Home খবর রাজার ছেলে যখন বিদ্রোহী

রাজার ছেলে যখন বিদ্রোহী

0 comments 4 views
A+A-
Reset

একসময় ওর্বানের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বৃত্তের মানুষ ছিলেন পেতার মাগিয়ার। বিয়ে করেছিলেন সরকারের মন্ত্রীকে। তারপর একদিন সব ছেড়ে দিলেন এবং হয়ে উঠলেন হাঙ্গেরির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চমক

বাংলাস্ফিয়ার: কুড়ি বছর আগের কথা। বুদাপেস্টের রাস্তায় তখন দুর্নীতিবিরোধী বিক্ষোভ। সেই মিছিলে যোগ দেওয়া এক তরুণ আইনজীবী গ্রেফতার হওয়া প্রতিবাদীদের পক্ষে একটি সাহায‍্যকারী দল গড়লেন। নাম দিলেন: “ভয় পেয়োনা।” সেই বিক্ষোভের মুখ ছিলেন তখনকার বিরোধী দলের নেতা ভিক্তর ওর্বান — যাঁর পরবর্তী দেড় দশকের শাসন হাঙ্গেরিকে বদলে দেবে চেনা থেকে অচেনায়।

সেই তরুণ আইনজীবী ছিলেন পেতার মাগিয়ার। সেই একই স্লোগান — “ভয় পেয়ো না” — হাতে নিয়ে তিনি আজ দাঁড়িয়েছেন ওর্বানের বিপরীতে।

এটা শুধু রাজনীতির গল্প নয়। এটা একজন মানুষের ভেতর থেকে বদলে যাওয়ার গল্প , বিশ্বাসভঙ্গ, বিবাহবিচ্ছেদ, কেলেঙ্কারি এবং একটি ক্ষমতার বৃত্ত ছেড়ে বেরিয়ে আসার গল্প, যে বৃত্তে তিনি একদিন নিজেই ছিলেন।

“এটা দারুণ একটা গল্প — সবচেয়ে ছোট রাজপুত্র, মানুষের হারানো সন্তান। ডেভিড বনাম গোলিয়াথ। সবাই এর সঙ্গে নিজেদের মেলাতে পারে।”

— বালিন্ত রুফ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

 

ক্ষমতার বৃত্তের ভেতর থেকে

পেতার মাগিয়ার বড় হয়েছেন বুদাপেস্টের পাহাড়ি অভিজাত পাড়ায়, রক্ষণশীল, সচ্ছল পরিবারে। পরিবারে আইনজীবী, বিচারক  এমনকি ওর্বানের প্রথম মেয়াদে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ফেরেন্ৎস মাদলও তাঁর আত্মীয়। ২০০৩ সালে যোগ দিলেন ওর্বানের ফিদেজ পার্টিতে। ২০০৬ সালে বিয়ে করলেন ইউদিত ভার্গাকে , দলেরই এক উচ্চাভিলাষী নেত্রী।

কিছুকাল ব্রাসেলসে কাটল। ভার্গা কাজ করতেন ফিদেজের একজন ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্যের অফিসে, মাগিয়ার কূটনৈতিক পদে। ২০১৮ সালে দেশে ফিরে ভার্গা হলেন বিচারমন্ত্রী। মাগিয়ার ছিলেন পর্দার আড়ালে ,ওর্বান ঘরানার বিশ্বস্ত একজন।

কিন্তু তারপর এলো সেই কেলেঙ্কারি, যা সব বদলে দিল।

যে কেলেঙ্কারি সব ওলটপালট করে দিল

২০২৩ সালের শেষে হাঙ্গেরিতে একটি শিশু যৌন নিপীড়নের মামলায় ক্ষমা প্রার্থনা মঞ্জুর করা নিয়ে  তীব্র জনরোষ ছড়িয়ে পড়ে। একটি শিশুদের হোমে নিপীড়নের ঘটনা ধামাচাপা দিতে সাহায্য করার দায়ে দোষী ব্যক্তিকে ক্ষমা করা হয়েছিল  এবং সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িত ছিলেন রাষ্ট্রপতি কাতালিন নোভাক ও বিচারমন্ত্রী ইউদিত ভার্গা। দুজনকেই পদত্যাগ করতে হোল জনমতের চাপে।

ভার্গার পতনের পর মাগিয়ার প্রকাশ্যে এলেন। প্রকাশ করলেন তাঁদের ব্যক্তিগত কথোপকথনের রেকর্ডিং, যেখানে ভার্গা রাজনৈতিক সংবেদনশীল মামলায় সরকারের হস্তক্ষেপের অভিযোগ করেছিলেন। ভার্গা তাঁকে বিশ্বাসঘাতকতার দায়ে অভিযুক্ত করলেন। বিবাহেও ইতি পড়ল , পারস্পরিক তিক্ততায়, গৃহহিংসার অভিযোগে, যা মাগিয়ার অস্বীকার করেছেন।

মাগিয়ার, ২০২৪ সালে লেখা এক খোলা চিঠিতে:

“দীর্ঘদিন ধরে আমি বিশ্বাস করতাম আমি একজন দেশপ্রেমিক, স্বাধীন হাঙ্গেরির আদর্শে। কিন্তু ক্রমশ বুঝলাম  এটা আসলে একটি রাজনৈতিক পণ্য, যার মোড়কের ভেতরে আছে শুধু ক্ষমতার চিরস্থায়িত্ব আর বিপুল সম্পদ আহরণ।”

ফিদেজ ছেড়ে দিলেন মাগিয়ার। বললেন, দলটি দুর্নীতিগ্রস্ত, নৈতিকভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে এবং নারীদের বলির পাঁঠা বানাচ্ছে। ওর্বান ও তাঁর চিফ অব স্টাফকে বললেন “নারীর আঁচলে লুকিয়ে থাকা” দুই ব‍্যক্তি।

মিম, কলা এবং ভাইরাল রাজনীতি

ওর্বান-পন্থী মিডিয়া মাগিয়ারকে ঘায়েল করতে উঠেপড়ে লাগল। একটি ভিডিওতে তাঁকে নিয়ে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ উপহাস করা হলো। মাগিয়ার পাল্টা দিলেন, কলা হাতে ছবি পোস্ট করে, কলার শেক বানিয়ে। পোস্ট মুহূর্তে ভাইরাল। সরকারকে বোকা বানানোর জন্য ব্যবহার করলেন জোকার ইমোজি।

তিনি আক্রমণের জবাব দেন না, আক্রমণকে নতুন আকার দেন। এটা অপ্রচলিত — কিন্তু কার্যকর।”

— তামাস তোপোলানস্কি, চলচ্চিত্র পরিচালক, তথ্যচিত্র ‘স্প্রিং উইন্ড’-এর নির্মাতা

মাগিয়ারের দল তিজার জনমত জরিপে এগিয়ে চলেছে। স্বাধীন জরিপকারী মেডিয়ানের সর্বশেষ সমীক্ষায় তিজা ২৩ পয়েন্টে এগিয়ে। অবশ্য ওর্বান-পন্থী থিঙ্ক-ট্যাঙ্কগুলো বলছে ফিদেজই এগিয়ে।

তুরা শহরের সেই হোটেল

বুদাপেস্টের কাছে ছোট একটি শহর তুরা। মাগিয়ারের একটি প্রচারাভিযানে সেখানে এলেন ইমরে, ৪৫ বছর বয়সী এক সমাজসেবী। বললেন, ওর্বানের জামাতা ইস্তভান তিবোর্ৎস এই শহরেই কিনেছেন একটি প্রাসাদ, বানিয়েছেন বুটিক হোটেল।তাঁর নাম ইমরে।

তিনি বলেন  “শহরের কারও ওই হোটেলে থাকার সামর্থ‍্য নেই। এটুকুই ফিদেজের কারও সম্পর্কে বলা সম্ভব নয়।”

অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ

গত বছর মাগিয়ারের বিরুদ্ধে এলো নতুন অভিযোগ। তাঁর এক প্রাক্তন বান্ধবী ইভেলিন ফোগেল যাঁকে মাগিয়ার বলছেন ফিদেজের গুপ্তচর, তাঁকে ঘিরে একটি কেলেঙ্কারির চেষ্টা হয়েছে বলে দাবি করলেন তিনি।

মাগিয়ার গত বছর  পুলিশের একটি তদন্ত রিপোর্টের অংশ প্রকাশ করেছেন যেখানে নাকি দেখা যাচ্ছে ফিদেজের প্রচার বিভাগের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা ইভেলিনকে তাঁর বিরুদ্ধে তথ্য সংগ্রহ করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি বলছেন, একটি ব্যক্তিগত মিলনের গোপন ভিডিও করা হয়েছিল এমন একটা সময়ে যখন ইভেলিনের সঙ্গে তাঁর কোনও সম্পর্কই ছিলনা এবং ওই ভিডিও দিয়ে তাঁকে ব্ল্যাকমেইলের চেষ্টা হয়েছে। মাদক গ্রহণের অভিযোগ অস্বীকার করে ভিয়েনায় পরীক্ষা দিয়ে প্রমাণ করেছেন তিনি পরিষ্কার।

ইভেলিন নিজে বলছেন, তিনি গোপন রেকর্ডিংয়ের বিষয়ে কিছু জানতেন না এবং তিনি নিজেও অবৈধ নজরদারির শিকার।

“আমি তাঁকে বিয়ে করতে চাই না”

মাগিয়ারের সমর্থনে আয়োজিত এক সভায় সত্তরোর্ধ্ব অনেক মহিলা হাজির ছিলেন। তাঁদের বক্তব‍্য মাগিয়ার “কোনও সাধু নন।” কিন্তু তবু তাঁকেই ভোট দেবেন।

ওলগা, ৬৩ বছর বয়সী শিক্ষিকা: “আমি মাগিয়ারকে বিয়ে করতে চাই না। আমি শুধু চাই তিনি ওর্বানকে সরিয়ে দিন।”

হাঙ্গেরির রাজনীতিতে ষোলো বছর ধরে একটানা ক্ষমতায় ওর্বান — হেলমুট কোল বা আঙ্গেলা মের্কেলের মতো দীর্ঘদিনের আধিপত্য। এতদিনে উদারপন্থী ও বামরা একজোট হয়েছেন, কিন্তু কেউ ওর্বানকে সত্যিকার চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারেননি।

মাগিয়ার ঠিক সময়ে, ঠিক জায়গায় এসেছেন — শিশু নির্যাতনের কেলেঙ্কারির আগুনে যখন সরকার পুড়ছে। তাঁর ইশতেহার ঘরোয়া: সামাজিক সেবা উন্নত করা, মূল্যস্ফীতি ঠেকানো, দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিচার। ইউরোপিয়ন ইউনিয়ন ও ইউক্রেনের ক্ষেত্রে তিনি একেবারেই ওর্বানের সঙ্গে সহমত নন অনেক বেশি নরমপন্থী। তবে তিনিও ঘোর জাতীয়তাবাদী — রাশিয়ার সস্তা জ্বালানির বিকল্প এখনই ছাড়তে নারাজ।

১২ এপ্রিলের নির্বাচনে হাঙ্গেরি ঠিক করবে, ডেভিড এবার গোলিয়াথকে হারাতে পারবে কি না।

ওর্বানের সাবেক বিচারমন্ত্রী, মাগিয়ারের প্রাক্তন স্ত্রী ইউদিত ভার্গা এখন আর রাজনীতিতে নেই। কাঠের কাজ শিখেছেন, নতুন সঙ্গীর সঙ্গে ব্যবসা শুরু করেছেন। ওর্বান তাঁর প্রশংসা করে বলেছেন, তাঁর মধ্যে “প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্যতা আছে।” তিনি ফেরেননি।

একবার শুধু প্রাক্তন স্বামী সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন ভার্গা। বলেছিলেন: “পেতার মাগিয়ার নামক এই সত্তাটি যেখানে পয়েন্ট কুড়োতে পারে — সেই দৌড়ে আমি নেই।”

সময়রেখা

মাগিয়ার: ওর্বানের বন্ধু থেকে শত্রু

২০০৩ – ফিদেজ পার্টিতে যোগ দেন

২০০৬ – ইউদিত ভার্গাকে বিয়ে; ব্রাসেলসে কূটনৈতিক জীবন শুরু

২০১৮ – বুদাপেস্টে ফেরা; ভার্গা হন বিচারমন্ত্রী

২০২৩ – শিশু নির্যাতন কেলেঙ্কারি; ভার্গা ও রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করেন

২০২৪ – ফিদেজ ছেড়ে তিজা পার্টি গঠন; বিবাহবিচ্ছেদ

২০২৬ – ১২ এপ্রিল: হাঙ্গেরির সাধারণ নির্বাচন

জনমত জরিপ

তিজা বনাম ফিদেজ

স্বাধীন জরিপকারী মেডিয়ানের সর্বশেষ সমীক্ষায় তিজা ২৩ পয়েন্ট এগিয়ে। তবে ওর্বান-সমর্থক থিঙ্ক-ট্যাঙ্কগুলো বলছে ফিদেজই এগিয়ে আছে।

মূল ব্যক্তিত্ব

ইউদিত ভার্গা

মাগিয়ারের প্রাক্তন স্ত্রী ও সাবেক বিচারমন্ত্রী। এখন রাজনীতির বাইরে। কাঠমিস্ত্রির কাজ শিখেছেন, নতুন ব্যবসা শুরু করেছেন। ওর্বান তাঁকে “প্রধানমন্ত্রীর যোগ্য” বলেছেন — তিনি ফেরেননি।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles