চেন্নাই: ধর্মনিরপেক্ষতা ও সামাজিক ন্যায়কে সামনে রেখে আনুষ্ঠানিক নাম পেল তামিলনাড়ুর শাসক জোট। তামিলাগা ভেট্রি কাজাগম বা টিভিকে-র নেতৃত্বাধীন এই জোটের নাম হয়েছে ‘সেকুলার সোশ্যাল জাস্টিস ভিক্টরি অ্যালায়েন্স’। বাংলায় যার অর্থ, ধর্মনিরপেক্ষ সামাজিক ন্যায় ও বিজয়ের জোট। সংক্ষেপে এসএসজেভিএ। জোটের সভাপতি হচ্ছেন টিভিকে সভাপতি তথা তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী সি. জোসেফ বিজয়।
বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর চেন্নাইয়ের পানাইয়ুরে টিভিকে-র সদর দফতরে শরিক দলের নেতাদের বৈঠকের পরে নতুন নাম ঘোষণা করা হয়। সরকার গঠনের পর শরিকদের নিয়ে এটি দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয় বৈঠক। নির্বাচনের পরে সরকার গড়তে যে বোঝাপড়া হয়েছিল, তাকে একটি স্থায়ী রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কাঠামো দেওয়ার লক্ষ্যে এই উদ্যোগ।
বৈঠকে কংগ্রেস, বিদুথালাই চিরুথাইগল কাচ্চি বা ভিসিকে, মারুমালার্চি দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কাজাগম বা এমডিএমকে এবং ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লিগের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি বি. মানিকম ঠাকুর, প্রবীণ চক্রবর্তী, থারাহাই কাথবার্ট, এমডিএমকে নেতা ভাইকো ও দুরাই ভাইকো, ভিসিকে প্রধান থোল থিরুমাভালাভান এবং মুসলিম লিগ নেতা কে. এম. কাদের মহিউদ্দিন।
বৈঠকের পরে মানিকম ঠাকুর জানান, বিজয়ের নেতৃত্বে নতুন জোট গড়ে উঠেছে। তাঁর বক্তব্য, জোটের নামেই তার আদর্শ ও কর্মসূচির পরিচয় রয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতা, সামাজিক ন্যায় এবং রাজ্যের অধিকার রক্ষার প্রশ্নে একমত দলগুলি এই মঞ্চে এসেছে। আসন্ন উপনির্বাচনে জোট একসঙ্গে লড়বে বলেও তিনি জানান। ফলে ঘোষণার সঙ্গে নির্বাচনী সমন্বয়ের বিষয়টিও সামনে এসেছে।
তবে বৈঠকে ছিল না সিপিএম ও সিপিআই। বিজয় সরকারকে সমর্থন করলেও দুই বাম দল আনুষ্ঠানিক জোটের বৈঠক থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছে। গত ১ জুলাইয়ের প্রথম আলোচনাতেও তারা যোগ দেয়নি। সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক পি. শানমুগম জানিয়েছেন, বিধানসভায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যে তাঁরা নির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক অবস্থান নিয়ে সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন করবেন।
এই অবস্থান থেকে স্পষ্ট, সরকারকে সমর্থন দেওয়া এবং বিজয়ের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোটে আনুষ্ঠানিকভাবে শামিল হওয়াকে বামেরা পৃথক বিষয় হিসেবে দেখছে। ফলে বুধবারের অনুপস্থিতিকে সমর্থন প্রত্যাহার হিসেবে ব্যাখ্যা করার অবকাশ নেই। একই সঙ্গে নতুন জোটের নাম ঘোষণা হলেও সরকারকে সমর্থনকারী সব দল যে একই সাংগঠনিক ছাতার তলায় এসেছে, তা-ও বলা যাচ্ছে না।
চলতি বছরের বিধানসভা নির্বাচনে টিভিকে একা লড়ে ১০৮টি আসন জিতে বৃহত্তম দল হয়েছিল। কিন্তু একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। সরকার গঠনের জন্য বিজয়কে অন্য দলের সমর্থন নিতে হয়। আগে ডিএমকে-র নেতৃত্বাধীন শিবিরে থাকা একাধিক দল তাঁর পাশে দাঁড়ায়। সেই নির্বাচন-পরবর্তী সমীকরণকে এবার নিজস্ব নাম ও নেতৃত্বের মাধ্যমে সুসংহত করার চেষ্টা হচ্ছে।
সমন্বয় বৈঠকের আলোচ্য বিষয়গুলির মধ্যে ছিল অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচি, যৌথ পরিচালন সমিতি এবং জোটের স্বতন্ত্র পরিচয়। তবে নাম ও নেতৃত্ব ঘোষণার পাশাপাশি এই সমস্ত সাংগঠনিক প্রস্তাব চূড়ান্ত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যাবে না। শরিকদের পারস্পরিক সম্পর্ক, নীতিগত অগ্রাধিকার এবং সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নির্ধারণই এই প্রক্রিয়ার পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
এর মধ্যেই জাতীয় রাজনীতির নেতৃত্ব নিয়ে টিভিকে ও কংগ্রেসের মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে। টিভিকে-র কয়েকজন বিধায়ক ও মন্ত্রী ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজয়কে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে তুলে ধরেছেন। কংগ্রেস তার বিরোধিতা করে রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বের কথা বলেছে। টিভিকে নেতৃত্ব পরে জানিয়েছে, বিজয়কে নিয়ে ওই মন্তব্যগুলি সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের ব্যক্তিগত মত।
নতুন নাম তাই বিজয়ের নেতৃত্বে শরিকদের ঐক্যের একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। কিন্তু বামেদের দূরত্ব এবং জাতীয় নেতৃত্ব নিয়ে কংগ্রেসের সঙ্গে মতভেদও রয়ে গেল। আসন্ন উপনির্বাচনে প্রার্থী নির্বাচন, প্রচার ও পারস্পরিক সহযোগিতায় এই ঐক্য কতটা কার্যকর হয়, সেদিকেই এখন নজর থাকবে। নামকরণের পরে জোটের রাজনৈতিক সংহতি ও সরকারি কাজের সমন্বয়, দুই ক্ষেত্রেই পরীক্ষার মুখে পড়বেন বিজয়।