বাংলাস্ফিয়ার: ১৯৬২ সালে এক সপ্তাহ ধরে ফরাসি পরিচালক ফাঁসোয়া ক্রফো আলফ্রেড হিচকককে ইন্টারভিউ করেন। ক্রফোর কাছে হিচকক ছিলেন তাঁর “অট্যর থিওরি”-র আদর্শ উদাহরণ-এই তত্ত্ব অনুযায়ী, একটা ছবির আসল লেখক হলেন পরিচালক নিজেই। সিনেমা বানাতে অনেক মানুষ জড়িত থাকলেও, শেষ পর্যন্ত পরিচালকের দৃষ্টিভঙ্গিই ছবির ওপর নিজের ছাপ ফেলে।

এই তত্ত্ব নিয়ে আজও তর্ক চলে, কিন্তু সেই ইন্টারভিউগুলো সিনেমাকে শুধু বিনোদন নয়, একধরনের শিল্প হিসেবে ভাবার ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। তখনকার “পুরনো প্রজন্মের” এক কিংবদন্তি আর “নিউ ওয়েভ”-এর এক তরুণ বিদ্রোহী একসঙ্গে বসে সিনেমা নিয়ে সিরিয়াস আলোচনা করেছিলেন, সেটা তখন একেবারেই নতুন ব্যাপার ছিল। আজ অবশ্য এমন দৃশ্য আমরা প্রায়ই দেখি-অ্যাওয়ার্ড সিজনে Variety বা Hollywood Reporter-এর রাউন্ডটেবিল আলোচনায় প্রবীণ পরিচালকরা তরুণদের প্রশংসা কুড়োন। কিন্তু হিচকক-ক্রফো কথোপকথন থেকে কিছু ধারণা তৈরি হয়েছিল, যেগুলো আজও বারবার উদ্ধৃত হয়।
তার মধ্যে অন্যতম হল হিচককের খাঁটি সিনেমার ধারণা। হিচকক বলেছিলেন, নির্বাক সিনেমাই ছিল সবচেয়ে বিশুদ্ধ রূপের সিনেমা। সেখানে শব্দ আর সংলাপ ছিল না কিন্তু তাই বলে শব্দ যোগ হওয়াটাকে তিনি সিনেমার ক্ষতি বলেননি। তাঁর বক্তব্য আজকের অনেক সিনেমাই আসলে “লোকজন কথা বলছে, তার ছবি” ছাড়া কিছুই নয়। সিনেমার গল্প আবেগ দেখিয়ে বলতে হবে, কথা দিয়ে নয়। সংলাপ ব্যবহার করা উচিত শুধু তখনই যখন অন্য কোনও উপায় নেই।
কিন্তু আজকের সিনেমা ঠিক উল্টো পথে হাঁটছে। এখনকার স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোতে এমন সংলাপ খুব সাধারণ হয়ে গেছে যেখানে চরিত্ররা নিজেরাই বলে দেয় তারা কী করছে বা কী অনুভব করছে। কারণ ধরে নেওয়া হয়, দর্শক ফোনে চোখ রেখে ‘সেকেন্ড স্ক্রিনিং’ করছে। এই প্রবণতা নিয়ে ইতিমধ্যেই সমালোচনা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে সিনেমার ছবিও হয়ে উঠেছে একঘেয়ে। সবকিছু অতিরিক্ত আলোয় তোলা, সব ফোকাসে, নিখুঁত রেজোলিউশন, দেখতে ঝকঝকে, কিন্তু প্রাণহীন। ছবিতে বলার মতো কিছু নেই, সংলাপই সব ব্যাখ্যা করে দেয়।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে এমন অন্তঃসারশূন্য সিনেমা বানানোর দরকারটাই বা কী? উত্তর একটাই: টাকা। ‘দেখা’ আর ‘দেখে ফেলা’-র মধ্যে পার্থক্য আছে। সিনেমা দেখা মানে মন দিয়ে মনোযোগ দেওয়া। কিন্তু শুধু চোখে পড়া মানে প্যাসিভ থাকা। চোখে দেখতে হলে তাকাতে হয়, কিন্তু কানে শুনতে আলাদা করে মন দিতে হয় না, কান সবসময় খোলা থাকে। এই কারণেই আজকের সিনেমা দর্শকের পুরো মনোযোগ চায় না। হিচককের মতে, তাই এগুলো আর প্রকৃত অর্থে “সিনেমা” নয়। পাশ্চাত্য সমাজে মানুষ চোখের ওপর বেশি ভরসা করে, ল”নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস নয়”। এ কারণেই সিনেমার সাংস্কৃতিক গুরুত্ব এত বেশি। কিন্তু আজকের দিনে ছবির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে হাজার রকমের বস্তু- সোশ্যাল মিডিয়া, বিজ্ঞাপন, অ্যাপ, স্ক্রল করা ভিডিও। সবকিছুই চোখে পড়ার মতো করে বানানো, কিন্তু সবই দেখতে একরকম। নিওন রঙ, বড় ফন্ট, 4K HDR-কিন্তু কোথাও কোনও দাগ নেই, কোনও ঝুঁকি নেই। এখন আর ছবি গল্প বলে না, বরং তার ‘কনটেক্সট’ সব কিছু ঠিক করে দেয়। কোন অ্যাপে দেখছি, কোন ফ্যাঞ্চাইজের অংশ, কোন ট্রেন্ডের সঙ্গে যুক্ত এই সব জানলেই আমরা বুঝে যাই কী ভাবতে হবে। শব্দ এখানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নেয়। শব্দ আমাদের জানিয়ে দেয় আমরা কোথায় আছি, কী অনুভব করা উচিত। একটা ছবি যদি নির্বাক হয়, তাহলে আমাদের নিজেকেই অর্থ খুঁজে নিতে হয়। ঠিক যেমন মিউজিয়ামে ঝোলানো একটা ছবি-চারপাশের আওয়াজ তার সঙ্গে মেলে না, তাই মন দিয়ে তাকাতে হয়। এক সময় সিনেমা মানেই ছিল অন্ধকার হলে বসে বাইরের দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মন দিয়ে দেখা। এখন স্ট্রিমিং-এর যুগে সিনেমা ঢুকে পড়েছে আমাদের ঘরের ভেতর, দৈনন্দিন জীবনের সব ঝামেলার সঙ্গে। ফলে চোখের গুরুত্ব আরও কমে গেছে। হিচকক চাইতেন সিনেমা হোক চলমান ছবি, একটা মুভিং পেইন্টিং। কিন্তু যত বেশি সংলাপ, শব্দ আর বিভ্রান্তি যোগ হচ্ছে, তত কম মনোযোগ দিতে হচ্ছে। আজ ছবিটা শুধু ওপরের একটা স্তর, ভেতরের অর্থ সবই আসে শব্দ আর প্রেক্ষাপট থেকে। হিচকক বা ক্রফো সব বিষয়ে ঠিক ছিলেন কি না, সেটা আলাদা প্রশ্ন। কিন্তু এটা অস্বীকার করার উপায় নেই আজকের সিনেমা আর চোখের জন্য বানানো শিল্প নয়। শোনাটাই মুখ্য হয়ে গেছে। আর সেই অর্থে, সিনেমা অনেক আগেই তার ভিজুয়াল মাধ্যমের পরিচয় হারিয়েছে।