বাংলাস্ফিয়ার: ভারতে চালু হল অ্যাপল পে। এই পরিষেবার মাধ্যমে আইফোন, আইপ্যাড ও অ্যাপল ওয়াচ ব্যবহার করে টাকা মেটাতে পারবেন গ্রাহকেরা। শীঘ্রই ম্যাকেও এই সুবিধা চালু হওয়ার কথা।

প্রথম পর্যায়ে অ্যাক্সিস ব্যাঙ্কের ইস্যু করা ভিসা ও মাস্টারকার্ড ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহকেরা তাঁদের কার্ড অ্যাপল পে-তে যুক্ত করতে পারবেন। দেশের দোকানপাট ও অনলাইন বিপণিতে এই পরিষেবা ব্যবহার করা যাবে। পাশাপাশি, যেখানে নিয়ার ফিল্ড কমিউনিকেশন বা এনএফসি প্রযুক্তিতে লেনদেন গ্রহণ করা হয়, সেখানেও এর মাধ্যমে টাকা মেটানো যাবে।

অ্যাপল জানিয়েছে, দোকানে, অ্যাপে কিংবা ওয়েবসাইটে কেনাকাটার দাম মেটানোর সময় গ্রাহকদের পিন লিখতে হবে না বা একবার ব্যবহারযোগ্য পাসওয়ার্ড—ওটিপি—দিতে হবে না।

অ্যাপল পে ও অ্যাপল ওয়ালেটের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেনিফার বেইলি বলেন, “ভারতের কর্মচঞ্চল ও ডিজিটাল প্রযুক্তিতে অভ্যস্ত মানুষ ক্রমশ নগদবিহীন ভবিষ্যৎকে গ্রহণ করছেন। একই সঙ্গে নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার সর্বোচ্চ মানও প্রত্যাশা করছেন তাঁরা। আজ ভারতের ব্যবহারকারীদের কাছে অ্যাপল পে পৌঁছে দিতে পেরে আমরা অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত।”

বেইলি জানান, অ্যাপল পে ব্যবহার করে দোকানে টাকা মেটাতে আলাদা কোনও অ্যাপ, পিন বা ওটিপির প্রয়োজন হয় না। যন্ত্রটি পেমেন্ট রিডারের কাছে ধরলেই লেনদেন করা যায়। অনলাইনে কেনাকাটার সময়ও বারবার অর্থপ্রদানের তথ্য লিখতে হয় না।

অ্যাক্সিস ব্যাঙ্কের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও প্রধান কার্যনির্বাহী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, অ্যাপল পে চালু হওয়ায় মাস্টারকার্ড ও ভিসা নেটওয়ার্কের আওতায় ব্যাঙ্কের ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকদের অর্থপ্রদানের বিকল্প এবং সুবিধা আরও বাড়বে।

কী ভাবে অ্যাপল পে চালু ও ব্যবহার করবেন?

অ্যাক্সিস ব্যাঙ্কের অ্যাপের সর্বশেষ সংস্করণের মাধ্যমে গ্রাহকেরা তাঁদের যোগ্য কার্ড অ্যাপল ওয়ালেটে যুক্ত করতে পারবেন। এ ছাড়া আইফোনে ওয়ালেট অ্যাপ খুলে যোগ চিহ্নে ট্যাপ করে পরবর্তী নির্দেশগুলি অনুসরণ করেও কার্ড যুক্ত করা যাবে।

দোকানে টাকা মেটানোর জন্য ব্যবহারকারীকে সাইড বাটন বা হোম বাটনে পরপর দু’বার চাপ দিতে হবে। প্রয়োজন হলে ফেস আইডি, টাচ আইডি কিংবা যন্ত্রের পাসকোড দিয়ে পরিচয় যাচাই করতে হবে। তার পরে আইফোন বা অ্যাপল ওয়াচ স্পর্শহীন লেনদেনের রিডারের কাছে ধরলেই হবে।

ওয়াই-ফাই কিংবা মোবাইল নেটওয়ার্কের সংযোগ ছাড়াও আইফোন বা অ্যাপল ওয়াচের মাধ্যমে দোকানে অ্যাপল পে ব্যবহার করা যাবে। যন্ত্রের এনএফসি চিপ পেমেন্ট টার্মিনালের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে। তবে যন্ত্রটি ফের ইন্টারনেট বা মোবাইল নেটওয়ার্কে যুক্ত না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কেনাকাটার তথ্য লেনদেনের তালিকায় না-ও দেখা যেতে পারে।

আইফোন ও আইপ্যাডে অ্যাপের ভিতরে কিংবা ওয়েবসাইটেও অ্যাপল পে দিয়ে কেনাকাটা করা যাবে। ম্যাকের জন্য এই সুবিধা শীঘ্রই চালু হওয়ার কথা।

যেসব বিক্রেতা এই সুবিধা গ্রহণ করেন, তাঁদের ওয়েবসাইটে অন্য সংস্থার ব্রাউজার ব্যবহার করেও অ্যাপল পে-তে টাকা মেটানো যাবে। অর্থপ্রদানের সময় অ্যাপল পে বেছে নিয়ে আইফোন দিয়ে একটি কিউআর কোড স্ক্যান করতে হবে। তার পরে অর্থপ্রদান ও অর্ডারের বিবরণ দেখে কেনাকাটা নিশ্চিত করা যাবে।

অ্যাপল পে ব্যবহার করলেও সংশ্লিষ্ট কার্ডের রিওয়ার্ড ও অন্যান্য সুবিধা আগের মতোই পাবেন গ্রাহকেরা।

লেনদেনের নিরাপত্তা কী ভাবে নিশ্চিত করে অ্যাপল পে?

অ্যাপল জানিয়েছে, কার্ডের প্রকৃত নম্বর ব্যবহারকারীর যন্ত্রে বা সংস্থার সার্ভারে সংরক্ষণ করা হয় না। সংস্থাটি সেই নম্বর বিক্রেতাদের সঙ্গেও ভাগ করে না।

তার পরিবর্তে একটি স্বতন্ত্র ‘ডিভাইস অ্যাকাউন্ট নম্বর’ বরাদ্দ করা হয়। সেটি এনক্রিপ্ট করে যন্ত্রের ‘সিকিওর এলিমেন্ট’-এ রাখা হয়। অর্থপ্রদানের তথ্য সুরক্ষিত ভাবে সংরক্ষণের জন্য তৈরি এই চিপটি নিরাপত্তার স্বীকৃত মান অনুযায়ী প্রত্যয়িত।

ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ায় মাস্টারকার্ডের প্রেসিডেন্ট গৌতম আগরওয়াল বলেন, অ্যাপল পে-র লেনদেন মাস্টারকার্ডের টোকেনাইজেশন প্রযুক্তির মাধ্যমে সুরক্ষিত থাকে। প্রতিটি লেনদেনে একটি স্বতন্ত্র, ক্রিপ্টোগ্রাফির মাধ্যমে সুরক্ষিত টোকেন ব্যবহার করা হয়।

ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ায় ভিসার গ্রুপ কান্ট্রি ম্যানেজার সুরেশ শেঠি বলেন, এই পরিষেবায় অ্যাপলের গ্রাহক-অভিজ্ঞতার সঙ্গে ভিসার নেটওয়ার্ক ও টোকেনাইজেশন প্রযুক্তির সক্ষমতা যুক্ত হয়েছে।

দোকানে, অনলাইনে কিংবা অ্যাপে অ্যাপল পে ব্যবহার করে কেনাকাটার জন্য অ্যাপল গ্রাহকদের কাছ থেকে কোনও ফি নেয় না। তবে কার্ড ইস্যুকারী সংস্থা তাদের প্রচলিত চার্জ বা ফি নিতে পারে। ব্যবহারকারী কত বার লেনদেন করতে পারবেন, তারও কোনও সীমা নির্ধারণ করে না অ্যাপল পে।

চালুর সময় থেকেই ভারতের লক্ষ লক্ষ ব্যবসায়ীর কাছে অ্যাপল পে গ্রহণ করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে অ্যাপল স্টোর, ব্লিঙ্কিট, চায়োস, কমেট, ক্রোমা, ইন্টারফ্লোরা, ইক্সিগো, ল্য১৫ প্যাটিসেরি, রিলায়েন্সের ব্র্যান্ডগুলি, টাটা ১এমজি এবং জোম্যাটো।

ভারতে আরও বেশি ব্যবসায়ীর কাছে এই পরিষেবা পৌঁছে দিতে ক্যাশফ্রি, জাসপে, এমসোয়াইপ, পেটিএম, পেইউ, পাইন ল্যাবস, রেজরপে ও ওয়ার্ল্ডলাইনের মতো পেমেন্ট পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থার সঙ্গেও কাজ করেছে অ্যাপল।

বিদেশেও যেখানে স্পর্শহীন লেনদেন গ্রহণ করা হয়, সেখানে অ্যাপল পে ব্যবহার করা যাবে। তবে তা নির্ভর করবে ব্যবহারকারীর ব্যাঙ্ক এই সুবিধা অনুমোদন করে কি না, তার উপরে। বিদেশে ব্যবহারের জন্য ব্যাঙ্কের প্রযোজ্য ফি-ও দিতে হতে পারে।

বর্তমানে ৯০টিরও বেশি দেশ ও অঞ্চলে অ্যাপল পে পাওয়া যায়। বিশ্বজুড়ে ১১ হাজারেরও বেশি ব্যাঙ্ক ও পেমেন্ট নেটওয়ার্কের সহযোগিতায় পরিষেবাটি চলে।

এই পরিষেবা ব্যবহারের জন্য আইওএস ১৮ বা তার পরবর্তী সংস্করণে চলা আইফোন এক্সআর কিংবা তার পরবর্তী মডেল প্রয়োজন। ওয়াচওএস ১১ বা পরবর্তী সংস্করণে চলা অ্যাপল ওয়াচ সিরিজ ৬ কিংবা তার পরবর্তী মডেলেও পরিষেবাটি পাওয়া যাবে। সে ক্ষেত্রে ঘড়িটিকে আইফোন এক্সআর বা তার পরবর্তী কোনও মডেলের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে।