ঢাকা: প্রকৃতির নিজস্ব মানচিত্রে কোনো আন্তর্জাতিক সীমারেখা থাকে না, কিন্তু মানুষের তৈরি সেই ভৌগোলিক কাঁটাতারই এবার কাল হয়ে দাঁড়াল বুনো হাতির পালের জন্য। একদিকে ভারতের মেঘালয়, অন্যদিকে বাংলাদেশের ময়মনসিংহ—সীমান্তের দুই পারের ঘন অরণ্যে শতবর্ষ ধরে অবাধ বিচরণ ছিল এই ‘ট্রান্সবাউন্ডারি’ বা পরিযায়ী গজরাজের। তবে সম্প্রতি সেই চিরাচরিত পথ রুদ্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ ভূখণ্ডে আটকে পড়েছে হস্তিযূথ, যার জেরে পরিস্থিতি এবার পৌঁছেছে দুই দেশের কূটনৈতিক টেবিলেও।

বন দপ্তর সূত্রে খবর, অতীতে দুই দেশের মধ্যে হাতিদের অবাধ যাতায়াতের জন্য প্রায় ৪৪টি উন্মুক্ত প্রবেশদ্বার এবং অন্তত ১১টি নদী বা পাহাড়ি ছড়াপথ ছিল। বনাঞ্চলে মরশুমি খাবারের টান পড়লেই অবলীলায় এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাড়ি দিত এই দলগুলি। কিন্তু সীমান্তে ভারতের অংশে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ায় এই প্রাচীন করিডোরের অধিকাংশ পথই এখন সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ। পাশাপাশি ওপারে মেঘালয়ের দিকে হাতির চারণভূমিতে ভারতীয় কৃষকরা শুরু করেছেন কাজুবাদামের ব্যাপক চাষ। ফলে ওপারে চারণভূমি সংকুচিত হওয়ায় এবং বেড়ার বাধায় ধাক্কা খেয়ে দলছুট হাতির পাল আর ফিরে যেতে পারছে না।

এই পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএন (IUCN)। সংস্থার বাংলাদেশ শাখার প্রোগ্রাম ম্যানেজার এ বি এম সারোয়ার আলমের কথায়, “আমাদের এখানে হাতির বসবাসের জায়গা যথেষ্ট সীমিত। এরা মূলত নির্দিষ্ট মরশুমে খাবারের সন্ধানে আসত। কিন্তু এখন কাঁটাতারের বেড়ার কারণে ওপারে আর ফিরতে পারছে না।” তিনি আরও জানান, আটকে পড়া এই দলে প্রাপ্তবয়স্ক হাতির সঙ্গে রয়েছে বেশ কয়েকটি হস্তিশাবক। এই শাবকগুলি বড় হয়ে উঠলে এই ক্ষুদ্র ভূখণ্ডে হাতির সংখ্যা মারাত্মক বৃদ্ধি পাবে, তখন বাসস্থান ও খাদ্যের জোগান সামলাতে ভবিষ্যতে হাতিদের জন্য ‘পরিবার পরিকল্পনা’র মতো নজিরবিহীন পদক্ষেপের কথাও ভাবতে হতে পারে।

সমস্যাটি কেবল বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই, শুরু হয়েছে কূটনৈতিক তৎপরতাও। বাংলাদেশের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, সীমান্তে ভারত বাধার সৃষ্টি করায় হাতিগুলি আর ফিরতে পারছে না। সুন্দরবনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সেখানে যেভাবে বাঘেদের অবাধ বিচরণের স্বার্থে সীমানা উন্মুক্ত রাখা হয়েছে, ঠিক সেভাবেই হাতির ক্ষেত্রেও করিডোর খুলে দেওয়া প্রয়োজন। ইতিমধ্যেই বিষয়টি নিয়ে ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে প্রাথমিক কথা হয়েছে এবং দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে করিডোর পুনরুদ্ধারের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তোলা হচ্ছে।

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে অবরুদ্ধ পরিযায়ী হাতির দল

যদিও আন্তর্জাতিক সীমানায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়া এই প্রাণীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে মেঘালয় রাজ্য বন দপ্তরের প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হলে তাদের তরফ থেকে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।