বাংলাস্ফিয়ার: মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা বাজছে। ইজরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু এবং উত্তরসূরি হিসেবে আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনির ক্ষমতায় আসার পর গোটা অঞ্চল এক অনিশ্চিত যুদ্ধের কিনারে দাঁড়িয়ে। তবে এই সংঘাত এখন আর কেবল রণক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই—গড়িয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এবং হোয়াইট হাউসের বাগ্‌যুদ্ধে।

সংঘাতের সূত্রপাত

সম্প্রতি সিএনএন ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতার ভাষণের একটি অংশ প্রচার করলে ট্রাম্প প্রশাসন তীব্র সমালোচনায় ফেটে পড়ে। হোয়াইট হাউসের অভিযোগ, সিএনএন শত্রু দেশের প্রচারযন্ত্র হিসেবে কাজ করছে। হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ পরিচালক স্টিভেন চেউং সরাসরি সিএনএন-কে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সরকারি মুখপত্র ‘প্রাভদা’-র সঙ্গে তুলনা করেন। প্রশাসনের বক্তব্য, মার্কিন নাগরিকদের হত্যাকারী একটি শাসকের বক্তব্য প্রচার করা সাংবাদিকতার নৈতিকতার পরিপন্থী।

সিএনএন-এর পাল্টা যুক্তি

সিএনএন এবং অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের একটি বড় অংশ এই অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁদের যুক্তি, যুদ্ধের এই নাজুক পরিস্থিতিতে প্রতিপক্ষের অবস্থান এবং পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে অবহিত রাখা সাংবাদিকতার মৌলিক দায়িত্ব।

উল্লেখ্য, আয়াতুল্লাহর ওই ভাষণে তেল সরবরাহ বন্ধ করা এবং প্রতিবেশী আরব দেশগুলোতে হামলার হুমকি ছিল, যা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য সরাসরি প্রাসঙ্গিক। এছাড়া সিএনএন পুরো ভাষণ সরাসরি প্রচার না করে অনুবাদ ও বিশ্লেষণসহ তা উপস্থাপন করেছে। চ্যানেলের সংবাদদাতা নিক প্যাটন ওয়ালশ পর্যবেক্ষণ করেন যে, সর্বোচ্চ নেতা সশরীরে উপস্থিত না হয়ে লিখিত বার্তা পাঠিয়েছেন যা তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয় এবং নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ।

অসংগতি ও প্রশাসনের দ্বিমুখী অবস্থান

তবে ট্রাম্প প্রশাসনের এই অবস্থানে স্পষ্ট অসংগতি চোখে পড়ছে। ট্রাম্প প্রশাসন যখন সিএনএন-কে আক্রমণ করছে, তখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইলন মাস্কের মালিকানাধীন সামাজিক মাধ্যম ‘এক্স’ (X)-এ ইরানি নেতাদের ভেরিফাইড অ্যাকাউন্ট সচল রয়েছে। সেখানে নিয়মিতভাবে মার্কিনবিরোধী এবং প্রতিশোধমূলক বার্তা পোস্ট করা হচ্ছে। এছাড়া অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (AP) বা নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর মতো প্রথম সারির গণমাধ্যমগুলোও এই খবরটি গুরুত্বের সাথে প্রচার করেছে। ফলে কেবল সিএনএন-কে আলাদাভাবে লক্ষ্যবস্তু করার পেছনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কাজ করছে কি না, সেই প্রশ্ন এখন জোরালো হচ্ছে।

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

শত্রু দেশের নেতার বক্তব্য প্রচার করা মার্কিন সাংবাদিকতায় নজিরবিহীন নয়। ১৯৭৯ সালে ইরান যখন মার্কিন নাগরিকদের জিম্মি করে রেখেছিল, তখনো কিংবদন্তি সাংবাদিক মাইক ওয়ালেস আয়াতুল্লাহ খোমেনির সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। সাংবাদিকতার মূল লক্ষ্যই হলো পর্দার আড়ালের সত্য এবং প্রতিপক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি জনগণের সামনে তুলে ধরা, যাতে তারা পরিস্থিতির গভীরতা বুঝতে পারে।

বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন

ইতিহাসবিদ ডগলাস ব্রিঙ্কলি এই পরিস্থিতিকে “কঠিন ভারসাম্য” রক্ষার লড়াই বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, একদিকে সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করতে হয় যে তারা কোনো স্বৈরাচারী শাসনের প্রচারের হাতিয়ার হয়ে উঠছে না, অন্যদিকে প্রতিপক্ষের শান্তিকামী বা আক্রমণাত্মক ইঙ্গিত খুঁজে বের করাও তাদের অনিবার্য দায়িত্ব।

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের ময়দানে সত্যের যেমন অপমৃত্যু ঘটে, তেমনি তথ্যের অবাধ প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে সাধারণ মানুষের বিভ্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কেবল বাড়ে। সে কারণেই সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকীয় স্বাধীনতার প্রশ্নটি কেবল সাংবাদিকতার গণ্ডিতে আটকে নেই—এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ বলেও তাঁরা মনে করেন।