গান্ধীনগর: ‘বন্দে মাতরম্’ পরিবেশনের মাঝপথে বসে পড়ায় গুজরাতের কংগ্রেস বিধায়ক ইমরান খেড়াওয়ালার ক্ষমাপ্রার্থনা দাবি করল বিজেপি। বুধবার রাজ্য বিধানসভার তিন দিনের বর্ষাকালীন অধিবেশনের সূচনায় ঘটনাটি ঘটে। শাসকদলের অভিযোগ, বিধায়কের আচরণে জাতীয় স্তোত্র এবং বিধানসভার দীর্ঘদিনের প্রথার অবমাননা হয়েছে। খেড়াওয়ালা অবশ্য অসম্মানের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছেন, প্রচলিত অংশের সময় তিনি দাঁড়িয়েছিলেন; পরবর্তী স্তবকগুলি শুরু হলে বসেন।

আমদাবাদের জামালপুর-খাড়িয়া কেন্দ্রের প্রতিনিধি খেড়াওয়ালা গুজরাত বিধানসভার একমাত্র মুসলিম বিধায়ক। অধিবেশনের শুরুতে ‘বন্দে মাতরম্’ পরিবেশনের সময় প্রথমে তিনি অন্য সদস্যদের সঙ্গে উঠে দাঁড়ান। পরে নিজের আসনে বসে পড়েন। অন্য কংগ্রেস বিধায়কেরা তখনও দাঁড়িয়ে ছিলেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই শাসক ও বিরোধী দলের মধ্যে বিতর্ক শুরু হয়।

রাজ্যের প্রতিমন্ত্রী প্রবীণ মালি বলেন, বিধানসভার অধিবেশন জাতীয় স্তোত্র দিয়ে শুরু করার রীতি বহু বছরের। তাঁর অভিযোগ, খেড়াওয়ালা প্রথমে দাঁড়িয়েও কিছুক্ষণের মধ্যে বসে পড়ে সেই প্রথার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করেছেন। মন্ত্রীর বক্তব্য, মাতৃভূমিকে প্রণাম জানানোর এই গানের অসম্মান দেশের অসম্মানেরই সমান। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকেও ঘটনার নিন্দা করেন তিনি।

মালি কংগ্রেস নেতৃত্বের কাছে জানতে চান, এটি কি সংশ্লিষ্ট বিধায়কের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, নাকি দলের আনুষ্ঠানিক অবস্থান? তাঁর দাবি, কংগ্রেসকে বিষয়টি স্পষ্ট করতে হবে। ভুল করে বসে থাকুন বা সচেতন সিদ্ধান্তেই বসুন, খেড়াওয়ালার দেশের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন মন্ত্রী।

পাল্টা ব্যাখ্যায় খেড়াওয়ালা জানান, ১৯৩৭ সাল থেকে যে অংশগুলি গাওয়ার প্রচলন রয়েছে, তার প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা অটুট। ভবিষ্যতেও ওই অংশগুলির সময় তিনি উঠে দাঁড়াবেন। তাঁর দাবি, পরিবেশনায় যে অতিরিক্ত স্তবকগুলি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, সেগুলি শুরু হওয়ার পরেই তিনি বসে পড়েছিলেন। অর্থাৎ, গোটা গান চলাকালীন তিনি বসেছিলেন—এই বক্তব্য তিনি মানছেন না।

বিধায়ক আরও জানান, বসে পড়া তাঁর ব্যক্তিগত অবস্থান। বিজেপি এবং কংগ্রেসের আদর্শ আলাদা; তিনি কংগ্রেসের আদর্শেই বিশ্বাসী। নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, তাঁর উপাসনা ঈশ্বরের উদ্দেশে, কিন্তু ভালবাসা দেশের প্রতি। বিজেপির কারও দেশপ্রেমের শংসাপত্র দেওয়ার অধিকার নেই বলেও মন্তব্য করেন খেড়াওয়ালা। তাঁর বক্তব্যে ধর্মবিশ্বাস এবং দেশের প্রতি আনুগত্যের মধ্যে কোনও বিরোধের কথা স্বীকার করা হয়নি।

এই বিতর্কের পটভূমিতে রয়েছে কংগ্রেসের সিদ্ধান্তও: অনুষ্ঠানে ১৯৩৭ সালের অবস্থান অনুসরণ করে ‘বন্দে মাতরম্’-এর প্রথম দুটি স্তবকই গাওয়ার পক্ষে দল

বিধানসভায় কংগ্রেসের মুখ্যসচেতক কিরীট পটেলও দলীয় বিধায়কের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তিনি জানান, খেড়াওয়ালা তাঁর ঠিক পিছনেই ছিলেন এবং গান শুরু হলে দাঁড়িয়েছিলেন। তবে গান শেষ হওয়ার এক বা দুই মিনিট আগে তিনি বসেছিলেন কি না, তা পটেল নিশ্চিত করে বলতে পারেননি। তাঁর অভিযোগ, ঘটনাটিকে এমনভাবে তুলে ধরা হচ্ছে যেন খেড়াওয়ালা একবারও উঠে দাঁড়াননি।

পটেলের আরও অভিযোগ, কংগ্রেসের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে বিজেপির একাংশ নিয়মিত এমন অভিযোগ তোলে। ফলে শাসকদলের বক্তব্যের সঙ্গে বিরোধীদের ব্যাখ্যার ফারাক স্পষ্ট: প্রথমে দাঁড়ানোর বিষয়টি উভয় পক্ষই বলছে, মতভেদ তৈরি হয়েছে পরে বসে পড়ার তাৎপর্য নিয়ে।

বিজেপি বিষয়টি বিধানসভার অধ্যক্ষ শঙ্কর চৌধুরীর কাছে তুলে ধরে ব্যবস্থা চাওয়ার কথা জানিয়েছে। মালি বলেন, প্রশ্নোত্তর পর্ব জনস্বার্থের প্রশ্ন তোলার জন্য নির্ধারিত থাকায় তখন বিষয়টি উত্থাপন করা হয়নি। আলাদা প্রতিনিধিদল অধ্যক্ষের সঙ্গে দেখা করবে।

এদিকে অধিবেশনের শুরুতে কৃষকদের দুরবস্থা, ফসলের ক্ষতি এবং মূল্যবৃদ্ধি নিয়েও সরব হয় বিরোধীরা। কংগ্রেস বিধায়কেরা গান্ধীনগরে বিক্ষোভ দেখান। আম আদমি পার্টির প্রতিনিধিরাও ক্ষতিগ্রস্ত ফসল নিয়ে কৃষিসংকটের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এই আবহেই জাতীয় স্তোত্র ঘিরে বিতর্ক রাজনৈতিক সংঘাতের নতুন বিষয় হয়ে ওঠে। পরে সম্প্রতি প্রয়াত পাঁচ প্রাক্তন বিধায়ককে শ্রদ্ধা জানানোর পর সভার কাজ মুলতুবি হয়।