বাংলাস্ফিয়ারঃ গুরুতর অসুস্থ প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী। শনিবার, ২৪ অক্টোবর তাঁকে কলকাতার আনন্দপুর এলাকার একটি হাসপাতালে ভেন্টিলেটরে রাখা হয়েছে। তাঁর বয়স ৮৭ বছর। হাসপাতাল সূত্রকে উদ্ধৃত করে সংবাদসংস্থা জানিয়েছে, এক বছরেরও বেশি সময় ধরে রক্তের ক্যান্সারের সঙ্গে লড়ছেন শিল্পী। দুর্গাপুজোর সময় মূত্রনালির সংক্রমণ দেখা দেওয়ায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছিল। বর্তমানে চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন তিনি।
হাসপাতালের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, শিল্পীর অবস্থা গুরুতর। গত চোদ্দো মাসে তাঁর একাধিক দফায় কেমোথেরাপি হয়েছে। দীর্ঘদিনের অসুস্থতার মধ্যে নতুন করে শারীরিক অবস্থার অবনতি এবং ভেন্টিলেটরের প্রয়োজন হওয়ায় উদ্বেগ বেড়েছে। তাঁর অসুস্থতার খবরে উদ্বিগ্ন শিল্পানুরাগী ও সাংস্কৃতিক মহল। তবে চিকিৎসার ফলাফল বা সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা নিয়ে ওই প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট পূর্বাভাস দেওয়া হয়নি।
আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলায় যোগেন চৌধুরীর স্থান স্বতন্ত্র। তাঁর ছবির কেন্দ্রে বারবার ফিরে এসেছে মানুষ, তার দেহভঙ্গি, মুখের রেখা, ব্যক্তিগত যন্ত্রণা এবং সামাজিক অভিজ্ঞতা। কালি, জলরং ও প্যাস্টেলের ব্যবহারে তিনি গড়ে তুলেছেন নিজস্ব দৃশ্যভাষা। বিশেষত অসংখ্য সূক্ষ্ম রেখার পরস্পর ছেদে আলোছায়া ও শরীরের ঘনত্ব ফুটিয়ে তোলার ‘ক্রস হ্যাচিং’ পদ্ধতি তাঁর কাজের অন্যতম পরিচয়। মানুষের অবয়বকে কখনও ইচ্ছাকৃতভাবে বদলে দিয়ে তিনি তার অন্তর্গত অস্বস্তি ও জটিলতা প্রকাশ করেছেন।
১৯৩৯ সালে অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুরে জন্ম যোগেনের। দেশভাগের পরে পরিবারের সঙ্গে কলকাতায় আসেন তিনি। উদ্বাস্তু জীবনের অভাব, অনিশ্চয়তা এবং চারপাশের সামাজিক টানাপড়েন তাঁর বেড়ে ওঠার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল। পরবর্তী সময়ে এক সাক্ষাৎকারে শিল্পী জানিয়েছেন, মানুষের মুখ, অঙ্গভঙ্গি, আনন্দ ও কষ্ট ছোটবেলা থেকেই তাঁকে আকর্ষণ করত। চারপাশের মানুষকে গভীরভাবে দেখার সেই অভ্যাস তাঁর ছবির বিষয় এবং প্রকাশভঙ্গি নির্মাণে বড় ভূমিকা নিয়েছে।
১৯৫৫ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত কলকাতার গভর্নমেন্ট কলেজ অব আর্ট অ্যান্ড ক্রাফটে পড়াশোনা করেন তিনি। কর্মজীবনের শুরুতে হাওড়ার একটি বিদ্যালয়ে শিল্পশিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। পরে বস্ত্রনকশার কাজেও যুক্ত হন। ১৯৬৫ সালে ফরাসি সরকারের বৃত্তি নিয়ে প্যারিসে উচ্চশিক্ষার জন্য যান। সেখানে শিল্পশিক্ষার পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন সংগ্রহশালা ও প্রদর্শনী দেখার সুযোগ তাঁর অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করে। যদিও নিজের শিল্পভাষা নির্মাণে বাংলার জীবন, লোকশিল্প এবং স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রেখেছিলেন।
দেশে ফিরে চেন্নাইয়ে কাজ করার পর ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতি ভবনে শিল্পসংগ্রহের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেন যোগেন। প্রায় পনেরো বছর সেখানে কাজ করেছেন। ১৯৮৭ সালে শান্তিনিকেতনের কলাভবনে অধ্যাপনায় যোগ দেন। শিল্পচর্চার সঙ্গে শিক্ষকতা এবং তরুণ শিল্পীদের উৎসাহ দেওয়াও তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কলকাতা ও শান্তিনিকেতনকে ঘিরে তাঁর কাজের পরিসর বিস্তৃত হয়েছে।
যোগেনের ছবিতে ব্যক্তিগত সম্পর্কের পাশাপাশি সামাজিক হিংসা, রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং মানুষের বিপন্নতাও জায়গা পেয়েছে। কখনও ব্যঙ্গ, কখনও বিষণ্ণতা, কখনও ক্ষতবিক্ষত শরীরের মাধ্যমে তিনি সময়ের অভিজ্ঞতাকে ধরেছেন। আবার প্রকৃতি, দৈনন্দিন বস্তু এবং স্মৃতিও তাঁর সৃষ্টির বিষয়। ফলে তাঁর শিল্পকে কোনও একটি বিষয় বা একমাত্রিক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা কঠিন। দেশবিদেশের বহু প্রদর্শনীতে তাঁর কাজ দেখানো হয়েছে; আন্তর্জাতিক শিল্পমহলেও তিনি সুপরিচিত। শিল্পী নিজেই জানিয়েছেন, ছবি আঁকার সময় বিষয়বস্তুর সঙ্গে তাঁর একটি সম্পর্ক তৈরি হয়। মানুষের উদ্বেগ, দ্বিধা কিংবা সুখের অনুভূতির কাছাকাছি পৌঁছনোর চেষ্টা তাঁর সৃষ্টিকে বারবার অর্থ ও গভীরতা এনে দিয়েছে।
দীর্ঘ শিল্পজীবনে একাধিক সম্মান পেয়েছেন যোগেন চৌধুরী। কিউবার হাভানা বিয়েনালে পুরস্কার এবং মধ্যপ্রদেশ সরকারের কালিদাস সম্মান তাঁর স্বীকৃতির তালিকায় রয়েছে। চিত্রকলার বাইরেও সাহিত্যচর্চা করেছেন; প্রকাশিত হয়েছে তাঁর কবিতার বই। রেখা ও রঙের পাশাপাশি শব্দেও নিজের অনুভব প্রকাশ করেছেন এই শিল্পী। তাঁর বর্তমান শারীরিক সংকটের মধ্যে চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শনিবারের হাসপাতাল-সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গুরুতর অবস্থায় ভেন্টিলেটরের সহায়তায় তাঁর চিকিৎসা চলছে।