লগইনসদস্যতালেখক
হোম›ভারত›বারুইপুর-কাণ্ডের অভিঘাত: ‘জিরো এফআইআর’ হস্তান্তরে কড়া কলকাতা পুলিশ, জবাবদিহির আওতায় ওসি
ভারত

বারুইপুর-কাণ্ডের অভিঘাত: ‘জিরো এফআইআর’ হস্তান্তরে কড়া কলকাতা পুলিশ, জবাবদিহির আওতায় ওসি

বাংলাস্ফিয়ার: বারুইপুরের বহুচর্চিত ধর্ষণ ও খুনের মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ‘জিরো এফআইআর’ (Zero FIR) সংক্রান্ত প্রক্রিয়া আরও কঠোর করল কলকাতা পুলিশ। নতুন স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) জারি করে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে,…

বারুইপুর-কাণ্ডের অভিঘাত: ‘জিরো এফআইআর’ হস্তান্তরে কড়া কলকাতা পুলিশ, জবাবদিহির আওতায় ওসি

বাংলাস্ফিয়ার: বারুইপুরের বহুচর্চিত ধর্ষণ ও খুনের মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ‘জিরো এফআইআর’ (Zero FIR) সংক্রান্ত প্রক্রিয়া আরও কঠোর করল কলকাতা পুলিশ। নতুন স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) জারি করে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, যে থানায় প্রথম অভিযোগ দায়ের হবে, সেই থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক (ওসি) তদন্তের দায়িত্ব অন্য থানায় বা অন্য পুলিশ কমিশনারেটের হাতে তুলে দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়ার জন্য ব্যক্তিগতভাবে জবাবদিহি করবেন।

পুলিশ সূত্রে খবর, এতদিন বহু ক্ষেত্রে অভিযোগ নথিভুক্ত হলেও সংশ্লিষ্ট থানায় তা দ্রুত পৌঁছত না। ফলে তদন্তে বিলম্ব, প্রমাণ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা এবং অভিযোগকারীদের হয়রানির অভিযোগ উঠত। নতুন নির্দেশিকায় এই সমস্যার সমাধানেই জোর দেওয়া হয়েছে।

‘জিরো এফআইআর’-এর মূল উদ্দেশ্য হল, অপরাধ যেখানে ঘটুক না কেন, যে কোনও থানায় অবিলম্বে অভিযোগ দায়ের করা যাবে। পরে ঘটনাস্থলের অধিক্ষেত্র অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট থানায় তদন্ত স্থানান্তরিত হবে। কিন্তু বাস্তবে এই স্থানান্তর প্রক্রিয়াতেই নানা জটিলতা তৈরি হচ্ছিল। অনেক সময় অভিযোগকারীকে এক থানা থেকে অন্য থানায় ঘুরতে হত। আবার কোথাও নথি বা প্রাথমিক প্রমাণ পৌঁছতে দেরি হওয়ায় তদন্তের গতি কমে যেত।

নতুন এসওপি অনুযায়ী, শুধু এফআইআরের কপি পাঠালেই দায়িত্ব শেষ হবে না। অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত সমস্ত নথি, সিসিটিভি ফুটেজ, ভিডিও, ছবি, ডিজিটাল তথ্য, সাক্ষীর প্রাথমিক বয়ান, বাজেয়াপ্ত সামগ্রী এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্যও নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে তদন্তকারী থানার হাতে তুলে দিতে হবে। এই হস্তান্তরের প্রতিটি ধাপ নথিভুক্ত রাখতে হবে এবং তার রেকর্ড সংরক্ষণ করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হল, এই পুরো প্রক্রিয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট থানার ওসিকেই সরাসরি দায়বদ্ধ করা হয়েছে। কোনও কারণে তদন্ত হস্তান্তরে দেরি হলে বা নথিপত্র অসম্পূর্ণ থাকলে তার ব্যাখ্যা দিতে হবে ওসিকে। প্রয়োজনে বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে।

পুলিশের একাংশের মতে, এই পদক্ষেপের ফলে থানাগুলির মধ্যে সমন্বয় বাড়বে। বিশেষ করে নারী ও শিশু নির্যাতন, যৌন অপরাধ বা আন্তঃজেলা অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত তদন্ত শুরু করা সহজ হবে। কারণ অভিযোগকারীর প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত নিরাপদে অভিযোগ জানানো, থানার সীমানা নিয়ে বিতর্ক নয়।

বারুইপুর-কাণ্ডের তদন্ত চলাকালীন বিভিন্ন স্তরে সমন্বয়ের ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। অভিযোগের প্রাথমিক পর্যায়ে তথ্য আদান-প্রদান, তদন্তের দায়িত্ব হস্তান্তর এবং প্রশাসনিক যোগাযোগ নিয়ে সমালোচনাও হয়। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই কলকাতা পুলিশ প্রক্রিয়াগত সংস্কারে জোর দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

পুলিশের শীর্ষকর্তাদের বক্তব্য, জিরো এফআইআর শুধু একটি আইনি বিধান নয়, এটি ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক পুলিশি ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অভিযোগ গ্রহণে অনীহা বা অধিক্ষেত্রের অজুহাতে অভিযোগকারীকে ফিরিয়ে দেওয়ার কোনও সুযোগ নেই। বরং প্রথম থানার দায়িত্ব হল অবিলম্বে মামলা নথিভুক্ত করা এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে তদন্তকারী সংস্থার হাতে তা পৌঁছে দেওয়া।

নতুন নির্দেশিকায় প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সম্ভব হলে ডিজিটাল মাধ্যমে নথি দ্রুত পাঠানোর পাশাপাশি মূল নথি ও বাজেয়াপ্ত সামগ্রী নির্ধারিত পদ্ধতিতে হস্তান্তর করতে বলা হয়েছে। এতে তদন্তের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে এবং আদালতে প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন কম উঠবে বলে পুলিশের আশা।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায় এবং কেন্দ্রের নির্দেশিকা অনুযায়ী জিরো এফআইআর-এর ধারণা বহুদিন ধরেই কার্যকর। কিন্তু বাস্তব সমস্যার জায়গা ছিল তার বাস্তবায়ন। ফলে দায়িত্ব নির্দিষ্ট করে দেওয়া হলে জবাবদিহি যেমন বাড়বে, তেমনই অভিযোগকারীদের ভোগান্তিও কমতে পারে।

বিশেষ করে যৌন নির্যাতন, নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধ, পাচার, সাইবার প্রতারণা বা ভিনজেলায় সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এসব ঘটনায় সময় নষ্ট হলে প্রমাণ সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ে এবং অপরাধীদের পালানোর সুযোগ বেড়ে যায়।

কলকাতা পুলিশের আশা, নতুন এসওপি কার্যকর হলে থানার সীমা নিয়ে প্রশাসনিক জটিলতা অনেকটাই কমবে। অভিযোগ দায়ের থেকে তদন্ত শুরু পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ আরও দ্রুত, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক হবে। বারুইপুর-কাণ্ডের পর পুলিশি ব্যবস্থার যে ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল, এই নতুন উদ্যোগ সেই আস্থা পুনর্গঠনের দিকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে।

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক