বাংলাল্ফিয়ারঃ ভারত-মার্কিন বানিজ্য চুক্তির প্রথম জট কেটেছে।এ সংক্রান্ত কাটানোর দ্বিপাক্ষিক বিবৃতিও প্রকাশিত। তার অব্যবহিত পরে বানিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল দাবি করেছিলেন, কৃষকের স্বার্থ বিঘ্নিত হতে পারে এমন একটি কথাও নেই এই চুক্তিতে নেই। থাকবেনা। থাকার প্রশ্ন নেই।
বানিজ্যমন্ত্রীর দাবিতে আস্থা রাখতে পারছেনা সংযুক্ত কিসান মোর্চা। সুর চড়িয়ে তাদের নেতারা দাবি করছেন, কৃষককে অসৎ্য বলার জন্য গোয়েলকে অবিলম্বে ইস্তফা দিতে হবে।আর নরেন্দ্র মোদিকে সতর্ক করে দিয়ে মোর্চার প্রচ্ছন্ন হুমকি তিনি যেন কিছুতেই আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি না করেন। মোর্চার ব্যাখ্যায় এই চুক্তি একটি ছদ্ম কৃষি-সংস্কারের কৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়। আইন করে যা সম্ভব হোলনা, আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার অজুহাতে পিছনের দরজা দিয়ে এবার সেটাই করার চেষ্টা হচ্ছে। লক্ষ্য, ভারতের কৃষি ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলা। তাদের চোখে বিষয়টি খুব পরিষ্কার: ২০২০–২১ সালে যে কৃষি আইন সরকার জোর করে চাপাতে গিয়েছিল এবং গণআন্দোলনের চাপে তুলে নিতে বাধ্য হয়েছিল, সেই একই নীতিগুলি এবার পিছনের দরজা দিয়ে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হচ্ছে বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে।
মোর্চার বক্তব্য তারা গোয়েলের ইস্তফা চাইছেন। ইস্তফা দাবি আসলে তাঁর নীতিগত অবস্থানের জন্য। মোর্চার অভিযোগ, গয়ালের নেতৃত্বে ভারতের বাণিজ্য নীতি কৃষিকে আর জীবিকা বা খাদ্য-নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে দেখছে না, দেখছে নিছক ‘বাজারে প্রবেশ’ আর শুল্ক ভিত্তিক বোঝাপড়ার অঙ্ক হিসেবে। এই দৃষ্টিভঙ্গিতেই কৃষি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, কারণ এতে ন্যূনতম বিক্রয়মূল্য, সরকারি ক্রয় কিংবা সরকারি গুদাম এই সবকিছুকে আন্তর্জাতিক চাপের সামনে “সংস্কারের বাধা” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। গয়াল বহুবার স্পষ্ট করেছেন যে ভারতকে বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। মোর্চার ব্যাখ্যায়, এর অর্থই হোল কৃষককে বলি দেওয়া।
আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আপত্তির কেন্দ্রে আছে শক্তির অসাম্য। মার্কিন কৃষি ব্যবস্থা রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি, কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ এবং জেনেটিকালি মডিফায়েড ফসলের ওপর দাঁড়িয়ে। ভারতের কৃষি দাঁড়িয়ে আছে ছোট ও প্রান্তিক কৃষকের ঘাড়ে, যেখানে কৃষি শুধু উৎপাদন নয়, সামাজিক সুরক্ষার ভিত্তি। এই দুই ব্যবস্থাকে একই চুক্তির কাঠামোয় ঢোকানো মানে ভারতীয় কৃষককে আগেভাগেই হার
মানতে বাধ্য করা। আমেরিকার মূল দাবিগুলি কী? ভারতের কৃষি ভর্তুকি কমাও, এম এস পি কার্যত নিষ্ক্রিয় করো, সরকারি খাদ্য সংগ্রহ সীমিত করো, আর জেনেটিকালি মডিফায়েড ফসলের বাজার খুলে দাও। এগুলোর আলাদা আলাদা করে দেখলে সামান্য মনে হতে পারে, কিন্তু একসঙ্গে হলে এর ফল হবে ভারতের কৃষি সার্বভৌমত্বের অবসান।
এই কারণেই SKM সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে সতর্ক করছে। তাদের বক্তব্য, সংসদে বিতর্ক এড়িয়ে, রাজ্যগুলোর সম্মতি না নিয়ে, কৃষক সংগঠনকে বাইরে রেখে যদি আমেরিকার সঙ্গে কৃষি-সম্পর্কিত কোনও চুক্তিতে সই হয়, তাহলে তা হবে গণতন্ত্রের সঙ্গে প্রতারণা। আইন তুলে নেওয়া যায়, কিন্তু আন্তর্জাতিক চুক্তি একবার সই হলে তা কার্যত অপরিবর্তনীয়। কৃষকরা এটাকে খুব ভালো করেই বোঝে—এ
কারণেই তাদের আগাম প্রতিবাদ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হল, সংযুক্ত কিসান মোর্চা বিশ্বাস করে সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে “বাণিজ্য” শব্দটাকে ঢাল হিসেবে
ব্যবহার করছে। কৃষি আইন বললে মানুষ রাস্তায় নামবে, কিন্তু “ইন্টারিম ট্রেড এগ্রিমেন্ট” বা “বাইল্যাটারাল ডিল” বললে
বিষয়টা টেকনোক্র্যাটিক হয়ে যায়, আলোচনার বাইরে চলে যায়। মোর্চার বক্তব্য তারা এই ফাঁদটি ধরে ফেলেছে। তাই
তারা বলছে, এই চুক্তি শুধু শুল্ক বা রফতানির প্রশ্ন নয়, এটি নির্ধারণ করবে আগামী দশকে ভারতে কৃষকের অস্তিত্ব থাকবে কি না আর থাকলেও কোন অবস্থায় থাকবে।
সোজা কথা, পীযূষ গয়ালের ইস্তফা দাবি আর আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির বিরোধিতা এই দুটো একই লড়াইয়ের অংশ। একদিকে সেই মন্ত্রী, যিনি কৃষিকে বাজারের অঙ্কে নামাচ্ছেন; অন্যদিকে সেই চুক্তি, যা কৃষিকে আন্তর্জাতিক পুঁজির হাতে তুলে দেবে। মোর্চা বলছে, এই দুটোই তারা মানবে না।