বাংলাস্ফিয়ার: আকাইচি সানায়ে জাপানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে কার্যত বাজি রেখে
হঠাৎ নির্বাচনের ডাক দিয়েছিলেন। সেই বাজি কাজে লেগেছে। ৮ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে শাসক লিবারাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি
(এলডিপি) নিরঙ্কুশ সাফল্য পেয়েছে। ভোটগণনা তখনও চলছিল, তবু স্পষ্ট হয়ে যায়—সংসদের সবচেয়ে ক্ষমতাবান
নিম্নকক্ষে এলডিপি ইতিমধ্যেই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছে; জোটসঙ্গীর সমর্থন যোগ করার আগেই দুই-তৃতীয়াংশ সুপারমেজরিটির দোরগোড়ায় দলটি। এই ফল একদিকে যেমন রাজস্বনীতিতে ‘ডোভ’ আর নিরাপত্তা প্রশ্নে ‘হক’ হিসেবে পরিচিত তাকাইচিকে বিরাট রাজনৈতিক ম্যান্ডেট দিল, তেমনি জাপানের রাজনীতিতে এলডিপির নিরঙ্কুশ আধিপত্যে প্রত্যাবর্তনের সিলমোহরও বসাল।
এমন বিপুল জয় আদৌ অবধারিত ছিল না। গত অক্টোবর মাসে ক্ষমতায় আসার পর থেকে তাকাইচির ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা চোখে পড়ার মতো বাড়তে থাকলেও তাঁর দল ততটা গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। নির্বাচনের ফল দেখিয়ে দিল, তাকাইচির ব্যক্তিগত আকর্ষণ নিজেই এক প্রবল রাজনৈতিক শক্তি। ভোটের আগে জাপানি পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে মোট ৪৬৫ আসনের মধ্যে এলডিপি ও তার বন্ধু সদস্যদের আসন ছিল ২৩৩টি আসন।মানে প্রয়োজনীয় গরিষ্ঠতার তুলনায় মাত্র একটি আসন বেশি। এবার সেখানে তারা অন্তত তারা অন্তত
৩৩০টি আসন পেতে চলেছে।সবচেয়ে খারাপ ফল হয়েছে জাপানের মূলধারার মধ্য-বাম বিরোধী দলগুলির। গতবারের জেতা
আসনগুলির বেশির ভাগ তারা ধরে রাখতে পারেনি। তাতে এলডিপ্-ই লাভবান হয়েছে। ভেঙে পড়াও এলডিপির পক্ষে গেছে।কয়েকটি
নতুন ছোট দল ডায়েটে ঢুকলেও, এলডিপিকে চ্যালেঞ্জ করার মতো শক্তি কারও নেই।
১৯৫৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এলডিপি মাত্র দু’বার ক্ষমতা হারিয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০১২ এই তিন বছরের অস্থির বিরোধী শাসনের পর দলটি আবার আধিপত্য ফিরে পায় তাকাইচির রাজনৈতিক গুরু শিনজো আবের নেতৃত্বে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একের পর এক কেলেঙ্কারিতে দলটি হোঁচট খেয়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরের ভোটে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে সংখ্যালঘু সরকারে পরিণত হয়।
অক্টোবরে দলনেত্রী হিসেবে তাকাইচির দায়িত্ব নেওয়া এবং ইশিনকে নতুন জোটসঙ্গী করা—এই দু’য়ের জোরেই এলডিপি কোনওমতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরিয়েছিল।
তাকাইচি ভোটারদের টেনেছেন পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে, অন্তত পরিবর্তনের চেহারা দেখিয়ে। জাপানের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর মধ্যবিত্ত পটভূমি, সরল, স্পষ্টভাষী ভঙ্গি তাঁকে পূর্বসূরিদের চেয়ে স্বতন্ত্র চেহারা দিয়েছে। থেকে আলাদা একসময় হেভিমেটাল ব্যান্ডে ড্রাম বাজানো এই রাজনীতিক আন্তর্জাতিক মঞ্চেও আত্মবিশ্বাসী, বিশেষ করে জাপানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র দেশের নেতা
ডোনাল্ড ট্রাম্প –এর সঙ্গে। (নির্বাচনের আগে ট্রাম্প প্রকাশ্যেই তাকাইচিকে সমর্থন করেছিলেন।) চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক টানাপোড়েন ঘরোয়া রাজনীতিতে তাঁর অবস্থান আরও শক্ত করেছে। বড়সড় সরকারি ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি কখনও কখনও বন্ড বাজারে কাঁপুনি ধরালেও ভোটারদের কাছে সেগুলো আকর্ষণীয়ই মনে হয়েছে।
নির্বাচনী প্রচারে তাকাইচি কার্যত ঝড় তুলেছিলেন। “কাজ, কাজ, কাজ, কাজ, কাজ”- তাঁর প্রচারে এই অঙ্গীকারই প্রতিধ্বনিত হয়েছে গোটা দেশ জুড়ে। ১২ দিনের প্রচারপর্বে অন্য যে কোনও দলনেতার তুলনায় বেশি পথ পাড়ি দিয়েছেন তিনি—ইয়োমিউরি পত্রিকার হিসাবে মোট ১২,৪৮০ কিলোমিটার। একই সঙ্গে তিনি তাঁর সেকেলে দলটিকে ডিজিটাল যুগে টেনে এনেছেন, সামাজিক মাধ্যমে নিজেকে এক শক্তিশালী উপস্থিতিতে পরিণত করেছেন। বিপরীতে, তড়িঘড়ি গড়া সিআরএ কাউকেই উজ্জীবিত করতে পারেনি। কনস্টিটিউশনাল
ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (যা একসময়কার ডেমোক্র্যাটিক পার্টি অব জাপানের উত্তরসূরি) এবং এলডিপির প্রাক্তন জোটসঙ্গী
কোমেইতো —এই দুইয়ের সংযুক্তি সমন্বয়ের বদলে বিভ্রান্তিই তৈরি করেছে। অনলাইনে দলটির কপালে জুটেছে
বিদ্রূপাত্মক নাম “৫জি”।জাপানি ‘ওজি-সান’ বলতে বয়স্ক লোকেদের বোঝায়। তার সঙ্গেই ছন্দ মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এই
উপহাস কারণ এই শীর্ষ নেতারা সবাই ছিলেন বয়সে খুবই প্রবীণ, রাজনৈতিক ডাইনোসর।
এই নির্বাচন আগামী বহু বছর জাপানের রাজনীতির মানচিত্র বদলে দেবে। সিআরএ–র নেতারা সম্ভবত পদত্যাগ করবেন; জোটটি টিকে থাকবে কি না অনিশ্চিত। ছোট বাম দলগুলিও বড় ধাক্কা খেয়েছে, ইঙ্গিত মিলেছে, আজকের অস্থির বিশ্বেতাদের আদর্শগত শান্তিব বানী ভোটাররা সময়োচিত মনে করছেন না। বরং নতুন আপস্টার্ট দলগুলো তুলনায় বেশি গতিশীল প্রমাণিত হয়েছে। কট্টর ডানপন্থী সানসেইতো (ডু ইট ইয়োরসেল্ফ পার্টি) কয়েকটি আসন পেয়েছে, যদিও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম। আর মে মাসে গঠিত টিম
ফিউচার (মিরাই) চমক জাগিয়েছে এই নির্বাচনে। রাজনীতিতে সদ্যোজাত হয়েও তারা আনুমানিক ৭–১৩টি আসন জিততে চলেছে।
নতুন এই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে এলডিপি বিরোধীদের খোঁচা এবার উপেক্ষা করতে পারবে। তাকাইচি নির্বাচনের পর আরও শক্ত ও নির্ভীক হয়ে উঠবেন। দলের ভেতরের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীরাও নিশ্চুপ থাকবেন, ফলে তিনি দীর্ঘদিন শাসন করার সুযোগ পাবেন। নিম্নকক্ষে সুপারমেজরিটি থাকায় শাসক জোট আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে—উচ্চকক্ষের বিভক্ত অবস্থানও প্রয়োজনে অতিক্রম করা যাবে।
এবার তাকাইচি তাঁর পছন্দের নীতিগুলো এগিয়ে নিতে পারবেন। তিনি “দায়িত্বশীল ও সক্রিয় রাজস্বনীতি”-র কথা বলেছেন—খাদ্যপণ্যে সাময়িক দুই বছরের ভোগকর ছাড় এবং
গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকে সমর্থন দিতে বড় মাপের শিল্পনীতিগত বিনিয়োগ তার অংশ। একই সঙ্গে তিনি জাপানের সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামো জোরদার করতে আরও সংস্কারের পক্ষে। প্রতিরক্ষা শিল্প চাঙা করতে অস্ত্র রফতানির বিধিনিষেধ শিথিল করার কথা বলেছেন; নতুন একটি জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা গঠনের পক্ষেও তিনি। তবে এই সাফল্যের মধ্যেও একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা আছে—দেশের ভেতরের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের দ্রুত সামাল দিলেও, বন্ড বাজারের সতর্ক প্রহরা কিংবা বেজিংয়ের প্রতিপক্ষদের মোকাবিলা করা এত সহজ হবে না।