লগইনসদস্যতালেখক
হোম›ভারত›এক কলমে বন্ধ ২৫২ মাদ্রাসা, প্রশ্নের মুখে আরও একশো
ভারত

এক কলমে বন্ধ ২৫২ মাদ্রাসা, প্রশ্নের মুখে আরও একশো

রাজ্যজুড়ে সমীক্ষার পরে ২৫২টি মাদ্রাসা বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। আরও প্রায় একশো প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠানো হয়েছে। সরকারি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বন্ধের তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলির প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছিল…

এক কলমে বন্ধ ২৫২ মাদ্রাসা, প্রশ্নের মুখে আরও একশো

রাজ্যজুড়ে সমীক্ষার পরে ২৫২টি মাদ্রাসা বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। আরও প্রায় একশো প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠানো হয়েছে। সরকারি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বন্ধের তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলির প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছিল না অথবা সেগুলিতে ন্যূনতম পরিকাঠামো ও প্রশাসনিক নিয়ম মানা হচ্ছিল না। সিদ্ধান্তটি রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশ্যে আসার পরেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ, সংখ্যালঘু অধিকার এবং নিরাপত্তার প্রশ্ন নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।

সরকারি সমীক্ষা চালানো হয়েছে রাজ্যের ২২টি জেলা এবং কলকাতার বিভিন্ন এলাকায়। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন, পরিচালন সমিতি, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা, ভবন ও শ্রেণিকক্ষ, পাঠ্যক্রম এবং অর্থের উৎস সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। সমীক্ষায় ২,১৩২টি মাদ্রাসার বৈধ অনুমোদন পাওয়া গেলেও আরও ২,৩৯৬টি প্রতিষ্ঠান কোনও সরকারি পর্ষদ বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই চলছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে অনুমোদনহীন সব প্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে বন্ধ করা হয়নি; প্রথম দফায় ২৫২টির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

রাজ্য সরকারের কয়েকজন নেতা বন্ধ হওয়া মাদ্রাসাগুলিকে জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করে বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, অনুমোদনহীন কিছু প্রতিষ্ঠান সন্দেহজনক কার্যকলাপের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। কিন্তু প্রশাসনিক সমীক্ষায় অনুমোদন বা পরিকাঠামোর ঘাটতি পাওয়া এবং কোনও প্রতিষ্ঠানকে ‘দেশবিরোধী কেন্দ্র’ প্রমাণ করা এক বিষয় নয়। দ্বিতীয় দাবির জন্য নির্দিষ্ট অপরাধ, তদন্ত ও আদালতগ্রাহ্য প্রমাণ প্রয়োজন। সরকার এখনও প্রতিটি বন্ধ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পৃথক অভিযোগের পূর্ণ তালিকা প্রকাশ করেনি।

এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়বে শিক্ষার্থীদের উপর। কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়মভঙ্গ করলে পরিচালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়, কিন্তু মাঝপথে পড়ুয়াদের শিক্ষাজীবন থামিয়ে দেওয়া যায় না। তারা কোন স্বীকৃত বিদ্যালয় বা মাদ্রাসায় ভর্তি হবে, পাঠ্যক্রমের পার্থক্য কীভাবে মেটানো হবে এবং দূরের প্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের খরচ কে বহন করবে—সরকারকে তার লিখিত পরিকল্পনা দিতে হবে। শিক্ষক ও অন্য কর্মীদের ভবিষ্যৎ নিয়েও একই প্রশ্ন রয়েছে।

ভারতে ধর্মীয় ও ভাষাগত সংখ্যালঘুদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও পরিচালনার সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে। তবে সেই অধিকার স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, শিক্ষার মান বা সাধারণ প্রশাসনিক নিয়ম থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেয় না। সরকার বৈধ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কিন্তু একই মানদণ্ড সব ধর্মীয় ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে হবে। শুধু একটি সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠান বেছে ব্যবস্থা নিলে বৈষম্যের অভিযোগ জোরালো হবে।

বিরোধী দল ও নাগরিক সংগঠনগুলির আশঙ্কা, বৃহৎ সংখ্যাটি রাজনৈতিক বার্তা তৈরিতে ব্যবহার হচ্ছে। সরকারের পাল্টা যুক্তি, অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়াই দায়িত্বহীনতা। সত্য নির্ধারণের সবচেয়ে ভাল পথ হল প্রতিষ্ঠানের নাম, পরিদর্শনের ফল, নোটিস, জবাব এবং বন্ধের নির্দিষ্ট কারণ প্রকাশ করা। আপিলের সুযোগও থাকা দরকার।

২৫২ সংখ্যাটি তাই শেষ কথা নয়। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, শিক্ষার্থীদের পুনর্বাসন এবং আদালতে সিদ্ধান্তটির স্থায়িত্ব—এই তিন পরীক্ষাতেই বোঝা যাবে অভিযানটি শিক্ষার মান রক্ষার পদক্ষেপ, নাকি ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শন।

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক