বাংলাস্ফিয়ার: ক্যানসারের চিকিৎসায় কেমোথেরাপির একটি যন্ত্রণাদায়ক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ঠেকাতে ‘ম্যাজিক মাশরুম’-এ থাকা সিলোসাইবিন কাজে লাগতে পারে—এমনই সম্ভাবনা তুলে ধরেছে আমেরিকার একটি নতুন গবেষণা। ইঁদুর এবং মানুষের কিছু কোষকলার উপর চালানো গবেষণাটির ফল প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী সায়েন্স-এ। তবে গবেষকেরা স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ফলাফল আশাব্যঞ্জক হলেও চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান ছাড়া সিলোসাইবিন গ্রহণ অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে।

কেমোথেরাপি নেওয়া রোগীদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ‘পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি’ নামে স্নায়ুর সমস্যায় আক্রান্ত হন। সাধারণত হাত-পা অবশ হয়ে আসা, ঝিনঝিন করা কিংবা স্পর্শের অনুভূতি কমে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। তাঁদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের আবার একটানা জ্বালাপোড়া ও অসহনীয় ব্যথা হতে পারে বলে জানিয়েছেন গবেষণার সহলেখক তথা টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের এমডি অ্যান্ডারসন ক্যানসার সেন্টারের ব্যথা বিশেষজ্ঞ প্যাট্রিক ডোহার্টি।

এই স্নায়ুক্ষতি রোগীর হাঁটাচলার ক্ষমতাও কমিয়ে দিতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে কেমোথেরাপি শেষ হওয়ার পরেও সমস্যা থেকে যায়; কখনও তা আজীবন স্থায়ী হয়। যন্ত্রণা অত্যধিক হলে চিকিৎসককে ওষুধের মাত্রা কমাতে কিংবা কেমোথেরাপি বন্ধ করতে হয়। ফলে রোগীর জীবনযাত্রার মানের পাশাপাশি ক্যানসার থেকে বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সিলোসাইবিনের সম্ভাব্য উপকারের সন্ধান গবেষকেরা পেয়েছেন অনেকটাই আকস্মিকভাবে। ক্যানসার কীভাবে স্নায়ুকোষকে ব্যবহার করে নিজের বৃদ্ধি ঘটায়, তা খতিয়ে দেখছিলেন তাঁরা। মস্তিষ্কের নিজেকে পুনর্গঠনের ক্ষমতা বা ‘নিউরোপ্লাস্টিসিটি’ বোঝার জন্য পরীক্ষায় সিলোসাইবিন ব্যবহার করা হয়েছিল। তখনই দেখা যায়, যৌগটি পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি তৈরি হতে বাধা দিচ্ছে।

পরবর্তী পরীক্ষায় বোঝা যায়, সিলোসাইবিন স্নায়ুকোষকে রক্ষা করার পাশাপাশি কোষের শক্তিকেন্দ্র মাইটোকন্ড্রিয়ার চলাচল সচল রাখে। কেমোথেরাপি কোষের ভিতরের সেই সূক্ষ্ম পরিবহণপথ নষ্ট করে দেয়, যার মাধ্যমে মাইটোকন্ড্রিয়া হাত-পায়ের প্রান্তে থাকা স্নায়ুতে শক্তি পৌঁছে দেয়। ফলে ধীরে ধীরে স্নায়ুর প্রান্তগুলি মরে যেতে থাকে।

ইঁদুরকে কেমোথেরাপির আগে দু’বার সিলোসাইবিন দেওয়াতেই ছয় দফা চিকিৎসা পর্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক অতিসংবেদনশীলতা ঠেকানো গিয়েছে। এতে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা বা কেমোথেরাপির ক্যানসারবিরোধী কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হল, সিলোসাইবিনের একটি বিভ্রমসৃষ্টিকারী নয় এমন সমগুণসম্পন্ন যৌগও পরীক্ষাগারে একই ফল দেখিয়েছে। অর্থাৎ স্নায়ুরক্ষার সঙ্গে নেশাজনক প্রভাবের সরাসরি সম্পর্ক নাও থাকতে পারে।, এমডি অ্যান্ডারসন ক্যানসার সেন্টার এ বছরই রোগীদের নিয়ে পরীক্ষামূলক প্রয়োগ শুরু করতে চায়।

তবে বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা কঠোর। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ গ্রেগরি জোনসের মতে, সিলোসাইবিন মানুষের মানসিক অবস্থাকে ‘বিবর্ধিত’ করে। ক্যানসার নিয়ে আগে থেকেই উদ্বিগ্ন রোগী চিকিৎসকের নজরদারি ছাড়া এটি নিলে ভয়, উৎকণ্ঠা ও মানসিক চাপ বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে। অতএব এই গবেষণা স্ব-চিকিৎসার অনুমতি নয়; মানুষের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা প্রমাণের দীর্ঘ পথ এখনও বাকি।