বাংলাস্ফিয়ার: একের পর এক মামলা, একাধিক সাজা এবং কারাবাস সত্ত্বেও আজম খানকে এখনও উত্তরপ্রদেশের ‘সবচেয়ে জনপ্রিয় মুসলিম নেতা’ বলে মনে করেন সমাজবাদী পার্টির একাংশ। রামপুরে তাঁর অনুগামী গোষ্ঠীও অটুট।
উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনের আর মাত্র চার মাস বাকি। এই পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার রামপুর জেলে সমাজবাদী পার্টির প্রবীণ নেতা আজম খানের সঙ্গে দলীয় প্রধান অখিলেশ যাদবের সাক্ষাৎ বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। গত পাঁচ বছরে অসংখ্য মামলা, একাধিক দণ্ডাদেশ এবং কারাবাসের জেরে রাজ্য রাজনীতিতে আজমের প্রভাব কমেছে। তবে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আজম কিংবা তাঁর ছেলে আবদুল্লা আজম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন কি না, তা এখনও অনিশ্চিত। আবদুল্লাও জেলে রয়েছেন।
আজমের সঙ্গে দেখা করতে তাঁর রাজনৈতিক ঘাঁটিতে অখিলেশের এই আকস্মিক সফরের পিছনে দু’টি কারণ দেখছেন রামপুরের সমাজবাদী পার্টির নেতারা। প্রথমটি এআইএমআইএম প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়াইসিকে ঘিরে। দ্বিতীয়টি রামপুরে আজমের নেতৃত্বাধীন দলীয় গোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে। আজমের সমর্থন ছাড়াই ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে রামপুরে সমাজবাদী পার্টির প্রার্থী মহিবুল্লা জিতেছিলেন। তা সত্ত্বেও আজমের অনুগামী গোষ্ঠী অটুট রয়েছে।
১৮ অক্টোবর রামপুরে এআইএমআইএমের একটি জনসভায় ওয়াইসি অভিযোগ করেন, সমাজবাদী পার্টির প্রধান যাদবদের স্বার্থ দেখেন, অথচ মুসলিমদের ব্যবহার করেন কেবল ভোটের জন্য। আজমের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
ওয়াইসির দাবি, সইফইয়ের কোনও যাদবকে ছ’মাসের জন্য জেলে পাঠানো হলে ‘ভাইয়া’, অর্থাৎ অখিলেশ, লখনউয়ে রাস্তা অবরোধ করে বসবেন। কারণ, তাঁর কাছে ‘আমার যাদব তো যাদবই’। ওয়াইসি বলেন, “আর আবদুল যদি জেলে থাকে, ভাইয়া তাকে বলবেন, চিন্তা কোরো না, ছাড়া পেয়ে আমাকে ভোট দিয়ো।”
সমাজবাদী পার্টির এক নেতা বলেন, “ওয়াইসির বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অখিলেশ আশা করছেন, মুসলিম ভোট সমাজবাদী পার্টি–কংগ্রেস জোটের পক্ষে একজোট হবে। কিন্তু আজমের প্রতি সহানুভূতিকে কাজে লাগিয়ে ওয়াইসি যদি মুসলিম ভোটে ভাগ বসান, তা হলে রামপুর এবং পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের সংলগ্ন জেলাগুলিতে বিজেপির সুবিধা হবে।”
দলের আর এক নেতার বক্তব্য, “আজম খান এখনও উত্তরপ্রদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় মুসলিম নেতা। তিনিই আমাদের দলের সংখ্যালঘু মুখ। আজমের জন্যই রামপুর সমাজবাদী পার্টির শক্ত ঘাঁটি। বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর অনুগামীরা যদি সমাজবাদী পার্টির বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে দাঁড়ান, তা হলে সমাজবাদী পার্টি–কংগ্রেস জোটের সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।”
তবে সমাজবাদী পার্টির মুখপাত্র রাজেন্দ্র চৌধুরীর বক্তব্য, আজমের সঙ্গে অখিলেশের “আবেগের সম্পর্ক” রয়েছে বলেই তিনি রামপুর জেলে দেখা করতে গিয়েছিলেন। চৌধুরী বলেন, “আজম খানজি আমাদের সকলের শ্রদ্ধেয়। রামপুর এবং সংলগ্ন এলাকায় তাঁর প্রভাব রয়েছে।”
সমাজবাদী পার্টির রামপুর জেলা সভাপতি অজয় সাগর বলেন, “আজম এবং আবদুল্লা, দু’জনেই রামপুর জেলে রয়েছেন। দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় দু’জনের কেউই এখন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্য নন। তবে ২০২৭ সালের নির্বাচনে যাতে তাঁরা লড়তে পারেন, সে জন্য দু’জনেই সংশ্লিষ্ট আদালতে দোষী সাব্যস্ত করার রায় স্থগিত রাখার আবেদন করেছেন।”
কয়েক সপ্তাহ আগে আজমের স্ত্রী তাজিন ফাতিমা লখনউয়ে অখিলেশের সঙ্গে দেখা করেছিলেন।
অজয় সাগর আরও বলেন, “আমরা সাংগঠনিকভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। রামপুর এবং সুয়ার আসনের জন্য সমাজবাদী পার্টি এখনও কোনও প্রার্থীর নাম বিবেচনা করেনি। দু’টি আসনের প্রার্থীই আজম খান সাহেব ঠিক করবেন। রামপুর তো আজম খান সাহেবের শহর।”
২০২২ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রামপুর থেকে দশমবারের জন্য বিধায়ক নির্বাচিত হন আজম। সংলগ্ন সুয়ার আসন থেকে পুনর্নির্বাচিত হন তাঁর ছেলে আবদুল্লা আজম।
২০১৯ সালের একটি বিদ্বেষমূলক ভাষণের মামলায় আদালত আজমকে দোষী সাব্যস্ত করার পরে তাঁর বিধায়ক পদ খারিজ হয়। এর ফলে রামপুরে উপনির্বাচনের প্রয়োজন পড়ে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে সেই উপনির্বাচনে আজমের ঘনিষ্ঠ অসীম রাজাকে প্রার্থী করে সমাজবাদী পার্টি। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিজেপির আকাশ সাক্সেনা, যিনি ওই বছরের গোড়ার বিধানসভা নির্বাচনে আজমের কাছে হেরেছিলেন। আজম পরিবারের বিরুদ্ধে একাধিক মামলার অভিযোগকারী সাক্সেনাই উপনির্বাচনে জয়ী হন।
আজম পরিবারের জন্য আরও একটি ধাক্কা আসে ২০২৩ সালের মে মাসে সুয়ার উপনির্বাচনে। সেখানে সমাজবাদী পার্টির অনুরাধা চৌহানকে হারিয়ে জয়ী হন বিজেপির শরিক আপনা দল (সোনেলাল)-এর প্রার্থী শফিক আহমদ আনসারি। আবদুল্লার বিধায়ক পদ খারিজ হওয়ায় আসনটি শূন্য হয়েছিল।
পরপর এই পরাজয়ে রামপুর জেলায় আজম পরিবারের প্রভাব আরও সঙ্কুচিত হয়। সুয়ার জয়ের পরে জেলার পাঁচটি বিধানসভা আসনের মধ্যে চারটিই বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএর দখলে চলে যায়।
আজমের প্রভাব কতটা রয়েছে?
তবে সমাজবাদী পার্টির এক প্রবীণ মুসলিম নেতার মতে, ২০২৭ সালের নির্বাচনে আজম পরিবার খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারবে না।
তিনি বলেন, “এখনকার পরিস্থিতিতে আজম এবং আবদুল্লা নির্বাচনে দাঁড়াতে পারবেন না। তাজিন ফাতিমার পক্ষে একা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সামলানো সম্ভব নয়। আর আজম চান না, তাঁর ছোট ছেলে রাজনীতিতে আসুক।”
ওই নেতা আরও বলেন, “আজম এবং তাঁর অনুগামীদের বিরোধিতা সত্ত্বেও সমাজবাদী পার্টির মহিবুল্লা রামপুর লোকসভা আসনে জিতেছেন। মুসলিমরা সমাজবাদী পার্টির সঙ্গে থাকলেই আমাদের পক্ষে যথেষ্ট।”
সমাজবাদী পার্টির জাতীয় সাধারণ সম্পাদক, ৭৮ বছরের আজম দলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের অন্যতম। ১৯৯২ সালে সমাজবাদী পার্টি গঠনের আগেই রামপুর থেকে চারবার বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। জনতা পার্টি, জনতা দল, লোকদল এবং জনতা পার্টি (সেকুলার)-সহ বিভিন্ন দলের টিকিটে জিতেছিলেন আজম।
তবে সমাজবাদী পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মুলায়ম সিং ক্ষমতায় আসার পরে আজমের জনপ্রিয়তা আরও বাড়ে। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মুলায়ম যে তিনটি সরকারের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, প্রতিটিতেই আজমকে একাধিক দফতরের দায়িত্ব দিয়ে ক্যাবিনেট মন্ত্রী করেন।
২০১২ সালের নির্বাচনে সমাজবাদী পার্টির জয়ের পরে মুলায়মের ছেলে অখিলেশ মুখ্যমন্ত্রী হলেও আজমের অগ্রগণ্য অবস্থান অক্ষুণ্ণ ছিল। তাঁকে আটটি দফতরের দায়িত্ব দেওয়া হয়। দলের অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবেই তখন গণ্য হতেন আজম।