বাংলাস্ফিয়ার: সংবাদমাধ্যমের প্রতি বিরাগ, স্বাধীনতার অবক্ষয় এবং ক্ষমতার লাগামহীন দুর্নীতির বিপজ্জনক চক্র।
সাংবাদিকরা অনেক সময়ই বিরক্তিকর। তাঁরা অনেক সময় বিষয়কে অতি-সরল করে ফেলেন, বাড়িয়ে বলেন, কখনও কখনও
অমার্জনীয় ভুলও করে বসেন। তাঁরা সংখ্যাগরিষ্ঠভাবে বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত এবং সামান্য বামঘেঁষা।
ফলে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রায়ই সমাজের বৃহত্তর অংশের সঙ্গে খাপ খায়না। আর তাঁরা অনৈতিক আচরণও করেন।যেমন,
বিবিসির প্যানোরামা অনুষ্ঠানটি যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য এমনভাবে জোড়াতালি দিয়ে দেখিয়েছিল যে তা
চরম বিভ্রান্তিকর হয়ে উঠেছিল।তখন মানুষের ক্ষোভ হওয়াই স্বাভাবিক। ধনী বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের প্রতি আস্থা কমেছে, বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমের আবির্ভাবের পর। অথচ এই মাধ্যমই সবচেয়ে বেশি গুজব ছড়ায়, অসৎ পরিবেশন করে। তাই সাংবাদিকতা সঙ্কটাপন্ন একথা শুনে হয়তো আপনারা বিচলিত হননা, কেউ কেউ বেশ খুশিই হন। কিন্তু আপনাদের স্বার্থেই বিচলিত হওয়া দরকার।
বিশ্বজুড়ে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কমছে তো কমছেই। বিশ্বজুড়ে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার চিত্রটি ভয়াবহ।।রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (আরএসএফ) নামের একটি নজরদারি সংস্থার তৈরি সূচক অনুযায়ী, ২০১৪ সালের পর থেকে বিশ্বব্যাপী পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। যে স্কোর একসময় আমেরিকার বর্তমান অবস্থার চেয়েও ভালো ছিল, এখন নেমে এসেছে সার্বিয়ার মতো জায়গায়, যেখানে দুর্নীতিবিরোধী বিক্ষোভ কভার করা সাংবাদিকদের নিয়মিত পুলিশ মারধর করে।
এর গুরুত্ব একাধিক কারণে গভীর। শুধু এই জন্য নয় যে বাকস্বাধীনতা অন্য সব স্বাধীনতার ভিত্তি। তার থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সমালোচনামূলক সাংবাদিকতা রাষ্ট্রক্ষমতার ওপর একটি অপরিহার্য নিয়ন্ত্রণ। ক্ষমতাবানরা যদি জানে যে তাদের অপব্যবহার প্রকাশ্যে আসবে না, প্রচারিত হবে না, তাহলে তারা আরও বেশি করে সেই অপব্যবহার করতে উৎসাহিত হবেই।
দ্য ইকোনমিস্ট প্রায় ১৮০টি দেশের গত ৮০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করেছে। এই তথ্য সংগ্রহ করেছে সুইডেনের গবেষণা
প্রকল্প ভি-ডেম। সেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে দেশে সংবাদমাধ্যম সবচেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রিত সেখানেই সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি। প্রক্রিয়াটি মোটামুটি এই রকম: যারা জনগণের অর্থ লুটতে চায়, তারাই সবচেয়ে বেশি করে সংবাদ মাধ্যমের গলা টিপে ধরতে চায়। যত বেশি শক্ত করে গলা টিপে ধরা যায়, তত সহজে চুরি করা যায়। আর যত বেশি অপরাধ গোপন করতে হয়, ভবিষ্যতের সমালোচনামূলক রিপোর্টিং দমিয়ে রাখার তত বেশি প্রয়োজন হয়। আমাদের হিসেব বলছে, যদি সংবাদস্বাধীনতা “কানাডার মতো ভালো” অবস্থা থেকে “ইন্দোনেশিয়ার মতো খারাপ” অবস্থায় নামে, তাহলে দুর্নীতিও “আয়ারল্যান্ডের মতো পরিষ্কার” থেকে “লাটভিয়ার মতো
নোংরা” হয়ে ওঠার পরিষ্কার ইঙ্গিত মেলে। এই প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে, কয়েক বছর ধরে ছড়ায়, এতটাই ধীরে যে ভোটাররা পরের
নির্বাচনের আগে বিষয়টি টের নাও পেতে পারেন। তথাকথিত পপুলিস্ট সরকারের অধীনে এই অবনতি আরও তীব্র হয় কারণ
তারা সমালোচকদের শত্রু বানায় এবং যে প্রতিষ্ঠানগুলি তাদের ক্ষমতার খবর্দারি করে সেগুলিকে গুঁড়িয়ে দিতে চায়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রবণতাগুলির একটি হল—যে সরকারগুলি নিজেদের গণতান্ত্রিক বলে দাবি করে, তারাই
ক্রমশ স্বৈরাচারী শাসনের কৌশল ধার করছে। তারা সাধারণত সত্যকথা বলা মানুষদের পুরোপুরি চুপ করাতে যায় না। বরং এমন
এক মিডিয়া পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে শাসক দলের প্রশংসা কানে বাজে, আর ভিন্নমত শোনা যায় শুধু ফিসফিস করে।
যেমন আজকের পশ্চিমবঙ্গে।
তারা করদাতাদের টাকা ব্যবহার করে তোষামোদী কভারেজ কিনে নেয়,সরকারি সম্প্রচারের দায়িত্বে অনুগত লোক বসানো
হয়, রাষ্ট্রের বিজ্ঞাপন বাজেট নমনীয় সংবাদপত্রের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়, আর সরকারি প্রকল্পের ওপর নির্ভরশীল
বন্ধুসুলভ ধনকুবেরদের ইঙ্গিত দেওয়া হয় যেন তারা যেন স্বাধীন মিডিয়া সংস্থা কিনে নিয়ে তার ধার ভোঁতা করে দেয়।
একই সঙ্গে সমালোচনামূলক সংবাদমাধ্যমের পক্ষে টিকে থাকা কঠিন করে তোলা হয়, অনেক সময় অসম্ভবই করে তোলা
হয়। যারা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় অনড় থাকে, তারা দেখে সরকার শুধু তাদের বিজ্ঞাপন দেয় না তা নয়, বেসরকারি
সংস্থাগুলোকেও চাপ দেয় যেন তারাও দূরে থাকে। লাগাতার কর-তদন্ত, হয়রানিমূলক মামলা তাদের নিত্যসঙ্গী হয়। ফলে বহু
সংবাদমাধ্যম আর্থিকভাবে দমবন্ধ অবস্থায় পড়ে: আরএসএফের সমীক্ষায় দেখা গেছে, ১৮০টি দেশের মধ্যে
১৬০টিতেই সংবাদমাধ্যম আর্থিক দিক থেকে ভীষণ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে দাঁড়িয়ে।
তথাকথিত গণতান্ত্রিক সরকারগুলো এবার সরাসরি সাংবাদিকদেরও নিশানা করছে। যারা ক্ষমতাবানদের বিরক্ত করে, তারা প্রায়ই ডক্সিং ও হয়রানির শিকার হয়—বিশেষ করে মহিলা সাংবাদিক। রাষ্ট্রপুঞ্জের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৭৫ শতাংশ মহিলা সাংবাদিক অনলাইন নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছেন এবং ৪২ শতাংশ সরাসরি হুমকি বা হয়রানির শিকার হয়েছেন। জাতীয় নিরাপত্তার নামে এমন আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে যা সরকারের অপছন্দের প্রায় যে কোনও তথ্য প্রকাশ নিষিদ্ধ করে। আবার “ডিজিটাল ফেক নিউজ”-এর বিরুদ্ধে
আইন—যার মানে কার্যত সরকার যা অস্বীকার করে, সেটাই ভুয়ো। সবচেয়ে একগুঁয়ে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এমন সব মামলাও করা হয়, যার সঙ্গে সাংবাদিকতার কোনও সম্পর্কই নেই। যেমন, ফিলিপিনসে জানুয়ারি মাসে ফরাসি-মে কুম্পিও—নিরাপত্তা বাহিনীর অপব্যবহারের নিয়মিত সমালোচক—“সন্ত্রাসে অর্থ জোগান”-এর অভিযোগে ১২ থেকে ১৮ বছরের কারাদণ্ড পেয়েছেন। কুম্পিওর বক্তব্য,
নিরাপত্তা বাহিনী তাঁর ফ্ল্যাটে ঢুকে তাঁকে মেঝেতে শুইয়ে দেয় এবং তাঁর বিছানায় অস্ত্র ও নিষিদ্ধ সামগ্রী পুঁতে দেয়।
আজকের প্রযুক্তি সাংবাদিকতার অর্থটাই বদলে দিয়েছে এবং মতপ্রকাশের নতুন রাস্তা খুলে দিয়েছে। হাতে ফোন থাকলেই যে
কেউ পুলিশের লাঠি বা ঘুষির দৃশ্য তুলে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে পারে।এটি নিষ্ঠুর পুলিশি আচরণের বিরুদ্ধে একটি
কার্যকর নজরদারি। কিন্তু সামগ্রিকভাবে ডিজিটাল বিপ্লব সেই মুক্তির বার্তা নিয়ে আসেনি যা একসময় অনেকে আশা করেছিলেন। স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো নাগরিকরা ক্ষুব্ধ হলেই ইন্টারনেট বন্ধ করে দিতে পারে,যেমন ইরান ও উগান্ডা সাম্প্রতিককালে করেছে। দুর্বল গণতন্ত্রগুলো আরও সূক্ষ্ম পদ্ধতি বেছে নেয়। ডিজিটাল গোপনীয়তা রক্ষার আইন ব্যবহার করা হয় রাজনীতিকদের নজরদারি থেকে আড়াল করতে। এদিকে সরকারি গুপ্তচর সংস্থাগুলি সাংবাদিকদের ফোন হ্যাক করে উৎস খুঁজে বের করে, ফলে ভবিষ্যতের তথ্যদাতারা ভয় পেয়ে সরে যায়। আর যদি সেই ফোনে কোনও বিব্রতকর ছবি থাকে, সেগুলো রহস্যজনকভাবে প্রকাশ্যেও চলে আসে।
সবশেষে, আমেরিকও অবস্থান বদলেছে। যে দেশটি একসময় বিশ্বজুড়ে সংবাদস্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়াত, এখন আর তা করে
না। ট্রাম্প প্রশাসন স্বাধীন বিদেশি সংবাদমাধ্যমের ভর্তুকি বন্ধ করেছে এবং রেডিও ফ্রি এশিয়ার মতো সরকারি সম্প্রচার মাধ্যম বন্ধ করে দিয়েছে। এই রেডিও ছিল প্রধানত তিব্বত ও উত্তর কোরিয়ার মতো দেশের জন্য যারা কার্যত খবরগুলি কারাগারে জীবন কাটায়। আরও খারাপ, ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে তিনি বিদেশি সরকারগুলিকে বাকস্বাধীনতার প্রশ্নে চাপ দেবেন না যদি না তারা ‘ওক’ ইউরোপীয় হয়। আজারবাইজান থেকে এল সালভাদর—শক্তিশালী শাসকরা এই সুযোগে আরও বেশি সংখ্যক ‘বিরক্তিকর’ সাংবাদিককে জেলে
পুরতে বা ভয় দেখাতে এগিয়ে এসেছে, কোনও কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা ছাড়াই।
দমন-পীড়নের পক্ষের লোকেরা প্রায়ই বলেন, সংবাদমাধ্যমকেও জবাবদিহির আওতায় আনা দরকার। কিন্তু তারা এই সত্যটা ছোট করে দেখান যে সেই জবাবদিহি আগেই বিদ্যমান। পাঠক চাইলে সাবস্ক্রিপশন বাতিল করতে পারেন; মানহানির শিকার হলে মামলা করতে পারেন, প্যানোরামা কেলেঙ্কারির পর বিবিসির প্রধান পদত্যাগ করেছেন। সাংবাদিকদের দোষ আছে, নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু তাদের কাজ
করতে বাধা দিলে পরিণতি হবে ভয়াবহ। একবার শক্তিশালী সংবাদসংগ্রহের পরিবেশ ধ্বংস হয়ে গেলে, তা নতুন করে গড়ে তোলা অত্যন্ত কঠিন। আর কম সংবাদস্বাধীনতার পৃথিবী হবে আরও নোংরা, আরও দুর্নীতিগ্রস্ত এবং আরও খারাপভাবে শাসিত।