বাংলাস্ফিয়ার: গণতন্ত্রের পতন আজ আর কোনো নাটকীয় দৃশ্য নয়—ট্যাঙ্কের গর্জন, সামরিক অভ্যুত্থান, অথবা একদিনে সংবিধান ছিঁড়ে ফেলার ঘটনা দিয়ে তা শুরু হয় না। বরং আধুনিক রাষ্ট্রে গণতন্ত্র ভাঙে অনেক বেশি নিঃশব্দে, অনেক বেশি শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে—আইনের ভেতর দিয়েই। এই প্রক্রিয়াকে বোঝার জন্য “democratic backsliding” ধারণাটি সবচেয়ে কার্যকর। কারণ এখানে ধ্বংসের উপকরণই হয় গণতন্ত্রের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান—সংসদ, আদালত, আইন, নির্বাচন।
ইজরায়েলের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন এই প্রক্রিয়ার একটি পাঠ্যবই-সম উদাহরণ। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, সবকিছু স্বাভাবিক—সংসদে ভোট হচ্ছে, আইন পাস হচ্ছে, নির্বাচন নির্ধারিত সময়ে হচ্ছে। কিন্তু এই কাঠামোর ভেতরেই ধীরে ধীরে একটি মৌলিক পরিবর্তন ঘটছে—রাষ্ট্রের চরিত্র বদলে যাচ্ছে, অথচ তার গণতান্ত্রিক মুখোশ অক্ষুণ্ণ থাকছে।
এই পরিবর্তনের প্রথম লক্ষণ দেখা যায় আইনের প্রকৃতিতে। আইন আর নিরপেক্ষ থাকে না; তা হয়ে ওঠে রাজনৈতিক অস্ত্র। যখন একই অপরাধের জন্য ভিন্ন গোষ্ঠীর জন্য ভিন্ন শাস্তির বিধান তৈরি হয়, তখন আইনের শাসন আর থাকে না, থাকে শাসকের আইন। আইনের সামনে সমতার যে নীতির ওপর গণতন্ত্র দাঁড়িয়ে, সেটিই প্রথম ভেঙে পড়ে। এই ভাঙন একদিনে ঘটে না, বরং একটি “নিউ নরম্যাল” তৈরি হয়, যেখানে বৈষম্যকে আইনসম্মত বলে প্রতিষ্ঠা করা হয়।
এর সঙ্গে সমান্তরালে চলে বিচারব্যবস্থার ওপর আক্রমণ। গণতন্ত্রে আদালত শেষ আশ্রয়স্থল যেখানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারকে চ্যালেঞ্জ করা যায়। তাই গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণের পথে থাকা যে কোনো সরকার প্রথমেই বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতাকে সীমিত করতে চায়। কখনও তা হয় আইনি সংস্কারের নামে, কখনও বিচারকদের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলে। আদালতকে “জনগণের শত্রু” বা “deep state”-এর অংশ হিসেবে চিত্রিত করা হয়, যাতে তাদের সিদ্ধান্তকে অগ্রাহ্য করার নৈতিক অনুমোদন তৈরি হয়। ফলে আদালত যদি কোনো অন্যায় আইন বাতিল করে, সেটিকে আর ন্যায়বিচার হিসেবে দেখা হয় না বরং “জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র” হিসেবে তুলে ধরা হয়।
তৃতীয় স্তম্ভটি হল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দখল। গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনের ওপর নির্ভর করে না; এটি নির্ভর করে সেই সমস্ত প্রতিষ্ঠানের ওপর, যেগুলি সরকারের ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ রাখে—পুলিশ, প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন, বিশ্ববিদ্যালয়, গণমাধ্যম। যখন এই প্রতিষ্ঠানগুলি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তখন ক্ষমতার ওপর যে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ থাকার কথা, তা ভেঙে পড়ে। বাইরে থেকে কাঠামো একই থাকে, কিন্তু ভেতরে তার কার্যকারিতা বদলে যায়।
এই পুরো প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গভীর প্রভাব পড়ে নাগরিকত্বের ধারণায়। গণতন্ত্রে নাগরিকত্ব মানে শুধু ভূখণ্ডে বসবাস নয়; এর সঙ্গে যুক্ত থাকে অধিকার—ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনি সুরক্ষা। কিন্তু যখন একটি রাষ্ট্র তার নিয়ন্ত্রণাধীন বিপুল জনসংখ্যাকে এই অধিকারগুলি থেকে বঞ্চিত করে, তখন একটি দ্বৈত ব্যবস্থা তৈরি হয়—একই রাষ্ট্রে দুই ধরনের মানুষ, দুই ধরনের অধিকার। এটি কেবল নৈতিক সমস্যা নয়, এটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তিকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে। কারণ গণতন্ত্রের মূল ধারণাই হল—যারা শাসনের আওতায়, তারাই শাসনের অংশীদার।
এই অবস্থায় জাতীয়তাবাদী মতাদর্শ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। রাষ্ট্র যখন নাগরিকত্বকে আইনি নয়, জাতিগত বা ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করতে শুরু করে, তখন গণতন্ত্রের অন্তর্নিহিত সমতার ধারণা ভেঙে যায়। “আমাদের জমি”, “আমাদের রাষ্ট্র”—এই ধরনের ভাষা ধীরে ধীরে একটি exclusionary(বর্জনমূলক) রাজনীতি তৈরি করে, যেখানে “আমরা” এবং “ওরা”-র বিভাজনই হয়ে ওঠে রাষ্ট্রচিন্তার কেন্দ্রবিন্দু। এই বিভাজন একসময় আইনি রূপ নেয়, এবং তখন তা আর কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য থাকে না, রাষ্ট্রের নীতিতে পরিণত হয়।
তবে এই পুরো প্রক্রিয়া সফল হয় কেবল তখনই, যখন সমাজে একটি বিশেষ মানসিক অবস্থা তৈরি হয়—যাকে বলা যায় “democratic fatigue”। দীর্ঘ সংঘাত, নিরাপত্তাহীনতা, অর্থনৈতিক চাপ—এই সবের মধ্যে মানুষ ধীরে ধীরে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি উদাসীন হয়ে পড়ে। তারা স্থিতিশীলতা চায়, নিরাপত্তা চায়, এবং সেই বিনিময়ে স্বাধীনতার কিছু অংশ ছেড়ে দিতে প্রস্তুত হয়। এই মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন ছাড়া গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণ এত দূর এগোতে পারে না।
সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটি হল—এই পুরো প্রক্রিয়া আইনসম্মত। কোনো সংবিধান ভাঙা হচ্ছে না, কোনো নির্বাচন বাতিল করা হচ্ছে না। বরং সবকিছু নিয়ম মেনেই হচ্ছে। কিন্তু সেই নিয়মগুলিই এমনভাবে বদলে দেওয়া হচ্ছে, যাতে গণতন্ত্রের মূল চেতনা—সমতা, স্বাধীনতা, জবাবদিহিতা ধীরে ধীরে নিষ্প্রভ হয়ে যায়।
অতএব, গণতন্ত্রের সংকটকে বোঝার জন্য কেবল বাহ্যিক লক্ষণ দেখা যথেষ্ট নয়। প্রশ্নটি হল—রাষ্ট্রের ভেতরে ক্ষমতার বণ্টন কীভাবে বদলাচ্ছে, আইনের চরিত্র কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে, এবং নাগরিকত্বের ধারণা কীভাবে পুনর্গঠিত হচ্ছে। যখন এই তিনটি স্তম্ভ একসঙ্গে সরে যেতে শুরু করে, তখন গণতন্ত্র এখনও বিদ্যমান থাকলেও, তার আত্মা আর থাকে না।
ইজরায়েলের বর্তমান পরিস্থিতি সেই জটিল ও অস্বস্তিকর সত্যটিকেই সামনে আনে—গণতন্ত্রের পতন কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়, বরং একটি পরিকল্পিত, ধাপে ধাপে এগোনো প্রক্রিয়া। এবং সবচেয়ে বড় বিপদ হল, এই পতন ঘটতে ঘটতে অনেক সময় সমাজ বুঝতেই পারে না যে, সে ইতিমধ্যেই সেই সীমারেখা অতিক্রম করে ফেলেছে, যেখান থেকে ফিরে আসা আর সহজ নয়।