বাংলাস্ফিয়ারঃ এখানে গরীব-বড়লোক নেই, সাদা-কালো নেই,নারী-পুরুষ নেই, ছোট-বড় নেই, আমরা সবাই, যেখানে যে অবস্থাতে থাকিনা কেন, সব্বাই একসূত্রে গাঁথা। স্বপ্নের জগতে।
মানুষের অভিজ্ঞতার কিছু সার্বজনীন ধ্রুবক আছে। স্বপ্ন তাদেরই একটি। শিল্পকলার প্রতিটি রূপে,কবিতায়, চিত্রকলায়, উপাখ্যানে স্বপ্ন উপস্থিত। আদিকাল থেকে মানুষ স্বপ্ন নিয়ে ভেবেছে, কল্পনা করেছে, তর্ক করেছে। অথচ আজও স্বপ্ন রয়ে গেছে এক ধাঁধা। স্বপ্নকে প্রায়ই মনে হয় অর্থহীন,খণ্ডিত, এলোমেলো ঘটনার এক অদ্ভুত সমাহার।
কিন্তু যদি তা না হয়?
যদি স্বপ্ন আসলে এলোমেলো না হয়?
এই প্রশ্নই বিজ্ঞানীদের টেনে নিয়ে গেছে এই রহস্যময় মানসিক প্রক্রিয়ার অনুসন্ধানে। আধুনিকবিজ্ঞান, নিউরোসায়েন্স ও মনোবিজ্ঞানের শক্তিশালী সরঞ্জাম সম্বল করে এখন তাঁরা দেখতে পাচ্ছেনএই নিশাকালন মানসিক নাটকের রয়েছে গভীর, বাস্তব ও প্রায়ই বিস্ময়কর কার্যকারিতা।
চলুন, সাম্প্রতিক গবেষণা ও যুগান্তকারী ক্লাসিক অধ্যয়নের আলোতে স্বপ্নের প্রকৃত ভূমিকাস ম্পর্কে পাঁচটি সবচেয়ে চমকপ্রদ ও প্রচলিত ধারণার বিরুদ্ধে যাওয়া আবিষ্কারকে একে একে দেখি।
স্বপ্ন কেবল রাতের বিনোদন নয়।
বিষয়টির গভীরে নামা যাক।।
১. বিবর্তনের অনিবার্য অনুষঙ্গ
স্বপ্ন টিকে আছে, কারণ স্বপ্নহীন থাকা আরও ক্ষতিকর ছিল।
বিবর্তনের দৃষ্টিতে দেখলে মস্তিষ্ক এক অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সংবেদনশীল অঙ্গ। ঘুমের মধ্যেও এটি শরীরের প্রায় ২০ শতাংশ শক্তি ব্যবহার করে। REM ঘুমের সময় মস্তিষ্কের কার্যকলাপ প্রায় জাগ্রত অবস্থার সমান।
যদি স্বপ্ন একেবারেই অকেজো হতো, তবে প্রাকৃতিক নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় তা বহু আগেই বিলুপ্ত হয়ে যেত।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্বপ্ন কেবল মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিড়ালের মতো স্তন্যপায়ী প্রাণীও স্বপ্ন দেখে। এই সার্বজনীন উপস্থিতি এক শক্তিশালী বিবর্তনীয় ইঙ্গিত দেয়: স্বপ্ন-ব্যবস্থা প্রাচীন এবং কার্যকর।
এই উপলব্ধি থেকেই জন্ম নেয় একটি তত্ত্ব।
২. বিকল্প বাস্তবতা অনুকরণ করার জন্য স্বপ্ন
জীবননাশ হতে পারে এমন ভুলের আগাম মহড়া দেয় মস্তিষ্ক।
২০০০ সালে রেভনসুও প্রস্তাব করেন Threat Simulation Theory। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, স্বপ্নের
উৎপত্তি হয়েছে এমন এক অভিযোজন হিসেবে, যার মাধ্যমে মস্তিষ্ক বাস্তব পরিবেশে অনুপস্থিত
থাকলেও সম্ভাব্য পরিস্থিতির অনুকরণ করতে পারে। অর্থাৎ, ঘুমের সময় মস্তিষ্ক বন্ধ হয়ে যায় না
বরং বাইরের জগতের তথ্য গ্রহণ বন্ধ করে, ভেতর থেকেই সম্ভাব্য দৃশ্যপট তৈরি করতে থাকে।
স্বপ্ন আমাদের পরিচিত বাস্তবতার বিকল্প রূপগুলোকে পুনর্গঠন করে।
এ বিষয়ে তথ্যপ্রমাণ আশ্চর্যজনকভাবে একমুখী। গবেষণায় দেখা যায়, ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ স্বপ্নে
নেতিবাচক আবেগ প্রাধান্য পায়। প্রায় ৪৫ শতাংশ স্বপ্নের সামাজিক প্রেক্ষাপটে থাকে আক্রমণ বা
হিংসা। আরও লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই আক্রমণাত্মক দৃশ্যগুলোর প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রেই স্বপ্নদ্রষ্টা আক্রমণকারী নয় তার শিকার। এটি স্পষ্টভাবে বিপদ এড়ানোর প্রশিক্ষণ ও ঝুঁকি আগাম চেনার ধারণাকে সমর্থন করে।
সবচেয়ে শক্ত প্রমাণ আসে যুদ্ধ ও ট্রমায় আক্রান্ত জনগোষ্ঠী থেকে।
২০০৩ সালে একটি সমীক্ষায় দেখা যায় যুদ্ধবিধ্বস্ত কুর্দি শিশুদের মধ্যে প্রতি রাতে স্বপ্ন দেখার হার বেশি, স্বপ্নে বিপদের উপস্থিতি বেশি, এবং সেই বিপদের তীব্রতাও অনেক বেশি। স্বপ্নের রেওয়াজ এদের ক্ষেত্রেও একেবারে ভেঙে পড়েনি বরং বাস্তব জীবনের ক্রমাগত বিপদের সংকেতে তা অতিসক্রিয় হয়ে উঠেছে।
এই দৃষ্টিতে দেখলে, দুঃস্বপ্ন কোনো বিকৃতি নয়।
দুঃস্বপ্ন হলো—অমীমাংসিত সমস্যার মানসিক অনুকরণ।

৩. আবেগ নিয়ন্ত্রণের পরীক্ষাগার হিসেবে স্বপ্ন
স্বপ্ন আমাদের কষ্ট বাড়ায় না তাকে সহনীয় করে তোলে।
আধুনিক নিদ্রা-বিজ্ঞানের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আবিষ্কারগুলোর একটি হোল,বিশেষ করে REM ঘুমের
সময়, স্বপ্ন আবেগীয় ভারসাম্য পুনর্গঠনে মুখ্য ভূমিকা নেয়। এই পর্যায়ে মস্তিষ্কে
অ্যাসিটাইলকোলিনের উপস্থিতি বেশি থাকে, কিন্তু নোরঅ্যাড্রেনালিন—যা চাপ ও আতঙ্কের সঙ্গে যুক্ত—প্রায় অনুপস্থিত।
এই বিশেষ রাসায়নিক পরিবেশ জাগ্রত অবস্থার থেকেও আলাদা, আবার গভীর ঘুমের থেকেও ভিন্ন।
একদল বিজ্ঞানীর নাম দিয়েছেন “রাতভর থেরাপি”। স্মৃতির কেন্দ্রগুলো সক্রিয় থাকে, কিন্তু সেই স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত তীব্র আবেগের ধার কিছুটা ভোঁতা হয়ে যায়। আমরা আবার অনুভব করি হারানো, ভয়, দ্বন্দ্ব সব কিছুই। কিন্তু এমন এক পরিবেশে, যেখানে মস্তিষ্কের সতর্ক সংকেত ব্যবস্থা অনেকটাই স্তব্ধ।
গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যাপ্ত REM ঘুমের পর মানুষ আগের তুলনায় বিরক্তিকর দৃশ্যের প্রতি কম তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায়। অর্থাৎ, স্বপ্ন আমাদের আবেগীয় ক্ষতকে নতুন করে গভীর করে তোলেনা, তাকে ধীরে ধীরে সারিয়ে তোলে।
এই কারণেই দীর্ঘদিন স্বপ্ন অবদমিত থাকলে—ঘুমের অভাব, অতিরিক্ত মদ্যপান বা কিছু ওষুধের
ফলে—মানুষ আবেগপ্রবণ, অস্থির ও মানসিকভাবে ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।
স্বপ্ন দেখা কোনও বিলাস নয়।
এটি আবেগীয় স্বাস্থ্যের রক্ষণাবেক্ষণ।

৪. স্মৃতি সাজানো ও অর্থ খোঁজার কাজ করে স্বপ্ন
স্বপ্ন অতীতকে নিখুঁতভাবে মনে রাখে না তা থেকে অর্থ বের করে।
জনপ্রিয় ধারণার বিপরীতে, স্বপ্ন খুব কমই স্মৃতিকে হুবহু পুনরাবৃত্তি করে। বরং তা স্মৃতির টুকরো
ভাঙে, মেশায়, নতুনভাবে সাজায়। এই বিশৃঙ্খলাই আসলে উদ্দেশ্যপূর্ণ।
নিউরোসায়েন্সের মতে, ঘুমের সময় হিপোক্যাম্পাস সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতাগুলো পুনরায় সক্রিয় করে,
আর কর্টেক্স সেগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি জ্ঞানের কাঠামোর মধ্যে একীভূত করে। এই প্রক্রিয়ার সচেতন প্রতিফলনই হলো স্বপ্ন।
এই কারণেই স্বপ্নে একসঙ্গে দেখা যায় সম্পর্কহীন মানুষ, স্থান ও ঘটনা। মস্তিষ্ক তখন খুঁজছে,
প্যাটার্ন, পুনরাবৃত্তি, ভবিষ্যদ্বাণীযোগ্য সংকেত। কী গুরুত্বপূর্ণ, কী আবার ঘটতে পারে, এই প্রশ্নের উত্তর।
এই অর্থে, স্বপ্ন কোনও ঘটনার স্মৃতি নয়; স্বপ্ন হোল অর্থের পরীক্ষা।
সৃজনশীলতা সংক্রান্ত গবেষণাও এই ধারণাকে সমর্থন করে। যেসব সমস্যা যুক্তির চেয়ে দৃষ্টিভঙ্গির
বদল চায়, সেগুলোর সমাধান ঘুমের পর,বিশেষ করে স্বপ্ন দেখার পর বেশি পাওয়া যায়।
মস্তিষ্ক তখন একটি ব্যবহারিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে, আমি কী মনে রাখব, এবং কীভাবে রাখব?

৫. স্বপ্ন আত্মপরিচয়ের নিঃশব্দ নাট্যমঞ্চ
স্বপ্ন সময়ের ধারাবাহিকতায় “আমি”-কে টিকিয়ে রাখে।
স্বপ্নের একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হোল, আমরা প্রায় সবসময়ই তাতে উপস্থিত থাকি। গল্প যতই অদ্ভুত
হোক, স্বপ্ন সাধারণত স্বপ্নদ্রষ্টার দৃষ্টিভঙ্গি, ভয়, লক্ষ্য ও সামাজিক সম্পর্ক ঘিরেই আবর্তিত হয়।
এই কারণে কিছু গবেষক মনে করেন, স্বপ্ন আত্মপরিচয়ের ধারাবাহিকতা রক্ষায় অতীব গুরুত্বপূর্ণ।
জাগ্রত অবস্থায় আত্মপরিচয় গড়ে ওঠে কর্ম ও উপলব্ধির মাধ্যমে। ঘুমের সময়, বাইরের জগত বন্ধ
থাকলে, স্বপ্ন সেই আত্মপরিচয়ের অভ্যন্তরীণ অনুশীলন চালিয়ে যায়।
এই তত্ত্ব আরও জোরালো হয় যখন আমরা দেখি, যেসব অবস্থায় স্বপ্ন ভেঙে পড়ে, যেমন তীব্র PTSD
বা কিছু স্নায়ুক্ষয়জনিত রোগ, সেখানে আত্মপরিচয়, স্মৃতি ও আবেগীয় সংহতি ভেঙে যায়।
স্বপ্ন হয়তো সেই উপায়, যার মাধ্যমে মস্তিষ্ক নিজেকে বারবার প্রশ্ন করে: এই জগতের মধ্যে আমি কে?
তাহলে, স্বপ্ন আসলে কী?
অর্থহীন শব্দ নয়।
এলোমেলো বিভ্রম নয়।
আর কোনো অলৌকিক সংকেতও নয়।
স্বপ্ন হলো বিবর্তনে গড়া এক মানসিক অনুকরণযন্ত্র, নিউরোবায়োলজির নিয়মে বাঁধা, অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত। তা আমাদের বিপদ চিনতে শেখায়, আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখে, স্মৃতিকে সাজায়, আর আত্মপরিচয়কে ধরে রাখে।
আমরা চোখ বন্ধ করলে মস্তিষ্ক বিশ্রাম নেয় না।
সে প্রস্তুতি নেয়।
আর আমরা যেগুলোকে স্বপ্ন বলে ভুলে যাই—
সেগুলোই সেই নীরব প্রস্তুতির দৃশ্যমান ছাপ।