Home খবরা খবর সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত অরিজিতের

সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত অরিজিতের

by Suman Chattopadhyay
0 comments 130 views

বাংলাস্ফিয়ারঃ খেলাধুলা, শিল্প বা সংস্কৃতি—প্রতিটি ক্ষেত্রেই কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা তাঁদের নিজ নিজ ক্ষেত্রকে ছাড়িয়ে যান। তাঁরা আর শুধু খেলোয়াড় বা শিল্পী থাকেন না নিজেদের অজান্তেই হয়ে ওঠেন সেই খেলা অথবা শিল্পটির মুখ। তাঁরা চান বা না চান তাঁদের ব্যক্তিসত্ত্বা ও সেই শিল্পের পরিচয় একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে যায়।

এদেশে সিনেমার সূচনালগ্ন থেকেই সংগীত তার অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। ১৯৩১ সালের আলম আরা থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত এই পথটা ছোট তো নয়ই বরং উল্লেখযোগ‍্য রকম দীর্ঘ। প্লেব্যাক গায়ক-গায়িকারা এ দেশের সবচেয়ে প্রিয় সাংস্কৃতিক নায়কদের মধ্যে পড়েন। অরিজিৎ সিং তেমনই এক নাম। আর ঠিক এই জায়গাটাতেই তাঁর অবস্থানটা অদ্ভুতভাবে স্বস্তিদায়ক—কারণ তিনি এই ‘নায়ক’ হয়ে উঠতে চান না।

আপনি যদি পশ্চিমবঙ্গের সমান বড় কোনও পাথরের নীচে না থাকেন, তাহলে নিশ্চয়ই শুনেছেন, অরিজিৎ প্লেব্যাক গান ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই, এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই ইন্টারনেট কার্যত উন্মাদ হয়ে ওঠে। লক্ষ লক্ষ অনুরাগী তাঁকে ফিরে আসার অনুরোধ জানাতে থাকেন। কিন্তু প্রশ্নটা অন্যরকম হওয়া উচিত—কেনই বা তিনি থাকবেন?

ভারতে সংগীত দীর্ঘদিন ধরেই প্রায় একার্থক হয়ে উঠেছে চলচ্চিত্র সংগীতের সঙ্গে। এটা এক ধরনের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য, যা আমাদের সিনেমাকে আলাদা পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বৈশিষ্ট্যটাই রূপ নিয়েছে এক ধরনের খাঁচায় যার চাবিকাঠি হাতে রেখেছে বলিউডের কিছু ক্ষমতাবান যাঁরা নিজেরাই ঠিক করতে চান, এই দেশের সংগীতের পরিচয় কী হবে।

স্বাধীন সংগীত সবসময়ই ছিল। তবে দীর্ঘদিন ধরে তা যেন কোনও পুরনো ড্রাগনের মতো ঘুমিয়ে পড়েছিল, ডানা থাকলেও উড়তে পারেনি। সামাজিক মাধ্যম সেই ড্রাগনের সামনে থেকে পাথরটা সরিয়ে দিয়েছে। আর তাতেই সে আবার আকাশে ওড়া শুরু করেছে। আজ প্রায় প্রতিটি ঘরানাতেই রয়েছে প্রতিভাবান, স্বতন্ত্র এবং সফল ভারতীয় শিল্পী আর তাদের পিছনে অপেক্ষায় আছে আরও অসংখ্য কণ্ঠ। শিল্পের চরিত্রটাই বদলে গেছে। শ্রোতারা এখন এমন অ্যালবাম ও প্রজেক্টের দিকে ঝুঁকছেন, যেগুলোর একটা নিজস্ব ভাবনা, একটা গল্প আছে।

এই সময়টাই অরিজিতের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত, এই জগতে পা রাখার, নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার। তিনি সংগীত ছাড়ছেন না, ছাড়বেনও না। মঞ্চে গান গাইতে গাইতে তাঁর যে আনন্দ, যে ডুবে থাকা তা দেখলেই বোঝা যায়। প্লেব্যাক গান থেকে এক পা পিছিয়ে আসার সিদ্ধান্ত আসলে এই কথারই প্রমাণ, যে তিনি চান তাঁর গানগুলো শুধু ‘অরিজিৎ সিং-এর গান’ হিসেবেই মনে রাখা হোক।

এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এসেছে, যখন হিন্দি চলচ্চিত্র সংগীত শিল্প সৃজনশীলতার অভাব এবং শোষণমূলক চরিত্রের জন্য সমালোচিত। অরিজিৎনিজ প্রজন্মের অন্যতম সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত গায়ক হওয়া সত্ত্বেও এই ব্যবস্থা নিয়ে আগেও প্রশ্ন তুলেছেন। কয়েক বছর আগে এক মিউজিক পডকাস্টে তিনি বলেছিলেন, “এই গোটা ব্যবসাটাই শিল্পীদের ঘাড়ে দাঁড়িয়ে চলে। একজন শিল্পী ব্যবসায়ীর মতো ব্যবহারিক হন না। অথচ ব্যবসাটা তাঁর কাজের উপরই নির্ভরশীল। যদি সবাই মনে করে এই ব্যবস্থা ন্যায্য নয়, তাহলে নিশ্চয়ই কোথাও সমস্যা আছে। হয় কাজের উপযুক্ত মূল্য দিতে হবে, নয়তো কাজ দেওয়াই উচিত নয়। এখানে অনেকেই আছেন, যাঁরা
তাঁদের শ্রমের তুলনায় অনেক কম পারিশ্রমিক পান। সব কিছুই শেষ পর্যন্ত দরকষাকষির ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।”

তিনি আরও বলেছিলেন, “বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সব আলোচনা মৌখিক। এক কথা বলে কাজ শুরু হয়, কাজের রূপ বদলে যায়, আর শেষে পারিশ্রমিক সম্পূর্ণ অন্য কিছু হয়ে দাঁড়ায়।”

 

একবিংশ শতাব্দীর কোনও সংগীতশিল্পীর কাছে নিজের শর্তে নিজের গান প্রকাশ করা, নিজের কাজের অধিকার নিজের হাতে
রাখা, এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছু নেই। সিনেমার জন‍্য গান গাইলে সেটা প্রায় অসম্ভব। যদি সম্ভব হতো, তাহলে বছরে বছরে এত অসংখ্য কনসার্ট হোতনা দেশজুড়ে । গায়ক-সুরকাররা বহু আগেই বুঝে গেছেন, শুধু ছবির গানে ভর করে আর জীবিকা চলে না। অরিজিৎ শুধু এক ধাপ এগিয়ে গেছেন।

ন্যায্য কথা বলতে গেলে, অরিজিৎ এমন এক জায়গা তৈরি করেছেন, যা তাঁর মতো আর কারও নেই। এটা কোনও কাব্যিক দাবি নয়, সংখ্যাগুলোই তার প্রমাণ। তিনি স্পটিফাইয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অনুসৃত শিল্পী—১৭ কোটি ১০ লক্ষেরও বেশি ফলোয়ার, এবং প্রায় ৫ কোটি ৮০ লক্ষ মাসিক শ্রোতা। এই সংখ্যা টেলর সুইফটের থেকেও প্রায় ২ কোটি বেশি। তাঁর অনুরাগীদের শক্তি জানলে বোঝা যায়, এটা কতটা অবিশ্বাস্য। টানা সাত বছর ধরে তিনি দেশের সবচেয়ে বেশি স্ট্রিম হওয়া শিল্পী।

যদি এবং যখন অরিজিৎ নিজের কোনও সিঙ্গল বা অ্যালবাম প্রকাশ করেন, সেটা ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে থাকবে। বাইরের দুনিয়ার কাছে সেটা হয়তো শুধু আরেকটা অ্যালবাম। কিন্তু যাঁরা অরিজিতের কাজ চেনেন, তাঁদের কাছে এটা হবে একজন শিল্পীর নিজের সাফল্যের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নেওয়া। প্লেব্যাক সিংহাসন তাঁর কাছে যথেষ্ট নয়, তিনি আরও বড় কিছু চান। আরও নিজস্ব, আরও সৃজনশীল, যা হবে তাঁর অমরত্বের পাসপোর্ট।

এটা শুধু পরিবর্তনের ইঙ্গিত নয়। এটা সেই শিল্পব্যবস্থার গালে এক নির্মম চড় যে ব্যবস্থা এতদিন নিজের মধ্যমেধাকে নির্বিঘ্নে টিকিয়ে রেখেছিল। আর সেই চড়টাই হয়তো ভারতীয় সংগীতকে সত্যিকারের নতুন যুগে নিয়ে যাওয়ার দরজা খুলে দেবে।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles