বেঙ্গালুরু: দেশের আধার ব্যবস্থার সূচনায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যিনি, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনে এবার তাঁর পরিবারের কাছেই নথি চাইতে চলেছে নির্বাচন কমিশন। কর্নাটকে চলমান এসআইআর প্রক্রিয়ায় ‘অসংগতির তালিকা’য় উঠেছে ইনফোসিসের সহপ্রতিষ্ঠাতা নন্দন নিলেকানি, তাঁর স্ত্রী এবং দুই সন্তানের নাম। নথি যাচাইয়ের পর্বে তাঁদের নোটিস দেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছে ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’।
তালিকায় রয়েছেন ৭১ বছরের নন্দন, তাঁর স্ত্রী রোহিণী নিলেকানি, ৬৭, মেয়ে জাহ্নবী নন্দন নিলেকানি, ৩৮, এবং ছেলে নিহার নিলেকানি, ৩৬। তাঁদের নামের সঙ্গে আগের বিশেষ নিবিড় সংশোধনের তালিকার সংযোগ স্থাপন করা যায়নি বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। আধিকারিকদের ব্যাখ্যা, ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় যাঁদের নাম ছিল না, তাঁদের এই শ্রেণিতে রাখা হচ্ছে।
নিলেকানি পরিবারের চার সদস্যের নাম অবশ্য বর্তমান খসড়া ভোটার তালিকায় রয়েছে। তাঁরা বেঙ্গালুরুর বিটিএম লেআউট বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটার। তাঁদের ভোটকেন্দ্র কোরামঙ্গলার তৃতীয় ব্লকের রেড্ডি জনসঙ্ঘ হাইস্কুল। চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য কমিশন অনুমোদিত ১১টি নথির মধ্যে একটি জমা দিতে হবে। ফলে অসংগতির তালিকায় নাম ওঠাকে এখনই ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া বলে দেখা যাবে না।
এই ঘটনার বিশেষ তাৎপর্য নিলেকানির পূর্বতন দায়িত্বে। তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের পরিচিত মুখ হওয়ার পাশাপাশি তিনি ছিলেন আধার কর্তৃপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। ২০০৯ সালে ইনফোসিস ছেড়ে সেই দায়িত্ব নিয়েছিলেন। বিপুলসংখ্যক মানুষের পরিচয় নথিভুক্ত করার উদ্যোগ বাস্তবায়নে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। সেই প্রশাসনিক পটভূমির কারণেই তাঁর পরিবারের ভোটার তথ্যের পুনরায় যাচাইয়ের বিষয়টি আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে দুটি ব্যবস্থা এবং তাদের নথি যাচাইয়ের উদ্দেশ্য এক নয়।
কর্নাটকের এই যাচাইপর্বে আরও বিশিষ্ট ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। ভারতরত্নপ্রাপ্ত বিজ্ঞানী সি এন আর রাওয়ের নামও অসংগতির তালিকায় ছিল। তাঁর ক্ষেত্রে কারণ হিসেবে নিজের নামের অমিল দেখানো হয়। বেঙ্গালুরু নগর জেলার নির্বাচনী আধিকারিক মহেশ্বর রাও বুধবার জানান, বিজ্ঞানীকে কোনও নোটিস দেওয়া হয়নি। পুরনো তালিকায় তাঁর নাম ‘রামা’ হিসেবে নথিভুক্ত ছিল; বর্তমান নথিতে নামের রূপ আলাদা। সংশ্লিষ্ট বুথস্তরের আধিকারিক বিষয়টি দেখে নোটিস ছাড়াই চূড়ান্ত তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির সুপারিশ করেছেন। বিজ্ঞানীর দপ্তরও জানিয়েছে, তাঁরা কোনও নোটিস পাননি। মোবাইল কিংবা ইমেলেও কোনও বার্তা আসেনি। ফলে তালিকায় নাম থাকা এবং বাস্তবে নোটিস পাওয়ার মধ্যে পার্থক্যটি এই ঘটনাতেও স্পষ্ট।
অন্যদিকে, পদ্মশ্রীপ্রাপ্ত সমাজকর্মী হারেকালা হাজাব্বা ইতিমধ্যেই নোটিস পেয়েছেন। তাঁর ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নাম ছিল শুধু ‘হাজাব্বা’। কিন্তু আধার, রেশন কার্ড, পাসপোর্ট ও ভোটার পরিচয়পত্রে রয়েছে ‘হারেকালা হাজাব্বা’। দুই নাম একই ব্যক্তির কি না, তা নিশ্চিত করতেই নথি চাওয়া হয়েছে। তাঁকে ১১ সেপ্টেম্বর যাচাইয়ের কাগজ জমা দিতে বলা হয়েছে। মেঙ্গালুরুতে কমলালেবু বিক্রির আয় থেকে টাকা জমিয়ে নিজের গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিলেন হাজাব্বা। তাঁর ক্ষেত্রে সমস্যাটি পুরনো ও বর্তমান নথিতে নাম লেখার পার্থক্যকে ঘিরে।
রাজ্যজুড়ে এই প্রক্রিয়ার পরিসরও বড়। কর্নাটকে ৪৩ লক্ষ ৮১ হাজার ভোটারের জন্য নোটিস তৈরি হয়েছে। দাবি ও আপত্তি নিষ্পত্তির পর্ব চলবে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের নির্ধারিত দিন ২৭ অক্টোবর। এই সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ভোটারদের প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে হবে। নিলেকানি পরিবারের ঘটনা তাই বৃহত্তর যাচাইপর্বের অংশ, যেখানে পুরনো তালিকার সঙ্গে তথ্যের সংযোগ এবং নামের সামঞ্জস্য পরীক্ষা করা হচ্ছে। এখন নজর থাকবে, তাঁদের কাছে আনুষ্ঠানিক নোটিস কবে পৌঁছয় এবং নথি যাচাইয়ের পরে কমিশন কী সিদ্ধান্ত জানায়। চূড়ান্ত তালিকাতেই তার ফল স্পষ্ট হবে।