Home খবরা খবর বেজিং- ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বলা হচ্ছে, দেখ কেমন লাগে

বেজিং- ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বলা হচ্ছে, দেখ কেমন লাগে

0 comments 125 views

 

বাংলাস্ফিয়ার:  অস্ত্রচুক্তি, বাণিজ্য আর নীরব সমঝোতায় গড়ে উঠছে নতুন কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা

ট্রাম্পের শুল্ক-রাজনীতি, চিন ও রাশিয়ার চাপের মধ্যে ইউরোপ আর ভারত  কি আদর্শ বিসর্জন দিয়ে বাস্তববাদকেই বেছে নিচ্ছে?

স্ট্যান্ডফার্স্ট ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতা কমাতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভারত একে অপরের দিকে ঝুঁকছে । কিন্তু এই নতুন
ঘনিষ্ঠতা কি কেবল স্বার্থের হিসাব, নাকি এর আড়ালে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও রাজনৈতিক মূল্যবোধ নিয়ে এক স্বস্তিদায়ক নীরবতা কাজ করছে?

গত বছর ফেব্রুয়ারিতে ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি Ursula von der Leyen যখন সব সহকর্মী কমিশনারকে সঙ্গে নিয়ে
নয়াদিল্লিতে হাজির হয়েছিলেন, তখন সেটি কেবল আনুষ্ঠানিক । কূটনৈতিক সফর ছিল না সেটি ছিল একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক সঙ্কেত। এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে তাঁর আ বার ভারতে ফেরা এবার ইউরোপীয় কাউন্সিলের সভাপতির সঙ্গে, এবং ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের বিশেষ অতিথি — হিসেবে এই সঙ্কেতকে আরও জোরালো করে তুলেছে। তার আগেই জানুয়ারির মাঝামাঝি ভারত সফর
করেছেন জার্মান চ্যান্সেলর, আর ফেব্রুয়ারির শুরুতে আসছেন । ফরাসি প্রেসিডেন্ট এত ঘন ঘন সফর একটাই কথা বলছে, ইউরোপ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে এখন সামরিক । স্তরে তুলে আনতে চায়।

 

এই সফরগুলির মূল আলোচ্য বিষয় চুক্তি আর সেই চুক্তির বড়  অংশই অস্ত্র কেনাবেচা সংক্রান্ত। জার্মানির সঙ্গে সাবমেরিন, ফ্রান্সের সঙ্গে রাফাল যুদ্ধবিমান ভারত আজও বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিদেশি অস্ত্র আমদানিকারক বহু বছর ধরে আলোচনায় ঝুলে থাকা ভারত ইউরোপ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিও অবশেষে চূড়ান্ত হওয়ার মুখে । যদিও চুক্তির বিস্তারিত এখনও অস্পষ্ট, এবং ইউরোপীয় কূটনৈতিক মহলে এমন গুঞ্জনও শোনা যাচ্ছে যে জাতীয়- সুরক্ষাবাদী চাপের কারণে  এটি দুই পক্ষের প্রত্যাশা পূরণ নাও হতে পারে। কৃষিক্ষেত্রকে আলোচনার বাইরে রাখাই তার সবচেয়ে বড় ইঙ্গিত।

তবু ইউরোপীয় নেতৃত্ব এই চুক্তিকে অভিহিত করছে ”সব চুক্তির জননী” বলে । একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তাঅংশীদারিত্ব চুক্তির ঘোষণাও এসেছে । বাস্তবে এই চুক্তিগুলির  তাৎপর্যঅর্থনীতির চেয়ে রাজনীতিতেই বেশি।

এই ঘনিষ্ঠতার কেন্দ্রে রয়েছেএকটি স্পষ্ট লক্ষ্য-বিশ্বকে দেখানো  যে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে বিকল্প পথও আছে। বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন ট্রাম্প তাঁর পুরনো বন্ধুদের উপরও শুল্ক চাপাচ্ছেন এবং ভূরাজনীতিকে সরাসরি বাণিজ্যিক  চাপের ভাষায় নামিয়ে আনছেন। ভারতের ক্ষেত্রে এই শুল্ক প্রথমে ২৫ শতাংশ ধার্যকরা হয়েছিল, পরে তা দ্বিগুণ করা হয়, রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করাতে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে।

এই প্রেক্ষাপটে ইউরোপ ও ভারতের মধ্যে যে সমীকরণ তৈরি হচ্ছে, তা ‘ দুই মাঝারি ’ শক্তির এক ধরনের আত্মরক্ষামূলক । জোট একদিকে ট্রাম্পের অনিশ্চিত আমেরিকা, অন্যদিকে — চিন যে দেশ ভারতের জন্য সামরিক হুমকি হলেও ইউরোপসহ প্রায় সবারই অর্থনৈতিক নির্ভরতার  কেন্দ্র। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাশিয়া যা ইউরোপের চোখে এখন প্রধান শত্রু। এই তিনমুখী চাপের মাঝখানেই ইউরোপ ও ভারত একে অপরকে একান্ত প্রয়োজনীয় বন্ধুপক্ষ বলে  ভাবতে শুরু করেছে ।

 

কিন্তু এই ঘনিষ্ঠতার পথে বড় বাধা হোল রুশ-ভারত বন্ধুত্ব ব্রাসেলসের আশা ছিল, নয়াদিল্লি ধীরে ধীরে মস্কো থেকে দূরে  সরে আসবে। বাস্তবে তা হয়নি ভারত এখনও রুশ অস্ত্র কিনছে— সংখ্যায় কম, কিন্তু সামরিক মানদন্ডে  গুরুত্বপূর্ণ। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রশ্নে ভারত কখনও প্রকাশ্যে রাশিয়ার বিরোধিতা করেনি। রাষ্ট্রসঙ্ঘে রাশিয়ার বিরুদ্ধে আনা প্রতিটি প্রস্তাবেই সে ভোটদানে বিরত থেকেছে।

জার্মান চ্যান্সেলর প্রকাশ্যে বলেছিলেন, রুশ অস্ত্রনির্ভরতা কাটাতে তিনি ভারতকে সাহায্য করতে প্রস্তুত । এর জবাবে
ভারতের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে জানানো হয়, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে কেবল জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে । পোল্যান্ডের বিদেশমন্ত্রী যখন রুশ তেল কেনা কমানোর জন্য ভারতকে অভিনন্দন জানান, সেটিও নয়াদিল্লি ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। কারণ বাস্তবে সেই কেনাকাটা  তখনও খুব একটা কমেনি।

 

 

শেষ পর্যন্ত ইউরোপই পিছু হটে। জানানো হয়, এ বিষয়ে ভারতের উপর কোনও চাপ দেওয়া হবে না এখানেই আমেরিকার কৌশল ও ইউরোপের অবস্থানের পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে  ওঠে ।  ইউরোপ আপাতত নয়াদিল্লি মস্কো সম্পর্ক প্রভাবিত করার চেষ্টা কার্যত ছেড়ে দিয়েছে, এমন সময়েও যখন  ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসন আরও তীব্র হচ্ছে।

এই সব কৌশলগত হিসাবের মধ্যেই ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা আরও কঠোর হয়ে উঠছে।  তবু
ইউরোপীয় “ নেতারা এখনও ভারতকে বিশ্বের বৃহত্তম দেশ ও বৃহত্তম গণতন্ত্র বলে বর্ণনা করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
বাস্তবে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা নিয়মিত বৈষম্য ও সহিংসতার শিকার। গণমাধ্যম, বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি সংস্থা, প্রায়
সব কিছুসমগ্র নাগরিক সমাজ ধীরে ধীরে সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছেনির্বাচন ব্যবস্থাকে ঘিরে। ২০২৫ সালের শেষ দিক থেকে শুরু হওয়া ভোটারতালিকা সংশোধনের ফলে কয়েক কোটি মানুষ ভোটাধিকার হারাতে — পারেন এমন আশঙ্কা বিশেষজ্ঞরা প্রকাশ করেছেন। অতীতে এই ধরনের বিষয় নিয়ে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সরব হয়েছে । এবার তারা নীরব ।  এই নীরবতার ব্যাখ্যা শুধুবাস্তববাদ নয় ইউরোপের নিজের রাজনৈতিক  ভূগোলও বদলে যাচ্ছে। বহু দেশে চরম দক্ষিণপন্থীরা হয় ক্ষমতায়, নয়তো নীতিনির্ধারণের সুর ঠিক করে  দিচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঘোষিত মূল্যবোধ
ভেতর  থেকেই ক্ষয়ে যাচ্ছে।

 

এই প্রেক্ষাপটে ইউরোপ ও ভারতের ঘনিষ্ঠতা ভবিষ্যতে কেবল পারস্পরিক স্বার্থের হিসাবেই নয়, বরং এক ধরনের
আদর্শগত সাযুজ্যের উপরও দাঁড়াতে পারে- এই আশঙ্কাই ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে।  আমেরিকার বাইরে বিকল্প দেখাতে
গিয়ে ইউরোপ যদি নিজের নৈতিক অবস্থানই ঝুলিয়ে রাখে, তবে সেই বিকল্প আদৌ কতটা ভিন্ন থাকবে, এই প্রশ্নটাই
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

 

 

 

 

 

 

 

Authors

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles