Home খবরা খবর শীতের কলকাতা, বিষবাতাসের কলকাতা

শীতের কলকাতা, বিষবাতাসের কলকাতা

0 comments 742 views

সুস্মিতা বসু: ভোরবেলার আরামের ঘুম এলার্মের আওয়াজে ভেঙে যায়। নভেম্বর মাস, এখন সকাল সাড়ে পাঁচটা। সন্তর্পণে বারান্দার দরজাটা খুলে মাথাটা বার করে দেখি। বারান্দায় বেরিয়ে দেখার সম্ভবনা নেই, একদিনের মধ্যে দোতলার বারান্দায় ধুলোর জন্য পা রাখা যায় না। রাস্তার আলোয় বহুদূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে, আকাশে আলোর ছোঁয়া লেগে হালকা গোলাপী রঙ। আধঘন্টা পরে তৈরী হয়ে মাস্ক পরে যখন রাস্তায় পা রাখলাম তখন আলো ভালোভাবে ফুটে গেছে। বাসে উঠে গন্তব্যে পৌঁছোতে আরো আধঘন্টা। এত সকালের বাসে যাত্রী বেশী নেই, দুটি খুব ছোট স্কুল পড়ুয়া শিশু, একটি তো মায়ের গায়ে হেলান দিয়ে ঘুমোচ্ছে, তার মা তার সোয়েটারের কলারটা ঠিক করে দিলেন দেখলাম, আরেকটু বড় স্কুল ইউনিফর্ম পরা তিন ছাত্রী, সম্ভবত একই স্কুলের, আরো কিছু মানুষ, সম্ভবত এঁরা হাসপাতাল বা কারখানার মর্নিং শিফটের কর্মী, জনা চারেক অল্পবয়সী মেয়ে, সম্ভবত তারা মর্নিং কলেজের ছাত্রী, এরাই সকালের বাসের নিয়মিত যাত্রী। যেতে যেতে বাইরে তাকিয়ে দেখি দিনের আলো যত বাড়ছে, দূরের রাস্তা, গাছ, রেললাইন ক্রমশঃ আরো অস্পষ্ট হচ্ছে। মাস্ক না পরলে একটা হাল্কা শ্বাসকষ্টও শুরু হয়। এটা কুয়াশা নয়, নাগরিক ধোঁয়াশা।

 

মনে পড়ে গেল এর আগের দিন এক ছাত্রী প্রশ্ন করেছিল এত ভোরে ধোঁয়া কি করে কুয়াশায় মিশল। এত ভোরে তো কেউই সাধরণত আগুন জ্বালে না। এগুলো কি তাহলে আগের রাতে জ্বালা আগুনের ধোঁয়া?

তাকে পালটা প্রশ্ন করেছিলাম, কোথায় থাকো? সে কাছাকাছিই থাকে। দূরের থেকে কেউ আসে কি? এই প্রশ্নের উত্তরে জনা তিনেককে পাওয়া গেল। দুজন ৬/৭ কিলোমিটার এবং একজন ১০ কিমি দূর থেকে আসে। তাদের প্রশ্ন করি বাড়ী থেকে কখন বেরোও? তখন দূরের জিনিসগুলো মানে বাড়ি, ল্যাম্পপোষ্ট এগুলো পরিষ্কার দেখতে পাও?

উত্তর ইতিবাচক। একজন নিজের থেকেই বলে কিন্তু তারপর যখন ক্লাসে আসি, ততক্ষণে দূরের জিনিসগুলো কেমন অস্পষ্ট হতে আরম্ভ করে। বাকিরা সায় দেয়, একজন বলে আরেকটু পরে চারদিক আরো ধোঁয়াটে হয়ে যাবে, একটু দূরের দোকান, বাড়িঘর কুয়াশায় ভালভাবে বোঝা যাবে না।

ওদের বলি এটা কুয়াশা নয়, এটাকে আলোক-রাসায়নিক ধোঁয়াশা (photochemical smog) বলা হয়, তোমরা পরীক্ষায় শর্ট নোটে যে আলোক-রাসায়নিক ধোঁয়াশার কথা লেখ সেটা এখন তোমরা চোখের সামনে দেখত্বে পাচ্ছ। কুয়াশা অতিক্ষুদ্র জলকণায় তৈরী, সেদিক থেকে দেখলে অনেকটা মেঘের মত, শুধু মাটির কাছাকাছি থাকে, মেঘের মত আকাশের বুকে ঘুরে বেড়ায় না। সেইজন্য কুয়াশার মধ্যে বেরোলে জামা কাপড় ভেজা ঠেকে, গায়ে ভেজা অনুভূতি হয়।

ধোঁয়াশার জন্য জলের প্রয়োজন নেই, যদিও ক্ষেত্র বিশেষে এর অণুগুলোর উপরেও কিছুটা জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হতে পারে। ফলে, বিশেষ করে কলকাতায়, এর মধ্য দিয়ে হাঁটলে স্যাতস্যাঁতে অনুভূতি হয় না। ধোঁয়াশা সৃষ্টির জন্য সূর্যালোক অত্যাবশ্যক। সূর্যের আলোর উপস্থিতিতে বাতাসে ভাসমান উদ্বায়ী কার্বন যৌগ (VOC) নাইট্রোজেনের বিভিন্ন অক্সাইডের সঙ্গে বিক্রিয়া করে নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড, ওজোন ও পারঅক্সিঅ্যাসিটাইল নাইট্রেট (PAN) তৈরী করে। ওজোন ও প্যান, দুটিই মানুষের পক্ষে ক্ষতিকর, ফলে এই ধোঁয়াশার সংস্পর্শে বেশীক্ষণ থাকলে চোখ জ্বালা করে, শারীরিক অস্বস্তি হয়, বমিভাবও হয়তে পারে।

একজন জিজ্ঞেস করে ধোঁয়াশার অমন একটা ময়লাটে রঙ হয় কেন? ঠিক সাদাও নয়, কেমন একটা বিচ্ছিরি রঙ!

তাকে বলি ধোঁয়াশার আণবিক মিশ্রণের অনেকগুলোই আকারে বেশ বড়, আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের তুলনীয়। এর ফলে এর মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় আলোক তরঙ্গের বিক্ষেপণ হয়, বিক্ষেপক কণার আকার বড় হওয়ার ফলে ‘মি’ বিক্ষেপণ (Mie scattering) হয়, সব তরঙ্গদৈর্ঘের আলোই সমান ভাবে বিক্ষেপিত হওয়ায় ধোঁয়াশার রঙ সাদা হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইডের রঙ গাঢ় বাদামী, সাদার সঙ্গে মিশে একটা ময়লাটে রঙের সৃষ্টি করে। ওদের বলি, তোমরা যারা দূরের থেকে আস যখন বেরোও তখনও আলো ফোটে না, বাতাসে এই অণুগুলো থাকলেও সূর্যের আলো নেই বলে সেগুলো বিক্রিয়া করে না, ফলে তখন তোমরা যতদূর রাস্তার আলো যাচ্ছে, ততদূর পরিস্কার দেখতে পাও, আর যেই আলো ফুটতে আরম্ভ করে বায়ুর মধ্যে থাকা অণুগুলো বিক্রিয়া করে অপেক্ষাকৃত বড় অণুর সৃষ্টি করে আর তাতে বিক্ষেপণ ঘটে বলেই চারিদিক ধোঁয়াটে লাগে।

ভাবতে ভাবতে গন্তব্যে পৌঁছে যাই। আজ সকালের ক্লাসে গুটিছয়েক এসে পৌঁছেছে। আসলে এত সকালে ক্লাসে বেশী ছাত্রী থাকে না। খুব বেশী হলে ষোল/সতেরো জন, কম হলে এক দুজনও হয়। আগেরদিন ধোঁয়াশা দিয়ে বায়ুদূষণ আরম্ভ হয়েছিল, আজকেও তাই চলবে। দূষণ ব্যাপারটা কি? যে কোন কিছু যা তার পরিবেশের ক্ষতি করতে সক্ষম তা যদি সে দেশের প্রশাসন নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশী পরিমাণে থাকে তবে বলা হয় দূষণ হয়েছে। প্রতিটি দেশেই বিভিন্ন দূষকের মাত্রা সে দেশের প্রশাসন বেঁধে দেয়, সেই মাত্রার চেয়ে বেশী হলে দূষণ, নইলে নয়। ব্যাপারটা এমন, আমি যদি একটা বিশাল মাঠের কোন জায়গায় একটিমাত্র উনুন জ্বালি, ধোঁয়া সহ অন্যান্য দূষক বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়বে এবং মাঠটা যথেষ্ট বড় হলে বায়ুর মধ্যে অন্যান্য উপাদান, যেমন দহন হয়নি এমন জ্বালানী কণা (কার্বন), কার্বন মোনোক্সাইড, সালফার-ডাই-অক্সাইড ইত্যাদি এমন মাত্রায় থাকবে, দেশের আইনানুযায়ী যা দূষণমাত্রার কম। কিন্তু এই উনুনটা যদি আমি ক্লাসরুমের মধ্যে জ্বালাই, উপরোক্ত কণা এবং গ্যাসের মাত্রা স্বচ্ছন্দে অনুমোদিত দূষণমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে।

বায়ুর মধ্যে দূষক হিসাবে কণা বা গ্যাস দুটোই থাকতে পারে। কণা মানে সেগুলো যে সব কঠিন (solid) পদার্থ তা কিন্তু নয়। কঠিন কণা ছাড়াও কিছু খুব ছোট তরল কণা বাতাসে প্রলম্বিত থাকে, তার মধ্যে অ্যাসিড কণা, উদ্বায়ী জৈব যৌগ ইত্যাদি নানারকম দূষক থাকে। এই কণার মাপ যদি এক মাইক্রনের (এক মাইক্রণ এক মিটারের দশ লক্ষ ভাগের এক ভাগ) এক হাজার ভাগের কয়েক ভাগ থেকে আরম্ভ করে কয়েক মাইক্রন পর্যন্ত হয় তবে তাকে এরোসল (aerosol) বলা হয়।

বায়ুর কিছু প্রধান দূষকের মাত্রা হিসাব করে বার করা হয় বায়ু গুণমান সূচক (Air quality index বা সংক্ষেপে AQI)। ছাত্রীদের বলি নিজেদের স্মার্টফোন খুলে কলকাতা এবং আরো কয়েকটি দেশী বিদেশী শহরের AQ। বার করে দেখতে। বায়বীয় উপাদানের মোট ছটিকে দূষক হিসেবে ধরা হয়, 10 মাইক্রন বা তার চেয়ে ছোট মাপের কণা (10pm), 2.5 মাইক্রন বা তার চেয়ে ছোট মাপের কণা (2.5 pm), কার্বন মোনোক্সাইড (CO), সালফার-ডাই-অক্সাইড (SO₂) নাইট্রোজেনের অক্সাইডসমূহ (N2O, NO এবং NO₂ এদের একত্রে NO, বলে) এবং ওজোন (O3)। এদের মধ্যে CO, SO₂ এবং NO, প্রাথমিক দূষক, অর্থাৎ উৎস থেকে এই গ্যাসগুলি সরাসরি নিঃসৃত হয়, ০₃ গৌণ দূষক, সূর্যের আলোয় বিভিন্ন প্রাথমিক দূষকের আন্তঃবিক্রিয়ার ফলে এর সৃষ্টি। এর পরেই প্রত্যাশিত প্রশ্ন এল।

 

ওজোন তো প্রয়োজনীয় জিনিস, সেটা দূষক কেন?

 

বললাম হ্যাঁ, ওজোন অবশ্যই প্রয়োজনীয়, কিন্তু সে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে, যেখানে সে ছাতার মত পৃথিবীপৃষ্ঠকে অতিবেগুণী রশ্মি থেকে রক্ষা করে, কিন্তু ট্রপোস্ফিয়ারে এটি দূষক। প্রাথমিক দূষক নয়, অন্যান্য প্রাথমিক দূষকের বিক্রিয়াজাত গৌণ দূষক। ট্রপোস্ফিয়ারে ওজোন তৈরী হয় কি করে? সূর্যালোকে যানবাহন নির্গত নাইট্রোজেনের অক্সাইড এবং উদ্বায়ী জৈব যৌগের বিক্রিয়ার ফলে ওজোন্ তৈরী হয়। ট্রাফিক জ্যামে অনেকক্ষণ আটকে থাকলে শ্বাসকষ্ট, নিশ্বাসের সমস্যা, বুকে ব্যথা ইত্যাদি হবার জন্য দায়ী ট্রপোস্ফিয়ারের ওজোন।

 

 

কার্বন মনোক্সাইড বিষাক্ত গ্যাস এবং খুব গোলমেলে অসুস্থিত যৌগ। এতে কার্বনের সঙ্গে একটিমাত্র অক্সিজেন পরমাণু থাকে, এবং এর সবসময় চেষ্টা থাকে অন্যকোন জায়গা থেকে যেন তেন প্রকারেণ আরেকটি অক্সিজেন পরমাণু জোগাড় করে সুস্থিত কার্বন-ডাই-অক্সাইডে পরিণত হতে। কার্বন মনোক্সাইড বাতাসে বেশীক্ষণ থাকলে বাতাসের অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে কার্বন ডাই অক্সাইডে পরিণত হয়। ঝামেলা হয় যদি কার্বন মনোক্সাইড যে পরিমাণে তৈরী হচ্ছে তার চেয়ে কম পরিমাণে বাতাসে ছড়াতে পারে। সেক্ষেত্রে এই বাড়তি অংশ মানুষের (বা অন্যান্য প্রাণীর) শ্বাসযন্ত্র দিয়ে রক্তে ঢুকে পড়ে। রক্তের মধ্যে লোহিত রক্ত কণিকার হিমোগ্লোবিন অক্সিজেনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অক্সিজেন পরিবহণ করে থাকে। কার্বন মনোক্সাইড অক্সি-হিমোগ্লোবিন থেকে অক্সিজেন টেনে নিয়ে নিজে কার্বন ডাই অক্সাইড হয়ে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। আমাদের শরীর অতি প্রয়োজনীয় অক্সিজেন থেকে বঞ্চিত হয়। আমাদের দেশে প্রতিবছরই শীতে কিছু দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যুর খবর জানা যায়- অত্যধিক শীতে ঘরের মধ্যে আগুন জ্বেলে সমস্ত দরজা জানালা বন্ধ করে ঘুমোনোর ফলে মৃত্যু হয়েছে, এগুলি কার্বন মনোক্সাইড জনিত মৃত্যু। বন্ধ ঘরে সীমিত অক্সিজেনের মধ্যে কার্বন যৌগের অসম্পূর্ণ দহনের ফলে তৈরী হওয়া কার্বন মনোক্সাইড মৃত্যু ডেকে আনে।

এবারে সালফার ডাই-অক্সাইড SO₂ য়ের কথা। এর উৎস জৈব জ্বালানী। কয়লা, ডিজেল ইত্যাদির দহনে সালফার-ডাই-অক্সাইড বাতাসে মেশে। সালফার ডাই-অক্সাইড বায়ুর মধ্যে ভাসমান জলকণায় দ্রবীভূত হয়ে বা বৃষ্টির জলে দ্রবীভূত হয়ে সালফিউরাস অ্যাসিড কণায় পরিণত হয়। অতএব বায়ুতে সালফার-ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বাড়লে অ্যাসিড বৃষ্টির সম্ভবনা বাড়ে। আমাদের দেশে আবাসিক এলাকার বায়ুতে সালফার ডাই অক্সাইডের মাত্রা 24 ঘণ্টায় গড়ে প্রতি ঘন মিটারে সর্বাধিক ৪০ মাইক্রোগ্রাম [CPCB ambient pollutant) পর্যন্ত নিরাপদ বলে ধরা হয়। সালফার ডাই-অক্সাইড যে পরিমাণে শহরের বায়ুতে আছে তা দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের সর্বাধিক মাত্রার তুলনায় অনেক কম। অন্ততঃ সালফার-ডাই-অক্সাইডের বিষক্রিয়ায় শহরবাসীর আশঙ্কার কারণ নেই।

 

নাইট্রোজেনের অক্সাইডসমূহ গোটা তিনেক আছে, নাইট্রাস অক্সাইড (N₂O), নাইট্রিক অক্সাইড (NO) বা নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড (NO₂) এগুলি বাতাসে প্রলম্বিত জলকণা বা বৃষ্টিতে দ্রবীভূত হয়ে অ্যাসিড বৃষ্টি সৃষ্টি করতে সক্ষম। এ ছাড়াও এগুলি শ্বসন তন্ত্রের প্রদাহ ঘটায়, হাঁপানি বাড়ায়, কাশির সৃষ্টি করে। নিয়মিত নক্সের সংস্পর্শে আসা মানুষের COPD (Chronic obstructive pulmonary disease) হবার সম্ভবনা খুব বেশী। এছাড়া NO, মানবদেহের DNA য়ের পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম।

এ তো গেল বায়ুর দূষক গ্যাসের কথা। বাতাসের দূষকের মধ্যে কণা যেগুলি আকার অনুযায়ী সেগুলিকে আমরা প্রধানত দুটো ভাগে ভাগ করি pm 10 ও pm 2.5 য়ে। এ দুটির উপাদান বিবিধ। এগুলি কঠিন বা তরল এরোসল ধূলিকণা, লবণ, অদহিত জ্বালানী কণা (unburnt fuel particle or black carbon), উদ্বায়ী জৈব যৌগ ও নাইট্রোজেন অক্সাইডের সমন্বয়ে গঠিত বিভিন্ন যৌগ ইত্যাদি। এর মধ্যে একাধিক কণা ক্যান্সার সৃষ্টি করতে সক্ষম। ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগ্যানাইজেশন এই দুটির 24 ঘণ্টার গড় দূষণমাত্রা বেঁধে দিয়েছেন প্রতি ঘন মিটারে যথাক্রমে 45 মাইক্রোগ্রাম ও 15 মাইক্রোগ্রাম। ছাত্রীদের কাছে কলকাতার মানগুলো জানতে চাই। কলকাতায় সেই সময় pm 103 pm 2.5 যথাক্রমে 210 ও 148। এগুলো অবশ্য গড় নয়, তাৎক্ষণিক মান, তবে জোর বৃষ্টি না হলে এ সময়ে কলকাতার ২৪ ঘণ্টার গড় কখনই 100 র নীচে নামে না, কোনটারই না। কিন্তু এই কণাগুলিকে দূষক বলা হয় কেন? এটা নিয়ে আলোচনার সময় পাওয়া যায় না, ঘণ্টা পড়ে যায়।

দিনের শেষের ক্লাসে অন্য কিছু ছাত্রীদের সঙ্গে অন্য ক্লাসঘরে দেখা হল, এখানেও বিষয় বায়ুদূষণ কিন্তু এবারে আলোচ্চ বিষয় শীতকালে ধোঁয়াশা সৃষ্টির কারণ।

শীতকালীন ধোঁয়াশার প্রসঙ্গ উঠতেই দুজন প্রশ্ন করে এটা গরমকালে দেখা যায় না শুধু শীতকালেই দেখা যায়, কেন?

ব্যাপারটা আসলে বেশ সোজা, উত্তাপে বাতাসের চেয়ে মাটি আরো বেশী গরম হয়, শৈত্যেও বাতাসের চেয়ে মাটি আরো বেশী ঠাণ্ডা হয়। গরমকালে ভূপৃষ্ঠসংলগ্ন বায়ুস্তর তার উপরের বায়ুস্তরের চেয়ে গরম হয়ে যায়, গরম হলেই তার ঘনত্ব কমে, অর্থাৎ সে হাল্কা হয়ে আরো উপরে উঠে যায়, তার জায়গায় যে বায়ু আসে তারও একই অবস্থা হয় এবং এই চক্র চলতে থাকে। শীতকালে ঠিক এর উল্টোটা হয়, ভূমিসংলগ্ন বায়ুস্তর তার উপরের বায়ুস্তরের চেয়ে ঠাণ্ডা হয়, তার ঘনত্ব বাড়ে, ফলে সেটির ভূমির কাছেই থেকে যায়। এখন যাবতীয় দূষণ কিন্তু এই ভূমিসংলগ্ন বায়ুস্তরেই সব থেকে বেশী থাকে। গরমকালে এই বায়ুস্তরের ক্রমাগত ওলটপালটের ফলে ক্ষতিকারক গ্যাস ও কণার মাত্রা দূষণসীমার চেয়ে যথাক্রমে কম বা অল্প বেশী (কণার ক্ষেত্রে) থাকে। শীতকালে পুরো ব্যাপারটাই উলটে যায়, দূষণ নীচের স্তরেই সীমাবদ্ধ থাকে, অনেকসময় কয়েকদিন ধরেও এমন চলতে পারে।

 

অন্য প্রতিষ্ঠান, অন্য সময়, সামনের মুখগুলোও আলাদা, বিষয় এক, তবে এদের ক্লাসে আজ থেকেই বায়ুদূষণ পড়ানো হবে। বায়ুদূষণের ইতিহাস থেকে আরম্ভ করি।

1952 খ্রীষ্টাব্দ, লণ্ডন, ৫ ই ডিসেম্বর। সেদিন লণ্ডনে প্রচণ্ড ধোঁয়াশা, রাস্তায় বার হলে নিজের পা টাও দেখা যাচ্ছে না। ভূপ্রকৃতিগত কারণে শীতকালে লন্ডনের ধোঁয়াশা একাধিক দিন স্থায়ী হয়। আর এ তো নতুন কিছু নয়, ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকেই লণ্ডনে ধোঁয়াশার সমস্যা চলছে। শীতের দিনে আবাসিক এলাকায় শতাব্দীর পর শতাব্দী কয়লার ব্যবহার চলে আসছে। সপ্তদশ শতকে শিল্পায়নের পর থেকে শিল্পেও কয়লার ব্যবহার ক্রমাগত বাড়তে থেকে, সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দূষণের মাত্রাও বাড়তে থাকে। এই ডিসেম্বরের ধোঁয়াশা সেবারে পাঁচ দিন স্থায়ী হয়, এই ডিসেম্বর পর্যন্ত। লণ্ডনের কাজকর্ম প্রায় সমস্ত বন্ধ, ধোঁয়াশা শেষ হলে দেখা যায় সেই পাঁচ দিনে প্রায় চার হাজার বাড়তি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এখনকার গবেষকরা বলেন, চার হাজার নয়, আসল সংখ্যাটা বারো হাজারের কাছাকাছি।

 

এরোসলের উৎস কি? নিরির (NEERI) 2019 য়ের রিপোর্ট অনুযায়ী কলকাতায় pm 10 য়ের অর্ধেকের বেশী আসে রাস্তার ধুলো থেকে, অন্যান্য প্রধান উৎস হল আবাসগৃহ নিঃসরণ ও বাড়িঘর তৈরি এবং যানবাহন। আবার pm 2.5 য়ের প্রধান উৎসগুলি হল রাস্তার ধুলো, আবাসগৃহ নিঃসরণ এবং যানবাহনের নিঃসরণ। (13) এ তো গেল কলকাতার কথা। শহরতলী, বিশেষতঃ উত্তর শহরতলী, বরানগর, দমদম, বেলঘরিয়া এগুলির অবস্থা কলকাতার চেয়ে খারাপ। এখানে প্রবল উদ্যমে নগরায়ণ চলছে, ধুলোয় চারিদিক ভর্তি, সরু রাস্তায় যানবাহনের চাপও কলকাতার তুলনায় অনেক বেশী। উপরন্তু বেলঘরিয়া এক্সপ্রেসওয়ের পাশের ডাম্পিং গ্রাউণ্ডের অপরিকল্পিত ও অবৈজ্ঞানিকভাবে স্তূপীকৃত আবর্জনার নিঃসরণ কিছু কম নয়। কলকাতা পৌরসভার বাইরের এলাকা বলে কলকাতার বাতাসের পরীক্ষানিরীক্ষা থেকে অধিকাংশ সময় এই এলাকাগুলি বাদ পড়ে যায়। এইসব অঞ্চলে পরীক্ষা চালালে কলকাতার চেয়ে বায়ুদূষণ বেশ অনেকটাই বেশী হবার সম্ভবনা।

এরোসলের দূষণক্ষমতা কেমন? ছাত্রছাত্রীদের প্রশ্ন করি আচ্ছা এই ঘরের একটা জানালার একটা পাল্লা খোলা রেখে যদি বাকি দরজা জানালাগুলো সব বন্ধ করে দিই আর বাতাসে প্রচুর ধুলো থাকে কি হবে?

উত্তর আসে, ঘরে প্রচুর ধুলো ঢুকবে।

বলি বেশ, এবার ভাব একটা ছোট ঘর, তার দেয়াল, মেঝে, সিলিং সব জলে ভেজানো হয়েছে, সেই ঘরে একটা ছোট জানালা দিয়ে ধুলোভর্তি বাতাস আসছে, তাহলে কি হবে?

এর উত্তরও সঙ্গে সঙ্গে আসে, একটু পরে সব জায়গাতেই ধুলোর একটা স্তর পড়ে যাবে।

আমি বললাম একই ব্যাপার হয় আমাদের ফুসফুসের ভিতরে। নাকের মধ্য দিয়ে যে এরোসল্ভরা বাতাস শরীরের ভিতর ঢোকে, তার যাত্রাপথ শেষ হয় ফুসফুসের ছোট প্রকোষ্ঠ-অ্যালিল্ল্ভওলিতে। শেষোক্ত ছোট ঘরটির মত অ্যাল্ল্ভিগুলির প্রাচীর সবসময়েই সিক্ত থাকে আর এই প্রাচীরের মধ্য দিয়েই আমাদের অক্সিজেন-কার্বন ডাই অক্সাইড বিনিময় চলে। ঘরে ধুলো ঢুকলে আমরা তা ঝেড়ে পরিষ্কার করতে পারি, অ্যাল্ল্ভিওলি পরিষ্কার করার সহজ উপায় এখনো আমাদের অজানা। এ তো গেল অপেক্ষাকৃত বড় আকারের এরোসলের কথা। যেগুলো 2.5 pm তার মধ্যে 2.5 মাইক্রন এবং তার চেয়ে ছোট এরোসলগুলো থাকে, বেশী ছোটগুলো (.01 মাইক্রন বা আরো ছোট) স্বচ্ছন্দে অ্যাভিওলির প্রাচীরের মধ্য দিয়ে রক্তনালীতে চলে যেতে সক্ষম। সেগুলোই বেশী বিপজ্জনক।

 

কেন?

আমি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকি। আমার সামনে তরুণ প্রজন্মের সারি সারি মুখ। এই বায়ুদূষণ যদি অব্যাহত থাকে আরো দশ পনেরো বছর পর এদের কি হতে পারে তা এরা জানে না বলে এত নিশ্চিন্ত। আমার সামনে যারা আছে তাদের বয়স কত? আঠার, উনিশ, কুড়ি এমন। এরা যখন মধ্য তিরিশে পৌঁছবে তখন অত্যধিক কণাদূষণের গোটা পনেরো শীতকাল পার করবে। শীতকালের স্থায়িত্ব গড়ে তিনমাস ধরলে অত্যধিক দূষণের মধ্যে ওরা প্রায় চার বছর থাকবে। ভোরের বাসের ওই ঘুমিয়ে পড়া বাচ্ছা, স্কুলের সেই ছাত্রীরা? ওদের কথা ভাবতেই ভয় করছে। এ তো গেল শীতকালের কথা, আর বছরের বাকি সময়?

 

আমাদের দেশে শীতকালে গোটা উত্তর ভারতের ওপরেই বায়ুস্তর দূষিত থাকে, স্যাটেলাইট থেকে তোলা ভারতের ছবিতে আকাশের এই ধূসরাভ চেহারা স্পষ্ট ধরা পড়ে।

গরমকালে কণা দূষণ কিঞ্চিৎ কম হলেও তা খুব কম নয়। বর্ষাকালে কণা দূষণের পরিমান সবচেয়ে কম, তাও তা ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশনের অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে অনেকটা বেশী। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মাস্ক পরার প্রবণতাও সবচেয়ে কম। দীর্ঘদিন এই মারাত্মক দূষণের মধ্যে থাকার ফলে এদের অধিকাংশই শ্বাসকষ্টে ভুগবে, অনেকের হৃদযন্ত্রের সমস্যা দেখা দেবে (10), ফুসফুসের মধ্য দিয়ে শরীরের ভিতর কারসিনোজেন ঢোকার ফলে অনেকে ক্যান্সার আক্রান্ত হবে (11), অস্থিসন্ধির সমস্যায় ভুগবে (12), অবসাদৃগ্রস্ত হবে (10)। স্লো পয়জনিং, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কেউ কারণ জানবে না।

আর লন্ডন? যে শহরের বায়ুদূষণের ভয়াবহ ফলাফল সারা পৃথিবীর নজর কেড়েছিল? যে ঘটনার চার বছরের মাথায় যুক্তরাজ্যের সরকার প্রথম বায়ুদূষণ আইন তৈরী করেছিল। স্মার্টফোন খুলে লণ্ডনের বায়ুর অবস্থা দেখি।

লণ্ডনের বাতাসের অবস্থা ওদের পড়ে শোনাই। এখন তিনটে বাজে, লণ্ডনে সময় সকাল সাড়ে নটা। একেবারে অফিসের সময়। বায়ু গুণমান সূচক 52, pm 2.5 এর মান 7, কলকাতায় এই মান সাম্প্রতিক কালে কোনদিন দেখেছি বলে মনে করতে পারছি না। লণ্ডনে যখন বায়ুদূষণের জন্য মানুষ মারা যাচ্ছে তখন ভারতে বায়ুদূষণের অস্তিত্ব ছিল না, তিয়াত্তর বছর পরে একটি আদ্যন্ত শিল্পায়িত দেশের রাজধানী হওয়া সত্ত্বেও লন্ডন পৃথিবীর অন্যতম দূষণমুক্ত শহর। আর আমরা? একই সময়ের মধ্যে আমরা আমাদের দেশকে ভবিষ্যত প্রজন্মের বাসের অযোগ্য করে তুলেছি।

তারপর ওদের ‘কেন’র উত্তর দিই। আসলে আমাদের, মানে আমাদের মত যারা ষাটের দোরগোড়ায় প্রায় পৌঁছে গেছে তাদের জীবনসীমা কিছুটা কমে যাওয়া ছাড়া বিশেষ কোন ক্ষতি হবে না। হয়ত দশ বছর বাঁচতাম, তার জায়গায় পাঁচ বছর বা দু বছর বাঁচব। আমরা জীবনসায়াহ্নে এসে গেছি, এটা এমন কিছু বেশী ব্যাপার নয়। আমাদের খুব বেশীদিন বায়ুদূষণের মুখোমুখি হতে হয় নি, আমরা যখন ছাত্রছাত্রী ছিলাম, এই শহরে বায়ুদূষণের অস্তিত্ব ছিল না, আজ থেকে দশ বছর আগেও বায়ুদূষণ এত ভয়ংকর হয়ে ওঠে নি। বায়ুদূষণজনিত রোগ কি কি হতে পারে তাই নিয়ে আলোচনা করি। শেষে বলি তোমরাই এটা পাল্টাতে পার। সাধরণ মানুষ বায়ুদূষণ নিয়ে মাথা ঘামায়না বলে প্রশাসনিক স্তরেও এই নিয়ে মাথাব্যথা নেই। কোন রাজনৈতিক দলের এজেণ্ডায় বায়ুদূষণ কোনদিন জায়গা পায় নি। কিন্তু রাজনৈতিক দল, প্রশাসন এর মানুষগুলো আসে কোথা থেকে? এই সাধরণ মানুষজনের মধ্য থেকেই। সকলে সচেতন হলে এবং সকলের সদিচ্ছা থাকলে তবেই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বায়ুদূষণ থেকে রেহাই পেয়ে সুস্থভাবে বাঁচবে, নইলে নয়।

 

 

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles