Home DRAFT এখনও সুপ্তি- শয়ানে ভারত

এখনও সুপ্তি- শয়ানে ভারত

0 comments 147 views

বাংলাস্ফিয়ার:   ফ্রান্সে ১৫ বছরের নীচে শিশুদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ এবং অস্ট্রেলিয়ার ১৬ বছরের নীচে সরাসরি ব্যান, এই দুই সিদ্ধান্তের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, এই বৈশ্বিক প্রবণতার ভারত কোথায় দাঁড়িয়ে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশু-কিশোর জনগোষ্ঠীর দেশ হওয়া সত্ত্বেও ভারত এখনও কোনও বয়সভিত্তিক সোশ্যাল মিডিয়া নিষেধাজ্ঞার পথে হাঁটেনি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে রাষ্ট্র উদাসীন। বরং ভারতের অবস্থান এখন এক ধরনের নীরব পুনর্বিবেচনার পর্যায়ে, যেখানে সরাসরি নিষেধ নয়, নিয়ন্ত্রণ ও দায়বদ্ধতার ভাষাই প্রাধান্য পাচ্ছে।

 

ভারতীয় আইনি কাঠামো: নিষেধ নয়, নিয়ন্ত্রণ

বর্তমানে ভারতের ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণের মূল ভিত্তি Information. Technology Aut. 2000 এবং তার অধীনে প্রণীত সংশোধিত আইনি বিধান। সর্বশেষ সংযোজন ২০২১ সালে আনা IL Rules 2021 সোশ্যাল মিডিয়া সংস্থাগুলির উপর নতুন দায়িত্ব চাপিয়েছে, “বিশেষ করে শিশু সুরক্ষার প্রশ্নে। এই নিয়ম অনুযায়ী প্ল্যাটফর্মগুলিকে ক্ষতিকর কনটেন্ট দ্রুত সরাতে হবে এবং ব্যবহারকারীদের অভিযোগ নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট সময়সীমা মানতে হবে।

২০২৩ সালে পাশ হওয়া Digital Personal Data Protection Act শিশুদের ডিজিটাল জীবনে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপকে আরও স্পষ্ট করেছে। এই আইনে বলা হয়েছে, ১৮ বছরের নীচে কোনও ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য প্রক্রিয়াকরণের ক্ষেত্রে বাপ-মায়ের সম্মতি বাধ্যতামূলক। কার্যত এটি একটি পরোক্ষ বয়স-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, যদিও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়নি।

সরকার কী ভাবছে: স্বাধীনতা বনাম সুরক্ষা

ভারতীয় সরকারের অবস্থান এখনও প্রকাশ্যে দ্ব্যর্থহীন নয়। একদিকে রয়েছে ডিজিটাল অর্থনীতি, স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের প্রশ্ন। অন্যদিকে, শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য, সাইবার-বুলিং, অনলাইন যৌন শোষণ এবং আসক্তির মতো গুরুতর সমস্যা ক্রমশ দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।

সরকারি মহলে বারবার বলা হয়েছে ভারত ইউরোপ বা অস্ট্রেলিয়ার মতো সরাসরি ব্যান আরোপ করতে চাইছে না। এর পিছনে যুক্তি হলো, ভারতের সামাজিক বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে স্মার্টফোন অনেক সময় শিক্ষার একমাত্র মাধ্যম, বিশেষ করে গ্রাম ও প্রান্তিক অঞ্চলে। ফলে সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করলে ডিজিটাল বৈষম্য আরও বাড়তে পারে।

বাস্তব সমস্যা: নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি

তবে বাস্তব পরিস্থিতি বলছে অন্য কথা। ভারতে লক্ষ লক্ষ নাবালক অনায়াসেই সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট খুলছে। বয়স যাচাই প্রায় নেই বললেই চলে। অ্যালগরিদমিক ফিড শিশুদের ক্রমশ বেশি সময় স্ক্রিনে আটকে রাখছে। কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে উদ্বেগ, অবসাদ এবং আত্মবিশ্বাস কমার সঙ্গে ডিজিটাল জীবনের সম্পর্ক নিয়ে চিকিৎসক ও মনোবিদরা ক্রমশ সরব হচ্ছেন।

এই প্রেক্ষিতে ভারতের বর্তমান নীতিকে অনেক বিশেষজ্ঞই বলছেন-“আইন আছে, প্রয়োগ নেই।” অর্থাৎ নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও যে নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে, তার বাস্তব রূপ এখনও দুর্বল।

আদালত ও জনস্বার্থ: ভবিষ্যৎ চাপের ইঙ্গিত

ভারতে শিশুদের ডিজিটাল সুরক্ষা নিয়ে বিষয়টি ধীরে ধীরে আদালত ও জনস্বার্থ মামলার পরিসরে ঢুকছে। বিভিন্ন হাইকোর্টে অনলাইন গেমিং, আসক্তিকর অ্যাপ এবং শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রশ্নে মামলার সংখ্যা বাড়ছে। যদিও এখনও কোনও আদালত সরাসরি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যানের নির্দেশ দেয়নি, তবে বিচারব্যবস্থার ভাষা ক্রমশ কঠোর হচ্ছে-বিশেষ করে কর্পোরেট দায়বদ্ধতার প্রশ্নে।

এটি ইঙ্গিত দেয়, ভবিষ্যতে আইনসভা নয়, বিচারব্যবস্থার চাপেও সরকারকে অবস্থান স্পষ্ট করতে হতে পারে।

ভারত কি ফ্রান্সের পথে হাঁটবে?

এই মুহূর্তে সংক্ষিপ্ত উত্তর-না, অন্তত এখনই নয়। ভারতের নীতি স্পষ্টভাবে ফ্রান্স বা অস্ট্রেলিয়ার মতো সরাসরি নিষেধাজ্ঞার দিকে যাচ্ছে না। তবে দীর্ঘমেয়াদে দুটি সম্ভাবনা উন্মুক্ত। এক, বয়স যাচাই ও পিতামাতার সম্মতিকে কঠোরভাবে কার্যকর করা। দুই, নির্দিষ্ট বয়সের নীচে

অ্যালগরিদমিক কনটেন্ট সীমিত করা, যা কার্যত আংশিক নিষেধাজ্ঞার সমান।

ভারত সম্ভবত এমন একটি পথ বেছে নেবে, যেখানে রাষ্ট্র প্রকাশ্যে ‘ব্যান’ শব্দটি ব্যবহার না করেও বাস্তবে শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে বড়সড় বাধা তৈরি করবে।

দেরিতে হলেও এড়ানো যাবে না

এক সময় সোশ্যাল মিডিয়া ভারতে ‘ডিজিটাল মুক্তি’-র প্রতীক ছিল। কিন্তু সময় বদলেছে। শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক বিকাশ এবং অনলাইন নিরাপত্তা এখন আর ব্যক্তিগত পরিবারের সমস্যা নয়, এটি জাতীয় উদ্বেগের প্রশ্ন। ফ্রান্স ও অস্ট্রেলিয়া সেই বাস্তবতাকে স্পষ্ট ভাষায় স্বীকার করেছে। ভারত এখনও দ্বিধাগ্রস্ত, কিন্তু এই দ্বিধা দীর্ঘস্থায়ী হবে না।

প্রশ্ন আর এটা নয়-ভারত নিয়ন্ত্রণ করবে কি না। প্রশ্ন শুধু-কখন, এবং কতটা কঠোরভাবে।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles