বাংলাস্ফিয়ার: সলমন খানকে নিশানা করতে এসে শেষ পর্যন্ত টাইগার শ্রফের গাড়িতে গুলি চালিয়েছিল দুষ্কৃতীরা—মুম্বইয়ের জুহুতে রবিবারের হামলার তদন্তে এমনই তথ্য উঠে এসেছে বলে দাবি পুলিশ সূত্রের। হিন্দুস্তান টাইমসকে ওই সূত্রগুলি জানিয়েছে, লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের পরিকল্পনায় প্রথম নাম ছিল সলমনের। কিন্তু তাঁর বাড়ির কড়া নিরাপত্তা দেখে হামলাকারীরা পিছিয়ে যায়। এরপর অপেক্ষাকৃত কম সুরক্ষিত একজন তারকাকে খুঁজতে গিয়ে তারা টাইগারকে বেছে নেয়। পুলিশের নিরাপত্তাবলয় না থাকায় তাঁকেই ‘সহজ লক্ষ্য’ বলে মনে করেছিল অভিযুক্তেরা।

পুলিশ সূত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, হামলার আগে বান্দ্রা পশ্চিমের ব্যান্ডস্ট্যান্ডে সলমনের বাড়ির আশপাশ ঘুরে দেখেছিল দুই বন্দুকবাজ। সেখানে নিরাপত্তার ব্যবস্থা কতটা কঠোর, অভিনেতার কাছে পৌঁছনো সম্ভব কি না, তা বোঝার চেষ্টা হয়। কিন্তু পরিস্থিতি দেখে তারা বুঝতে পারে, পরিকল্পনা কার্যকর করা কঠিন। সেই বাধার কথা নির্দেশদাতাকে জানানো হয়। অভিযোগ, হামলার পরিকল্পনা পুরোপুরি বাতিল না করে তখন লক্ষ্যবস্তু বদলে ফেলে গ্যাং। সলমনের পরিবর্তে অন্য একজন অভিনেতাকে আক্রমণের ছক তৈরি হয়।

টাইগারের নিয়মিত ফুটবল খেলার অভ্যাসের খবর হামলাকারীদের কাছে পৌঁছেছিল সমাজমাধ্যমের মাধ্যমে। হিন্দুস্তান টাইমসকে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, অভিনেতার অনুরাগীদের পোস্ট দেখে গ্যাং জানতে পারে, তিনি রবিবার ফুটবল খেলতে যান। তাঁর যাতায়াতের সময় পুলিশের নিরাপত্তাও থাকে না। ফলে ব্যক্তিগত পরিচয় বা সরাসরি যোগাযোগ ছাড়াই অভিনেতার রুটিন সম্পর্কে ধারণা তৈরি করে ফেলে দুষ্কৃতীরা। অনুরাগীদের কাছে যা ছিল প্রিয় তারকার দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ খবর, অভিযোগ অনুযায়ী হামলাকারীদের কাছে সেটিই হয়ে ওঠে তাঁকে অনুসরণ করার সূত্র।

এরপর জুহুর পুষ্পা নার্সি মাঠে টাইগারের গতিবিধির উপর নজর রাখা হয় বলে পুলিশ সূত্রের দাবি। পিস্তল নিয়ে আসা বন্দুকবাজেরা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেছিল। খেলা শেষে অভিনেতার গাড়ি গেট পেরিয়ে বেরোনোর সময় গুলি চালানো হয়। হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে হামলার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিষ্ণোইয়ের এক ঘনিষ্ঠ সহযোগীর বিরুদ্ধে। তবে নির্দেশদাতার সঙ্গে যোগাযোগ, লক্ষ্য পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত এবং অভিযুক্তদের ভূমিকা সম্পর্কে পুলিশের এই বক্তব্য এখনও তদন্তের পর্যায়ে রয়েছে।

১৮ অক্টোবরের ওই ঘটনায় টাইগারের গুলি লাগেনি। তবে তাঁর গাড়িচালক এবং এক অটোরিকশাচালক আহত হন বলে অন্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ঘটনাস্থলে ছিলেন অভিনেতা করণবীর মেহরা, যিনি টাইগারের সঙ্গে ফুটবল খেলেন। টাইগারের গাড়ির ঠিক পিছনের গাড়িতে ছিলেন তিনি। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, প্রথমে শব্দ শুনে বাজি ফাটছে বলে মনে হয়েছিল। পরে আশপাশের মানুষের চিৎকারে বোঝা যায়, আসলে গুলি চলেছে। মুহূর্তের মধ্যে পরিচিত একটি রবিবারের আড্ডা আতঙ্কে বদলে যায়।

আরেকটি প্রতিবেদনে জানা গিয়েছে, টাইগারের গাড়িচালক ফিরদৌসের বয়ান নিয়েছে মুম্বই পুলিশ। তাঁর চিকিৎসা চলছে নানাবতী হাসপাতালে। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ, আহতের বক্তব্য এবং ক্যামেরায় ধরা পড়া দৃশ্য মিলিয়ে ঘটনার ক্রম বোঝা তদন্তের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত কে কোথায় ছিল, গাড়ি বেরোনোর সময় কী ঘটেছিল এবং হামলার পরে দুষ্কৃতীরা কীভাবে সরে যায়, সেই প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজার ক্ষেত্রে এই তথ্যগুলি প্রয়োজন।

তদন্তে ইতিমধ্যে একাধিক গ্রেপ্তারি হয়েছে। সোমবার সকালে রাজস্থানের কোটা থেকে তিন সন্দেহভাজনকে ধরা হয়। পুলিশের দাবি, তারা নেপালে পালানোর পরিকল্পনা করছিল। এরপর মঙ্গলবার দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল দিল্লি ও হরিয়ানা থেকে আরও চারজনকে ধরে। তাঁদের নাম কুণাল, সুমিত, রাধা এবং ববিতা। পরবর্তী তদন্তের জন্য তাঁদের মুম্বই পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ফলে ঘটনার তদন্ত এখন সরাসরি হামলায় জড়িত সন্দেহভাজনদের পাশাপাশি অস্ত্র সংগ্রহ ও পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগের দিকেও এগিয়েছে।

পুলিশের অভিযোগ অনুযায়ী, কুণাল অমৃতসর থেকে একটি পিস্তল এবং কুড়ি রাউন্ড গুলি সংগ্রহ করেছিল; তার সঙ্গে ছিল সুমিত। রাধা ও ববিতা সেই অস্ত্র নিয়ে মুম্বইয়ে গিয়েছিল বলে অভিযোগ। আদালতের অনুমতি পাওয়ার পর মুম্বইয়ের তদন্তকারী দল চারজনকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার করে এবং তিন দিনের ট্রানজিট রিমান্ড পায়। এই গ্রেপ্তারিগুলি থেকে তদন্তের একটি বিস্তৃত দিক সামনে আসছে: হামলাস্থলে উপস্থিত ব্যক্তিদের বাইরেও অস্ত্র সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত লোকজনের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে প্রত্যেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের বিষয়টি এখনও বাকি।

ঘটনার পর চলচ্চিত্র জগৎ থেকেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। অভিনেতা রবি কিষণ বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুতর বলেছেন। সঙ্গীতশিল্পী অমাল মালিক মুম্বইয়ের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং মিকা সিংহ পুলিশের কঠোর পদক্ষেপ চেয়েছেন। হামলার দায় স্বীকারের দাবি করা একটি সমাজমাধ্যমের পোস্টের কথাও সংবাদমাধ্যমে এসেছে। তবে প্রাথমিক প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, সেই পোস্টের সত্যতা পুলিশের যাচাইসাপেক্ষ। ফলে গ্যাংয়ের নাম ঘিরে প্রচার এবং তদন্তে প্রতিষ্ঠিত তথ্যকে এক করে দেখা উচিত নয়।

এই ঘটনায় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে নিরাপত্তার ফারাক এবং সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে থাকা ব্যক্তিগত রুটিনের তথ্য। পুলিশ সূত্রের বিবরণ সঠিক হলে দেখা যাচ্ছে, একটি জায়গায় শক্ত নিরাপত্তার বাধা হামলার উদ্যোগ থামায়নি; দুষ্কৃতীরা অন্য ব্যক্তিকে বেছে নিয়েছে। একই সঙ্গে অনুরাগীদের নির্দোষ আগ্রহ থেকে প্রকাশিত তথ্যও অপরাধের পরিকল্পনায় ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা সামনে এসেছে। তবে এ থেকে অনুরাগীদের দায়ী করা চলে না। তাঁদের পোস্টের উদ্দেশ্য এবং অপরাধীদের কথিত ব্যবহার সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, টাইগারকে আক্রমণ করে গ্যাং ঠিক কী অর্জন করতে চেয়েছিল। কেবল সহজে পৌঁছনো সম্ভব বলেই কি তাঁকে বেছে নেওয়া হয়েছিল, নাকি এর পিছনে অন্য কোনও উদ্দেশ্যও ছিল? পুলিশের তরফে হামলার উদ্দেশ্য খতিয়ে দেখার কথা জানানো হয়েছে। আপাতত সলমনকে প্রথম লক্ষ্য করার তথ্যটি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ সূত্রের দাবি হিসেবেই সামনে এসেছে। সেই দাবি, অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ এবং হামলাকারীদের যোগাযোগের মধ্যে প্রমাণসমর্থিত যোগসূত্র প্রতিষ্ঠা করাই তদন্তের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ কাজ।