বাংলাস্ফিয়ার: প্রেমের শুরুতে এটি কোনোভাবেই ‘লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট’ বা প্রথম দেখায় প্রেম ছিল না। রিয়্যালিটি টেলিভিশন তারকা নিক ভায়াল যখন তাঁর স্ত্রী নাটালি জয়ের সঙ্গে প্রথম দেখা করেন, তখন তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন যে তাঁরা কোনোদিন প্রেম করবেন না। নিকের এই অনীহার মূলে ছিল বয়সের বিস্তর ফারাক কারণ তিনি নাটালির চেয়ে ১৮ বছরের বড়। তবে সব দ্বিধা কাটিয়ে ২০২৪ সালে পরিণয় সারেন তাঁরা। এখন নিক এক নতুন ধরণের মন জেতার লড়াইয়ে নেমেছেন যেখানে তাঁর লক্ষ্য নতুন দর্শক। নেটফ্লিক্সে চলতি বছরেই শুরু হতে চলেছে তাঁদের নতুন ডেটিং সিরিজ ‘এজ অফ অ্যাট্রাকশন’। ২২ থেকে ৫৯ বছর বয়সিদের নিয়ে তৈরি এই শো পরীক্ষা করে দেখবে যে বয়স কি সত্যিই কেবল একটি সংখ্যা কি না। নিক জানিয়েছেন যে, এই অনুষ্ঠান বয়সের সামাজিক সংস্কার দূরে সরিয়ে সম্পর্কের রসায়ন বা সামঞ্জস্যের ওপর গুরুত্ব দেবে। এটি কেবল একটি রোম্যান্টিক ধারণা নয় বরং এক অমোঘ সত্য। বয়সের ব্যবধান যতটা অস্বাস্থ্যকর ভাবা হয়, আদতে তা তেমনটা নয়।
কথায় বলে যে সমধর্মী মানুষরাই একে অপরের সঙ্গে থাকতে পছন্দ করে। বিয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখেছেন যে দম্পতিরা সাধারণত সমবয়সি হতেই পছন্দ করেন। এটি খুব একটা অস্বাভাবিক নয় কারণ মানুষ সাধারণত সঙ্গীর ক্ষেত্রে জাতি, শিক্ষা বা ধর্মের মতো বয়সের মিলও খোঁজে। আমেরিকায় প্রতি ৮টি দম্পতির মধ্যে ১ জন সমবয়সি এবং এক-তৃতীয়াংশ দম্পতির বয়সের পার্থক্য এক বছরের বেশি নয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এই প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দেয় কারণ সেখানে একই বয়সের পড়ুয়ারা একসঙ্গে বড় হয়। তা সত্ত্বেও অধিকাংশ মার্কিন বিয়ের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে স্বামী স্ত্রীর চেয়ে বয়সে বড়। পিউ রিসার্চ সেন্টারের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে বিশ্বব্যাপী এই ব্যবধান গড়ে ৪.২ বছর। উত্তর আমেরিকায় স্বামীরা গড়ে ২.২ বছরের বড় এবং ইউরোপে এই ব্যবধান ২.৭ বছর। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে এই ব্যবধান ৪ বছর হলেও সবচেয়ে বেশি বয়সের পার্থক্য দেখা যায় সাব-সাহারা আফ্রিকায়। সেখানে স্বামীরা গড়ে ৮.৬ বছরের বড়।
কেন এই বয়সের ব্যবধান এত প্রচলিত তার প্রধান ব্যাখ্যাটি বিবর্তনীয়। বলা হয় যে পুরুষরা সাধারণত সন্তান উৎপাদনে সক্ষম সঙ্গী খোঁজেন এবং মহিলারা এমন সঙ্গী চান যিনি পরিবারের দায়িত্ব নিতে পারবেন। মহিলারা অল্প বয়সে বেশি উর্বর থাকেন এবং পুরুষরা বয়সের সাথে সম্পদ সঞ্চয় করেন। তাই তত্ত্ব অনুযায়ী এই ব্যবধান বেশি সন্তান জন্ম দিতে সহায়ক হয়। পরিসংখ্যানও এই দাবি সমর্থন করছে। ২০০৭ সালে ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে যে সুইডিশ দম্পতিদের মধ্যে যেখানে স্বামী স্ত্রীর চেয়ে পাঁচ বছরের বড়, তাঁদের সন্তান সংখ্যা সমবয়সি দম্পতিদের চেয়ে ৫ শতাংশ বেশি। আমেরিকার তথ্যেও একই চিত্র ফুটে উঠেছে। দরিদ্র দেশগুলোতে বয়সে বড় ও সম্পদশালী স্বামী থাকা মহিলাদের জন্য আরও বেশি লাভজনক হতে পারে।
সামাজিক রীতিনীতিও এখানে বড় ভূমিকা পালন করে। বয়সে অনেক বড় বা ছোট কাউকে পছন্দ করলেও অনেকে সমাজের ভ্রুকুটি এড়াতে সমবয়সি সঙ্গী বেছে নেন। মিউনিখের সমাজবিজ্ঞানী রেনাটা টোপিনকোভা প্রশ্ন তুলেছেন যে কেউ কি তাঁর চেয়ে ২০ বছরের ছোট কাউকে নিজের বাবা মায়ের সামনে নিয়ে যেতে পারবেন। তবে গ্রহণযোগ্যতার এই মাপকাঠি সময়ের সাথে বদলায়। ১৯২০ সালে মার্কিন স্বামীরা গড়ে ৪.৫ বছরের বড় ছিলেন যা এখন কমে ২.২ বছরে দাঁড়িয়েছে। একসময় উচ্চবিত্ত পুরুষদের তরুণী স্ত্রীদের নিয়ে যে ‘ট্রফি ওয়াইফ’ তকমা চালু ছিল তা এখন আমেরিকার পরিসংখ্যানে নেই বললেই চলে।
পর্দাতেও বয়সের ব্যবধান এখন আগের চেয়ে অনেক কম। ‘গন উইথ দ্য উইন্ড’ বা ‘কাসাব্লাঙ্কা’ সিনেমার সেই বিশাল বয়সের ফারাক এখন আর তেমন চোখে পড়ে না। ১৯৪০ এর দশকে পর্দায় দম্পতিদের বয়সের ফারাক প্রায় ২০ বছর থাকলেও এখন তা গড়ে ৬ বছরে নেমে এসেছে। বর্তমানের কিছু সিনেমায় বরং প্রথা ভেঙে বয়সে বড় মহিলা ও তরুণ পুরুষের প্রেম দেখানো হচ্ছে। যদিও এটি খুব সাধারণ চিত্র নয় তবে হলিউড সাধারণত ব্যতিক্রমী গল্পই বলতে চায়। ভিন্ন বয়সের মানুষের সম্পর্ক কি কম স্বাস্থ্যকর এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রচলিত ধারণা হলো যে বয়সের ব্যবধান থাকলে স্বামী স্ত্রীর রুচি ও মূল্যবোধে মিল থাকে না। ক্ষমতার ভারসাম্যও নষ্ট হতে পারে বিশেষ করে যদি বয়সে বড় সঙ্গীটি বেশি উপার্জন করেন। সমীক্ষা বলছে যে সমাজ এমন সম্পর্ককে ভালো চোখে দেখে না কারণ তাঁদের ধারণা যে কম বয়সি সঙ্গীটি হয়তো অর্থ সম্পদ খুঁজছে। অন্তত ১০ বছরের ব্যবধান রয়েছে এমন দম্পতিরা সামাজিক লাঞ্ছনার শিকার হন বেশি। নাটালি জয় জানিয়েছেন যে অনলাইন ট্রোলিংয়ে তাঁকে ‘চাইল্ড ব্রাইড’ বা বাল্যবধূ বলতেও ছাড়েনি নেটিজেনরা।
তবে বাস্তব তথ্য বলছে যে এমন দম্পতিরা যথেষ্ট সুখী এবং তাঁদের সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয়। ২০০২ সালে মাস্ট্রিচ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে যে বয়সের বড় ব্যবধান স্বামী স্ত্রী উভয়ের জীবন সন্তুষ্টির ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। ব্রিটেনের গবেষকরাও বিচ্ছেদের সাথে বয়সের পার্থক্যের কোনো জোরালো সম্পর্ক খুঁজে পাননি। আমেরিকার তথ্য অনুযায়ী বড় ব্যবধানের দম্পতিরা সমবয়সিদের চেয়ে বেশিদিন একসাথে থাকেন। ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ পত্রিকার বিশ্লেষণ বলছে যে ৫ বছরের বয়সের ব্যবধান দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কে স্থায়িত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়। বয়সের ব্যবধানের কিছু ঝুঁকিও অবশ্য রয়েছে কারণ স্বামী অনেক বড় হলে কিছু ক্ষেত্রে অপরাধের প্রবণতা বাড়তে দেখা যায়। তবে এমন ঘটনা অত্যন্ত বিরল। অধ্যাপক পল ইস্টউইক মনে করেন যে বয়সের ব্যবধান যাই হোক না কেন একটি সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হওয়া নির্ভর করে অন্য অনেক বিষয়ের ওপর। যেমন রাতে দুজনে মিলে কোন শো দেখবেন সেই সাধারণ মিলটুকুও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নিক ভায়াল এবং নাটালি জয় অন্তত এই একটি বিষয়ে একমত হতে পারবেন।