বাংলাস্ফিয়ার: ভারতীয় সমকালীন চিত্রকলার মহীরুহ, রেখা ও কালির জাদুকর যোগেন চৌধুরী আর নেই। রবিবার সকাল ১০টা ১৫ মিনিট নাগাদ কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই প্রখ্যাত শিল্পী। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ‘মায়োলোপ্রলিফারেটিভ নিওপ্লাজম’ (Myeloproliferative Neoplasm) নামক এক বিরল ধরনের ব্লাড ক্যানসারে ভুগছিলেন। গত ১৫ মাস ধরে তাঁর কেমোথেরাপির চিকিৎসা চলছিল। সম্প্রতি মূত্রনালির গুরুতর সংক্রমণ (ইউটিআই) এবং শারীরিক অবনতির কারণে গত ১৬ অক্টোবর তাঁকে বাইপাস সংলগ্ন রুবি জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। রবিবার সকালে তাঁর জীবনাবসানের খবরে শিল্পীমহল ও রাজনৈতিক আঙিনায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।

​জীবনের গোড়া ও দেশভাগের ক্ষত

​১৯৩৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুরের দাহারপাড়া গ্রামে এক জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন যোগেন চৌধুরী। পিতা প্রমথনাথ চৌধুরী নাটকের দৃশ্যপট আঁকা ও প্রতিমা তৈরিতে পারদর্শী ছিলেন এবং মা ছিলেন আলপনা শিল্পে সিদ্ধহস্ত। শিল্পচর্চার সেই প্রথম পাঠ তিনি পেয়েছিলেন পরিবার থেকেই।

​তবে শৈশবেই তাঁর জীবনে গভীর দাগ কেটে যায় ১৯৪৭ সালের দেশভাগ। ভিটেমাটি হারিয়ে পূর্ববঙ্গ থেকে ছিন্নমূল হয়ে কলকাতায় এসে আশ্রয় নেয় তাঁর পরিবার। উদ্বাস্তু জীবনের নিদারুণ অনিশ্চয়তা, দারিদ্র্য এবং সংগ্রামই পরবর্তীকালে তাঁর সৃষ্টির মূল অনুঘটক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ১৯৫৫ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত তিনি কলকাতার গভর্নমেন্ট কলেজ অফ আর্ট অ্যান্ড ক্র্যাফটে শিল্পশিক্ষা সম্পন্ন করেন।

​প্যারিস থেকে শান্তিনিকেতন: স্বকীয় ধারার অন্বেষণ

​হাওড়া জেলা স্কুলে শিক্ষকতা এবং পরবর্তীতে হ্যান্ডলুম বোর্ডে ডিজাইনার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও তাঁর লক্ষ্য ছিল নিজস্ব শৈলী নির্মাণ। ১৯৬৫ সালে ফরাসি সরকারের বৃত্তি নিয়ে তিনি পাড়ি দেন প্যারিসের ঐতিহ্যবাহী ‘একোল দে বোজার’-এ। সেখানে পশ্চিমি আধুনিকতাবাদের সাথে পরিচিত হলেও তিনি পশ্চিমি অনুকরণে গা ভাসাননি। বরং ১৯৬৮ সালে দেশে ফিরে কালির স্পষ্ট কালো রেখা, ক্রস-হ্যাচিং এবং প্যাস্টেলের এক অনন্য মেলবন্ধনে ভারতীয় আধুনিক শিল্পের নিজস্ব রূপকল্প প্রতিষ্ঠা করেন।

​১৯৭২ সালে তিনি নতুন দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবনের কিউরেটর নিযুক্ত হন এবং দীর্ঘ দেড় দশক সেই দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করেন। ১৯৮৭ সালে তিনি যোগ দেন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে। শান্তিনিকেতনে তাঁর দীর্ঘ শিক্ষকতা উত্তরপ্রজন্মের বহু প্রতিভাবান শিল্পীর সৃষ্টিশীল পথকে আলোকিত করেছে।

​শিল্পের ভাষা: ক্ষতবিক্ষত অবয়ব ও সামাজিক অবক্ষয়ের আলেখ্য

​যোগেন চৌধুরীর ক্যানভাস মানবশরীর কেবল রূপের প্রকাশ নয়, বরং সমাজের যন্ত্রণা, কাম, লালসা ও কৃত্রিমতার প্রতীক। কালো ব্যাকগ্রাউন্ডের ওপর পেঁচানো, স্ফীত ও বিকৃত মানব অবয়ব এবং নরম অথচ ক্ষতবিক্ষত মাংসপেশির যে রূপ তিনি ফুটিয়ে তুলেছিলেন, আন্তর্জাতিক শিল্পসমালোচকদের কাছে তা ‘অর্গানিক ফর্ম’ ও ‘মাস্টার অব লাইনস’ হিসেবে পরিচিতি পায়। ১৯৬৬ সালে প্যারিসের ‘প্রি লে ফ্রঁস দ্য লা জ্যুন পেইন্তুর’, ১৯৮৬ সালে কিউবার হাভানা বিয়েনালে পুরস্কার, ২০০১ সালে মধ্যপ্রদেশ সরকারের ‘কালিদাস সম্মান’ এবং ২০১২ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সর্বোচ্চ সম্মান ‘বঙ্গবিভূষণ’-এ ভূষিত হন তিনি।

​সামাজিক ভূমিকা ও সংসদীয় জীবন

​তিনি শুধু স্টুডিওর নির্জনতায় আবদ্ধ থাকেননি, বরং বুদ্ধিজীবী ও নাগরিক আন্দোলনের সামনের সারিতে থেকেছেন সবসময়। নন্দীগ্রাম আন্দোলন থেকে শুরু করে সমাজের নানা অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাজপথে সরব হয়েছেন। ২০১৪ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে রাজ্যসভার সাংসদ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৯ সালে শিল্পপ্রেমীদের জন্য তিনি গড়ে তোলেন নিজস্ব সংগ্রহশালা ‘চারুবাসনা’।

​শেষ শ্রদ্ধা ও শোকজ্ঞাপন

​হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, রবিবার শিল্পীর মরদেহ প্রথমে নিয়ে যাওয়া হবে তাঁর সাউথ সিটির বাসভবনে। সেখান থেকে অনুরাগীদের শেষ শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের জন্য রাখা হবে তাঁর স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান ‘চারুবাসনা’-য়।

​তাঁর প্রয়াণে শোকবার্তা জানিয়েছেন বিশিষ্ট শিল্পবোদ্ধা, সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ। যোগেন চৌধুরীর প্রয়াণে বাংলার সংস্কৃতি জগতের যে এক অপূরণীয় ক্ষতি হলো তা বলাই বাহুল্য

রেখার অন্তরালে | চিত্রকর যোগেন চৌধুরীকে শ্রদ্ধার্ঘ্য | শিল্পজগতের নক্ষত্রপতন |

। ক্যানভাস খালি হলেও তাঁর আঁকা প্রতিটি কালজয়ী রেখা অনন্তকাল ধরে শিল্পরসিকদের হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবে।