বাংলাস্ফিয়ার: দক্ষিণ-পশ্চিম দিল্লির সত্য নিকেতনে রবিবার দুপুরে ছেলেদের পাঁচতলা বেসরকারি ছাত্রাবাসটি ভেঙে পড়ার কয়েক ঘণ্টা আগেই বিপদের আশঙ্কা জানিয়েছিলেন এক শ্রমিক। অভিযোগ, ছাত্রাবাসের পরিচালনাকারীকে ফোন করে তিনি বলেছিলেন, চলতে থাকা নির্মাণকাজের জেরে বাড়িটির একটি দেওয়াল ভেঙে পড়তে পারে। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ এই তথ্য জানতে পেরেছে। ওই নির্মাণকাজের ফলে বাড়িটির কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছিল বলে মনে করা হচ্ছে।
বুধবার গ্রেফতার হওয়া ছাত্রাবাসের পরিচালনাকারী সুধাংশু জিজ্ঞাসাবাদের সময় পুলিশকে জানিয়েছেন, তিনিও বাড়ির মালিকের ছেলে মহেশকে সংস্কারের কাজ এগিয়ে না নিয়ে যাওয়ার জন্য সতর্ক করেছিলেন।
সুধাংশুর দাবি, অতিরিক্ত তলাগুলির ভার বহন করার মতো ভিত বাড়িটির নেই—এ কথাও তিনি জানিয়েছিলেন।
এক পুলিশ আধিকারিক বলেন, “নির্মাণকাজ কখন কী ভাবে হয়েছে, তার বিস্তারিত তথ্য জানার চেষ্টা করছি আমরা। বাড়িটি কী ভাবে তৈরি হয়েছিল এবং নির্মাণের সময় কোনও পরিদর্শন হয়েছিল কি না, তা প্রতিবেশীদের কাছেও জানতে চাওয়া হচ্ছে।”
ঘটনাক্রম পুনর্গঠনের জন্য বৃহস্পতিবার ধসে পড়া বাড়িটির আশপাশের বেশ কয়েক জন বাসিন্দাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। এই ঘটনায় পাঁচ পড়ুয়া-সহ সাত জনের মৃত্যু হয়েছে।
সত্য নিকেতনে ‘হস্টেল ডেজ’ সংস্থা পরিচালিত সাতটি বেসরকারি ছাত্রাবাসই পরিদর্শন করেছে দিল্লি পুরনিগম। কোথায় কোথায় নিয়ম ভাঙা হয়ে থাকতে পারে, তা নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করছেন আধিকারিকেরা। সূত্রের বক্তব্য, সংস্থাটির অধিকাংশ ছাত্রাবাসেই কিছু নিয়মের লঙ্ঘন স্পষ্ট চোখে পড়ছে। বিশেষ করে, ঢোকা ও বেরোনোর জন্য একটিমাত্র পথ থাকার বিষয়টি নজরে এসেছে।
বৃহস্পতিবার ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রতিনিধি ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেন, একটি মেট্রো স্টেশনের ঠিক উল্টো দিকের ছাত্রাবাস খালি পড়ে রয়েছে। সেখানকার এক কর্মী বলেন, “ওই বাড়িটি যে দিন ভেঙে পড়ল, সে দিনই সব পড়ুয়া চলে গিয়েছেন। তবে এই বাড়িটি সিল করা হয়নি।”
ধসে পড়া বাড়িটি থেকে মাত্র ১০০ মিটার দূরের একটি চারতলা ছাত্রীনিবাসে থাকেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের এক ছাত্রী। তাঁর কথায়, “আগুন লাগলে পালানোর জায়গাটুকুও থাকবে না। এখানে উঠেছিলাম, কারণ এই জায়গাটিতেই শুধু মোটামুটি ভাল খাবার পাওয়া যেত। আজ পুরনিগমের আধিকারিক এসে গোটা বাড়ি সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়েছেন। তবে সুধাংশু গ্রেফতার হওয়ায় আমরা খুশি। উনি খুব দুর্ব্যবহার করতেন।”
রবিবার পাঁচতলা বাড়িটি ভেঙে পড়ার পরে যাঁরা সেখানে ছুটে এসেছিলেন, তাঁদের মধ্যে সুধাংশুও ছিলেন। কিন্তু ঘটনাস্থলে উপস্থিত পড়ুয়ারা—যাঁদের অধিকাংশই দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের—তাঁকে চিনতে শুরু করায় তিনি মারধরের আশঙ্কায় সরে পড়েন। বৃহস্পতিবার ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এ এই খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
বুধবার বুরারিতে এক বন্ধুর বাড়িতে তাঁর সন্ধান পেয়ে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের হংসরাজ কলেজের স্নাতক সুধাংশু ২০২২ সালে বেসরকারি ছাত্রাবাসের ব্যবসা শুরু করেন। মূলত নিজের প্রাক্তন কলেজের পড়ুয়াদের থাকার ব্যবস্থা করতেন তিনি।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ভেঙে পড়া ৫০ বছরের পুরনো বাড়িটিতে প্রয়োজনীয় সুযোগসুবিধা-সহ ১৬ শয্যার আবাসন গড়ে তোলার দায়িত্বে ছিলেন সুধাংশু। রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় মেরামতি ও নির্মাণকাজের দেখভালও করতেন তিনি। ঘর খুঁজতে আসা সম্ভাব্য আবাসিকেরা মূলত তাঁর সঙ্গেই কথা বলতেন।
সূত্রের আরও বক্তব্য, বাড়িটির অবস্থা খারাপ হওয়ায় সেটি প্রচলিত বাজারদরের তুলনায় কম ভাড়ায় পাওয়া যাচ্ছিল। সেই কারণেই বাড়িটি ভাড়া নিয়েছিলেন সুধাংশু।
এই মামলায় বাড়ির মালিক হরিরাম, তাঁর ছেলে মহেশ, স্ত্রী উর্মিলা এবং শ্রমিক ঠিকাদার সরোজকে আগেই গ্রেফতার করা হয়েছে।
এক উচ্চপদস্থ পুলিশ আধিকারিক বলেন, “অভিযোগ, অতিরিক্ত চারটি তলার ভার বাড়িটি বহন করতে পারবে না, তা মালিকেরা জানতেন। তা সত্ত্বেও তাঁরা নির্মাণের অনুমতি দেন এবং গত বছর বাড়িটি একটি বেসরকারি ছাত্রাবাস পরিচালনাকারী সংস্থাকে ইজারা দেন।”