দিল্লির যন্তর মন্তরে পুলিশি ধরপাকড়, আর মুম্বইয়ে বিক্ষোভকারীদের প্রতি সংযম—নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে আন্দোলনের আবহে একই দলের দুই শহরে দুই নীতি কেন? ঠাকরে ভাইয়েরা থেকে ককরোচ জনতা পার্টি, একের পর এক বিক্ষোভে রাস্তায় নামলেও মহারাষ্ট্রে পুলিশকে মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ না করার নির্দেশ দিয়েছে দেবেন্দ্র ফডণবীস সরকার। একই সঙ্গে বিজেপির অন্দরেই স্বীকারোক্তি, নির্বাচন কমিশন ইস্যুতে আপাতত অনেকটাই একা হয়ে পড়েছে দল।

মহারাষ্ট্রে স্বরাষ্ট্র দফতরও মুখ্যমন্ত্রী ফডণবীসের হাতেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা তাঁর সরাসরি দায়িত্ব। তাই শুক্রবার শিবাজি পার্কে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) বিক্ষোভ হোক বা রবিবার ঠাকরে দুই ভাইয়ের সমাবেশ—কোনও ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। পুলিশের শীর্ষকর্তাদের স্পষ্ট নির্দেশ, অপ্রীতিকর ঘটনা এড়িয়ে জমায়েতগুলি যাতে শান্তিপূর্ণ ভাবে শেষ হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

কেন এই সতর্কতা? নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিজেপির এক প্রবীণ নেতা মনে করিয়ে দিয়েছেন ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরের মরাঠা সংরক্ষণ আন্দোলনের কথা। আন্দোলনকারীদের উপর পুলিশের লাঠিচার্জ নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সেই সময় একনাথ শিন্ডে সরকারের উপমুখ্যমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন ফডণবীস। ঘটনার পর তাঁকে প্রকাশ্যে ক্ষমাও চাইতে হয়েছিল।

ওই বিজেপি নেতার কথায়, “ফডণবীস জানেন, মহারাষ্ট্রে ভুল করার ঝুঁকি তিনি নিতে পারেন না।”

শুক্রবার শিবাজি পার্কে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের মন্তব্যেও মুম্বই ও দিল্লির পুলিশি আচরণের ফারাক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মুম্বই পুলিশকে দেশের অন্যতম সেরা বাহিনী বলে প্রশংসা করে তিনি বলেন, “মুম্বই পুলিশ কী মিষ্টি!”

ফডণবীসও আগেই জানিয়েছিলেন, “গণতন্ত্রে প্রত্যেকের নিজের মত প্রকাশের অধিকার রয়েছে। পরিস্থিতি বুঝে পুলিশ সিদ্ধান্ত নেবে।” যদিও মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে বিরোধীদের অভিযোগ এবং সিজেপির আক্রমণ সরাসরি খারিজ করেছেন তিনি। তাঁর দাবি, এই অভিযোগগুলির কোনও ভিত্তি নেই।

তবে শুধু রাস্তায় পুলিশি নিয়ন্ত্রণ নয়, রাজনৈতিক ময়দানেও কৌশল বদলাচ্ছে বিজেপি। বিরোধীদের একের পর এক বিক্ষোভের জবাব দিতে পাল্টা রাস্তায় নামার বদলে সভা, জনসমক্ষে আলোচনা এবং সংবাদমাধ্যমকে ব্যবহার করেই নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরতে চাইছে দল।

এই সপ্তাহে রাজ্য বিজেপির একটি বৈঠকে সভাপতি রবীন্দ্র চহ্বাণ মন্ত্রী-সহ প্রায় আধ ডজন নেতাকে নিয়মিত সংবাদমাধ্যমের সামনে দলের হয়ে কথা বলার দায়িত্ব দিয়েছেন। লক্ষ্য স্পষ্ট—বিরোধীদের প্রতিটি অভিযোগের দ্রুত পাল্টা জবাব। ব্যক্তিগত ভাবে বিচ্ছিন্ন প্রতিক্রিয়ার বদলে দলের হয়ে সমন্বিত বার্তা দেওয়ার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রী আশিস শেলারকে আরও ঘন ঘন সাংবাদিক বৈঠক করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তালিকায় রয়েছেন সঞ্জয় কুটে, প্রবীণ দারেকর, চিত্রা ওয়াঘ, দেবযানী ফারান্দে, নিরঞ্জন ডাভখারে, বিক্রম পাচপুতে, নবনাথ বান এবং মন্ত্রী নীতেশ রানে।

সংখ্যার বিচারে অবশ্য মহারাষ্ট্রে বিজেপির নেতৃত্বাধীন সরকারের বড় কোনও তাত্ক্ষণিক বিপদ নেই। ২৩০ জন বিধায়কের সমর্থন রয়েছে সরকারের। কিন্তু নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে পর পর বিক্ষোভে যে সরকার-বিরোধী আবহ তৈরি হচ্ছে, সেটিই এখন দলের উদ্বেগের কারণ।

আর সেখানেই উঠে আসছে বিজেপির অন্দরের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ স্বীকারোক্তি। দলের এক প্রবীণ মন্ত্রীর কথায়, “এই লড়াইয়ে বিজেপি একা। নির্বাচন কমিশনের অপব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলে গোটা বিরোধী শিবির আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। আমাদের জোটসঙ্গী শিবসেনা এবং এনসিপি স্পষ্টতই এই বিষয়টি থেকে দূরে রয়েছে।”

অর্থাৎ দিল্লিতে যেখানে পুলিশের কঠোরতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, মুম্বইয়ে সেখানে সংযমই এখন বিজেপির কৌশল। কারণ রাস্তায় বিক্ষোভ থামানো যতটা সহজ, তার রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সামলানো হয়তো ততটা নয়।