Home খবর যুদ্ধের সময় আইন কি সত্যিই নীরব হয়ে যায়?

যুদ্ধের সময় আইন কি সত্যিই নীরব হয়ে যায়?

0 comments 6 views
A+A-
Reset

রোমান দার্শনিক সিসেরোর সেই পুরনো উক্তি — Silent enim leges inter arma (“In times of war, the law falls silent”) — আজ আর কেবল দর্শনের পাতায় নেই। সমকালীন বিশ্বরাজনীতির ময়দানে তা নতুন এক ভয়ঙ্কর বাস্তবতা হয়ে উঠছে।

বাংলাস্ফিয়ার: ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক যুদ্ধবিষয়ক বক্তব্য আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি পুরনো প্রশ্নকে নতুন তীক্ষ্ণতায় ফিরিয়ে এনেছে: আন্তর্জাতিক আইন কি কেবল দুর্বলদের জন্য, আর শক্তিশালীদের জন্য ক্ষমতার ভাষাই কি শেষ কথা?

যুদ্ধের ভাষা বদলে যাচ্ছে

বিগত কয়েক দশকে রাষ্ট্রনেতারা যুদ্ধকে ন্যায্যতা দিতে অন্তত একটি আইনি মুখোশ ব্যবহার করতেন। জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরাক আক্রমণের সময় ‘স্ব-রক্ষা’ ও ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’-এর যুক্তি সামনে এনেছিলেন। বারাক ওবামা ড্রোন হামলাকে ‘সুনির্দিষ্ট ও প্রয়োজনীয়’ বলে ব্যাখ্যা করেছিলেন। আইন ভাঙা হলেও, আইনকে অস্বীকার করা হত না বরং নিজের পক্ষে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা চলত।

ট্রাম্পের ভাষায় এই দ্বিধা নেই। তাঁর বক্তব্যে ‘আইন’ কোনও কেন্দ্রীয় ধারণাই নয়, প্রায় অপ্রাসঙ্গিক। যখন তিনি বলেন, “এক রাতেই একটি দেশকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া যায়” বা “একটি সভ্যতা আজ রাতেই শেষ হয়ে যাবে” তখন তা কেবল সামরিক হুমকি নয়। এটি এক ধরনের নৈতিক ও আইনি কাঠামোকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান। যুদ্ধ আর নিয়ন্ত্রিত সহিংসতা থাকে না; তা হয়ে ওঠে শাস্তি, প্রতিশোধ ও প্রদর্শনের রাজনীতি।

“আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন নতুন নয়, কিন্তু নতুন হল এই অনুভূতি যে কোনও নিয়মই আর প্রযোজ্য নয়।”

— ফিলিপ লাজারিনি, জাতিসংঘের ত্রাণ সংস্থার প্রধান

আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের মূলনীতিগুলি কোথায় দাঁড়িয়ে?

ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যানিটেরিয়ান ল (IHL)-এর তিনটি মৌলিক নীতি রয়েছে — ডিস্টিঙ্কশন (যোদ্ধা ও বেসামরিক নাগরিকের মধ্যে পার্থক্য), প্রোপোরশনালিটি (শক্তি প্রয়োগের সীমা) এবং নেসেসিটি (অপরিহার্যতার শর্ত)। কোনও রাষ্ট্রনেতা যখন প্রকাশ্যে বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের হুমকি দেন, তখন তিনি কেবল একটি সামরিক কৌশল ঘোষণা করছেন না, তিনি এই মূলনীতিগুলিকেই অস্বীকার করছেন।

এ কারণেই ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব দ্য রেড ক্রস-এর মতো সংস্থা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তাদের আশঙ্কা কেবল যুদ্ধ আরও ভয়াবহ হওয়ার নয় বরং যুদ্ধের নৈতিক ভিত্তিটিই ভেঙে পড়ার। আইন কেবল নিষেধাজ্ঞা নয়; এটি যুদ্ধের মধ্যেও মানবিকতার একটি ন্যূনতম কাঠামো রক্ষা করে। সেই কাঠামো ভাঙলে যুদ্ধ পরিণত হয় সর্বগ্রাসী ধ্বংসে।

পুরনো সাম্রাজ্যবাদ, নতুন ভাষায়?

ইতিহাসবিদ তেওফিক হামেলের পর্যবেক্ষণ এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, ট্রাম্প নতুন আমেরিকা তৈরি করছেন না বরং পুরনো সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধনীতিকে নতুন ভাষায় প্রকাশ করছেন। শক্তিধর রাষ্ট্র সবসময়ই আইনের সীমা লঙ্ঘন করেছে, কিন্তু আগে সেই লঙ্ঘন ঢাকার অন্তত একটা চেষ্টা থাকত। এখন সেই ভানটুকুও উঠে যাচ্ছে।

তুলনীয় একটি উদাহরণ হল ‘দাহিয়ে নীতি’। ২০০৬ সালে লেবাননে ইসরায়েলি হামলার সময় উঠে আসা এই ধারণায় শত্রুপক্ষের ওপর ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ শক্তি’ প্রয়োগের মাধ্যমে একটি সমাজকে এমনভাবে ভেঙে দেওয়ার কথা বলা হয় যাতে ভবিষ্যতে প্রতিরোধের ইচ্ছাই না থাকে। উভয় ক্ষেত্রেই যুদ্ধকে একটি ‘বার্তা’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

‘দায়মুক্তির সংস্কৃতি’ ও বৈশ্বিক আইন কাঠামোর ভবিষ্যৎ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক আইন কাঠামো — জাতিসংঘ, জেনেভা কনভেনশন, আন্তর্জাতিক আদালত — এর মূল লক্ষ্য ছিল শক্তির ওপর আইনের একটি ন্যূনতম নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু যখন বড় শক্তিগুলিই প্রকাশ্যে এই আইনকে অস্বীকার করে, তখন সেই কাঠামো কার্যত অচল হয়ে পড়ে।

সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রবণতাটিকে বিশ্লেষকরা বলছেন ‘দায়মুক্তির সংস্কৃতি’। যখন রাষ্ট্রনেতারা বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে তাঁদের কোনও কাজের জন্য জবাবদিহি করতে হবে না, তখন আইন আর বাধা থাকে না, হয়ে দাঁড়ায় একটি উপেক্ষণীয় বিষয়।

আইন না শক্তি — এক সন্ধিক্ষণে বিশ্ব

একটি নৈতিক বিতর্কও এ প্রসঙ্গে সামনে আসে: আইন কি সবসময়ই মানতে হবে, এমনকি যখন তা অন্যায়কে রোধ করতে ব্যর্থ? কেউ কেউ যুক্তি দেন — কখনও কখনও আইন ভাঙা প্রয়োজন। কিন্তু এই যুক্তির বিপদ হল, এটি খুব সহজেই যে কোনও শক্তিশালী রাষ্ট্রের অজুহাতে পরিণত হতে পারে। যদি প্রত্যেকে নিজের মতো ‘ন্যায়’ নির্ধারণ করে, তাহলে আন্তর্জাতিক আইন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে।

এভাবেই আমরা এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। একদিকে আইন যা অসম্পূর্ণ, ধীর, কিন্তু একটি ন্যূনতম নৈতিক কাঠামো প্রদান করে। অন্যদিকে শক্তি যা দ্রুত, কার্যকর, কিন্তু সীমাহীন হলে ধ্বংসাত্মক। ট্রাম্পের যুদ্ধবাগ্মিতা এই দ্বিতীয় দিকটিকেই বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে, যেখানে আইনকে দেখা হচ্ছে দুর্বলতা হিসেবে।

এই প্রবণতা সাময়িক কি না তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে যদি তা স্থায়ী হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আবার সেই পুরনো অবস্থায় ফিরে যাবে, যেখানে might makes right — শক্তিই সত্য। এবং আইন হয়ে উঠবে কেবল একটি অলংকার মাত্র।

 

বিষয়টি কেবল ট্রাম্প বা আমেরিকার নয়। এটি একটি বৃহত্তর প্রশ্ন — মানবসভ্যতা কি যুদ্ধের মধ্যেও কিছু নিয়ম মানতে চায়, নাকি সম্পূর্ণ অবাধ সহিংসতার দিকে ফিরে যেতে প্রস্তুত? যদি দ্বিতীয় পথ বেছে নেওয়া হয়, তাহলে Silent enim leges inter arma আর একটি সতর্কবাণী থাকবে না, তা হয়ে উঠবে আমাদের সময়ের নির্মম বাস্তবতা।

 

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles