Home খবরা খবর আইফেল টাওয়ারে বিজ্ঞানের নীরব অর্ধেকের স্বীকৃতি

আইফেল টাওয়ারে বিজ্ঞানের নীরব অর্ধেকের স্বীকৃতি

0 comments 76 views

বাংলাস্ফিয়ার: ২০২৭ সালে টাওয়ারের প্রথম তলায় খোদাই থাকবে ৭২ জন নারী বিজ্ঞানীর নাম—এক ঐতিহাসিক সংশোধনের পথে প্যারিস।

১৮৮৯ সালে নির্মিত আইফেল টাওয়ারের প্রথম তলায় সোনালি অক্ষরে খোদাই করা হয়েছিল “১৭৮৯ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত
ফ্রান্সকে গৌরবান্বিত করা শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের” নাম। সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলেন স্বয়ং গুস্তাভ আইফেল। সে সময়টা ছিল ভিন্ন—সেই ৭২টি নামের তালিকায় একটিও নারীর নাম ছিল না। এমনকি ১৮১৫ সালে ফরাসি একাডেমি অব সায়েন্সেস থেকে গণিতে গ্রাঁ প্রি পাওয়া সোফি জার্মাঁও বাদ পড়েছিলেন।

 

দুই শতাব্দীর বেশি সময় পর, সেই শূন্যতা পূরণের পথে প্যারিস। প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও ঐতিহাসিক স্মারকে পরিবর্তনের জটিল প্রক্রিয়া সাপেক্ষে ২০২৭ সালে আইফেল টাওয়ারের প্রথম তলার নিচে, একই শৈলীতে, খোদাই হবে ৭২ জন নারী বিজ্ঞানীর নাম। এভাবে টাওয়ারের গায়ে যুক্ত হবে বিজ্ঞানের ইতিহাসের আরেকটি অনুল্লিখিত অধ্যায়।

 

Mayor of Paris,Anne Hidalgo

    Mayor of Paris,Anne Hidalgo

উদ্যোগের পথচলা ও নির্বাচনের মানদণ্ড

প্যারিস শহরের মালিকানাধীন এই স্মারকে পরিবর্তনের ভাবনাটি অনুমোদন দেন শহরের মেয়র Anne Hidalgo । এরপর ২০২৫ সালে
গঠিত হয় একটি কমিশন। কমিশনের নেতৃত্বে ছিলেন ‘ফেম এ সিয়ঁস’ (Women and Science) সংগঠনের সহ-সভাপতি ইসাবেল ভোগলাঁ এবং আইফেল টাওয়ার পরিচালন সংস্থার সভাপতি জঁ- ফ্রাঁসোয়া মার্তাঁ।

২০২১ সাল থেকে এই সংগঠনটি কম পরিচিত নারী বিজ্ঞানীদের কাজ জনসমক্ষে আনার পক্ষে সওয়াল করে আসছে। দেশজুড়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিদ্বৎসমাজের কাছ থেকে প্রস্তাব আহ্বান করা হয়। দীর্ঘ যাচাই-বাছাই শেষে এমন একটি তালিকা চূড়ান্ত হয়, যা প্রায় তিন শতাব্দীর বৈজ্ঞানিক ইতিহাসকে স্পর্শ করে।

 

তিন শতাব্দীর বিস্তার, এক অভিন্ন লক্ষ্য

তালিকার শুরু আঁজেলিক দু কুদ্রেঁ—১৭১২ সালে জন্ম নেওয়া এক পথিকৃৎ ধাত্রীবিদ থেকে শেষ প্রান্তে ইভোন শকে-ব্রুয়া,
মহাকর্ষীয় তরঙ্গ গবেষণার অগ্রদূত, যাঁর মৃত্যু হয় ২০২৫ সালে। তালিকায় স্বাভাবিকভাবেই আছেন Marie Curie —কিন্তু উদ্দেশ্য
কেবল পরিচিত নামকে সামনে আনা নয়। ভোগলাঁর ভাষায়, লক্ষ্য হলো সেইসব অগ্রদূতদের অগ্রাধিকার দেওয়া, “যাঁদের দৃঢ়তা ও
দক্ষতা এমন এক জগতে পথ খুলে দিয়েছিল, যা তখন প্রায় পুরোপুরি পুরুষ-প্রধান এবং নারীমুক্তির প্রশ্নে প্রায়শই শত্রুভাবাপন্ন ছিল।”

 

বিজ্ঞানের ক্ষেত্র ও ‘মাতিলদা প্রভাব’

ছয়টি বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রকে প্রতিনিধিত্ব করছে এই তালিকা—পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, গণিত/কম্পিউটার বিজ্ঞান, ভূবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান/চিকিৎসা ও প্রকৌশল। যেসব বিশ্ববিদ্যালয় পাঠক্রমে নারীদের উপস্থিতি এখনও তুলনামূলক কম, সেসব ক্ষেত্রকেই বিশেষভাবে দৃশ্যমান করা হয়েছে। কেবল ফরাসি বিজ্ঞানী, অথবা ফ্রান্সের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ব্যক্তিত্বরাই অন্তর্ভুক্ত।

এই উদ্যোগের একটি স্পষ্ট উদ্দেশ্য আছে—‘মাতিলদা প্রভাব’- এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। অর্থাৎ, বিজ্ঞানে নারীদের অবদানকে পদ্ধতিগতভাবে খাটো করে দেখানোর ঐতিহাসিক প্রবণতাকে চ্যালেঞ্জ করা।

 

৭২ জন নারী বিজ্ঞানীর পূর্ণ তালিকা

(২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি, সোমবার প্যারিসের মেয়রের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পেশ করা তালিকা)

ডেনিস আলবে-ফেসার্দ (১৯১৬–২০০৩) — নিউরোফিজিওলজিস্ট
ইভেত আমিস (১৯৩৬–১৯৯৩) — গণিতবিদ
জ্যঁ বারেঁ (১৭৪০–১৮০৭) — উদ্ভিদবিদ, অভিযাত্রী
ডেনিস বার্তোম্যুফ (১৯৩৪–২০০৪) — উপাদান রসায়নবিদ
মাদলিন ব্রেস (১৮৪২–১৯২১) — চিকিৎসক
সিমোন কাইয়ের (১৯০৫–১৯৯৯) — ভূতত্ত্ববিদ, খনিজবিদ
ইভেত কশোয়া (১৯০৮–১৯৯৯) — ভৌত রসায়নবিদ
এদমে শঁদোঁ (১৮৮৫–১৯৪৪) — জ্যোতির্বিজ্ঞানী
ইভোন শকে-ব্রুয়া (১৯২৩–২০২৫) — পদার্থবিদ, গণিতবিদ
মার্ত কঁদা (১৮৮৬–১৯৩৯) — চিকিৎসক

আনিতা কঁতি (১৮৯৯–১৯৯৭) — মহাসাগরবিদ
ইউজেনি কঁতঁ (১৮৮১–১৯৬৭) — পদার্থবিদ
রাধিয়া কুজো (১৯৪৭–২০১৪) — কম্পিউটার বিজ্ঞানী
ওদিল ক্রোইসঁ (১৯২৩–২০২০) — পদার্থবিদ, জীববিজ্ঞানী
মারি কুরি (১৮৬৭–১৯৩৪) — পদার্থবিদ
অগুস্তা দেজেরিন (১৮৫৯–১৯২৭) — স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ
আঁরিয়েত দেলামার (১৮৫৪–১৯১১) — ভূতত্ত্ববিদ, জীবাশ্মবিদ
জর্জেত দেলিব্রিয়াস (১৯২৪–২০১৫) — পদার্থবিদ
নাতালি দেমাসিয়ু (১৮৮৪–১৯৬১) — রসায়নবিদ
রোজ দিয়াঁ (১৯৫৬–২০০৮) — কম্পিউটার বিজ্ঞানী
আঁজেলিক দু কুদ্রেঁ (১৭১২–১৭৯৪) — ধাত্রীবিদ
লুইজ দু পিয়েরি (১৭৪৬–১৮৩০) — জ্যোতির্বিজ্ঞানী
মারি-লুইজ দুব্রেই-জাকোতাঁ (১৯০৫–১৯৭২) — গণিতবিদ
জাকলিন ফেরঁ (১৯১৮–২০১৪) — গণিতবিদ
জাকলিন ফিসিনি (১৯২৩–১৯৮৮) — রসায়নবিদ
রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন (১৯২০–১৯৫৮) — ভৌত রসায়নবিদ
মার্ত গ্যোতিয়ে (১৯২৫–২০২২) — চিকিৎসা-জীববিজ্ঞানী
সোফি জার্মাঁ (১৭৭৬–১৮৩১) — গণিতবিদ
মারিয়ান গ্রুনবার্গ-মানাগো (১৯২১–২০১৩) — জৈবরসায়নবিদ

জ্যঁ গিয়ো (১৮৮৯–১৯৬৩) — প্রকৌশলী
জেনভিয়েভ গিতেল (১৮৯৫–১৯৮২) — গণিতবিদ
সেবাস্তিয়েন গিয়ো (১৮৯৬–১৯৪১) — বায়ুবিদ্যা প্রকৌশলী
ক্লদিন হারমান (১৯৪৫–২০২১) — পদার্থবিদ
আঁদ্রে হোপিলিয়ার্দ (১৯০৯–১৯৯৫) — বায়ুবিদ্যা প্রকৌশলী
রেন জোলিও-কুরি (১৮৯৭–১৯৫৬) — রসায়নবিদ
জেনভিয়েভ জুরদাঁ (১৯৪৬–২০০৭) — কম্পিউটার প্রকৌশলী
দোরোথেয়া ক্লুম্পকে (১৮৬১–১৯৪২) — জ্যোতির্বিজ্ঞানী
লিদি কক (১৯৩১–২০২৩) — পদার্থবিদ
কোলেত ক্রেদে (১৯৩৪–২০২২) — প্রকৌশলী
নিকোল লারোশ (১৯৪৫–২০১৯) — প্রকৌশলী
কর্নেলি লেবঁ-দে ব্রামবিলা (১৭৬৭–১৮১২) — প্রকৌশলী
ইওলঁদ লে ক্যালভেজ (১৯১০–২০০২) — ভূতত্ত্ববিদ, জীবাশ্মবিদ
পলেত লিবারমান (১৯১৯–২০০৭) — গণিতবিদ
নিকোল মান্যাঁ (১৮৭৮–১৯১৯) — চিকিৎসক
আঁরিয়েত মাতিয়ু-ফারাজি (১৯১৫–১৯৮৫) — পদার্থবিদ
সেসিল মোরেত (১৯২২–২০১৭) — পদার্থবিদ
এদিত মুরিয়ে (১৯২০–২০১৭) — গণিতবিদ
এথেল মুস্তাকি (১৯৩৩–২০১৬) — জৈবরসায়নবিদ

সুজান নোয়েল (১৮৭৮–১৯৫৪) — সার্জন
ইভোন ওদিক (১৮৯০–১৯৮২) — যান্ত্রিক প্রকৌশলী
ইসাবেল অলিভিয়েরি (১৯৫৭–২০১৬) — কৃষি প্রকৌশলী,
জীববিজ্ঞানী
মারি-লুইজ পারি (১৮৮৯–১৯৬৯) — প্রকৌশলী
মার্গেরিত পেরে (১৯০৯–১৯৭৫) — রেডিওরসায়নবিদ
ক্লদিন পিকারদে (১৭৩৫–১৮২০) — রসায়নবিদ
আলবার্ত পুলমান (১৯২০–২০১১) — রসায়নবিদ
পলিন রামার্ত (১৮৮০–১৯৫৩) — রসায়নবিদ
লুসি রান্দোয়াঁ (১৮৮৫–১৯৬০) — পুষ্টিবিদ রসায়নবিদ
আলিস রেকোক (১৯২৯–২০২১) — কম্পিউটার প্রকৌশলী
মিশেল শাৎসমাঁ (১৯৪৯–২০১০) — গণিতবিদ
আন-মার্সেল শ্রামেক (১৮৯৬–১৯৬৫) — রাসায়নিক প্রকৌশলী
মারি-এলেন শোয়ার্ৎস (১৯১৩–২০১৩) — গণিতবিদ
জোসিয়েন সের (১৯২২–২০০৪) — রসায়নবিদ
আলিস সোলিয়ের (১৮৬১–১৯৪২) — মনোরোগ বিশেষজ্ঞ
হেলেন স্প্যারো (১৮৯১–১৯৭০) — জীববিজ্ঞানী, চিকিৎসক
বিয়াঙ্কা চুবর (১৯১০–১৯৯০) — রসায়নবিদ
মারি-অঁতোয়ানেত তঁনেলা (১৯১২–১৯৮০) — তাত্ত্বিক পদার্থবিদ
তেরেজ ত্রেফুয়েল (১৮৯২–১৯৭৮) — রসায়নবিদ

আনিয়েস উলমান (১৯২৭–২০১৯) — আণবিক জীববিজ্ঞানী
আরলেত ভাসি (১৯১৩–২০০০) — বায়ুমণ্ডলীয় পদার্থবিদ
সুজান ভেইল (১৮৮৬–১৯৫৬) — রাসায়নিক প্রকৌশলী
জ্যঁ ভিলপ্রু-পাওয়ার (১৭৯৪–১৮৭১) — প্রকৃতিবিদ
তোশিকো ইউয়াসা (১৯০৯–১৯৮০)

আইফেল টাওয়ারের গায়ে এই নামগুলো খোদাই হলে তা কেবল স্মারক-সংযোজন নয়—এটি হবে ইতিহাসের এক প্রয়োজনীয় সংশোধন, বিজ্ঞানের নীরব অর্ধেককে দৃশ্যমান করার প্রতীকী ঘোষণা।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles