলে রাজ্য সরকার সুরক্ষার আদেশ পরিবর্তন বা প্রত্যাহারের আবেদন জানাতে পারবে।

অভিষেকের আইনজীবী আদালতকে জানান, সুপ্রিম কোর্টের অনুমতি নিয়ে চিকিৎসার জন্য ৩ সেপ্টেম্বর বিদেশে গিয়েছেন সাংসদ। তাঁর ২২ সেপ্টেম্বর দেশে ফেরার কথা। লিখিত আদেশে সেই তারিখের পরে তাঁকে নোটিস দিতে বলা হয়েছে। ফলে বিদেশে চিকিৎসাধীন থাকার সময় হাজিরার নোটিস কার্যকর করার প্রশ্ন আপাতত উঠছে না।

মামলার পরবর্তী শুনানি ২৩ নভেম্বর। সেদিন সংশ্লিষ্ট তদন্তগুলির অগ্রগতি জানিয়ে পুলিশকে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। এর আগে অন্য দুটি আবেদনে মোট চারটি মামলাতেও অভিষেক অন্তর্বর্তী সুরক্ষা পেয়েছিলেন। সোমবারের নির্দেশে নতুন তিনটি মামলায় তাঁর সুরক্ষা বহাল থাকল; অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে তদন্ত চালিয়ে যাওয়ার সুযোগও রইল। আদালত জানিয়েছে, তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ্যে আসবে বলেই আশা করা হচ্ছে; এই পর্যায়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের প্রয়োজন নেই।