Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: এবার আইন করে বাচ্চাদের ডিজিটাল সংযোগ ছিন্ন করার প্রয়াস।
জাতীয় সংসদে প্রথম ধাপে অনুমোদন, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকেই কার্যকর করার লক্ষ্য
ফ্রান্সে শিশু ও কিশোরদের ‘ডিজিটাল জীবনে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ আরোপের পথে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় এল সোমবার, ২৬ জানুয়ারি। জাতীয় সংসদ আঁসাঁব্লে নাসিওনাল এই উদ্দেশ্যে আনা একটি প্রস্তাবিত নতুন আইনের সম্ভাব্য বিশেষ ধারাগুলি এদিন প্রাথমিকভাবে অনুমোদন করেছে। দীর্ঘ বিতর্কের পর হওয়া এই ভোটে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, ফ্রান্স সরকার শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক বিকাশ এবং ডিজিটাল নিরাপত্তাকে কেন্দ্র করে একটি নতুন নীতিগত দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাইছে। এই বিলটির উত্থাপক মধ্যপন্থী সাংসদেরা। যদিও এর প্রধান রাজনৈতিক সমর্থক রাষ্ট্রপতি এমানুয়েল মাক্রোঁ। প্রাথমিক অনুমোদনের পর বিলটি পূর্ণাঙ্গ ভোটের জন্য আবার সংসদে তোলা হবে এবং তার পর পাঠানো হবে সিনেটে।
রাষ্ট্রপতির যুক্তি: শিশুদের আবেগ বিক্রির পণ্য নয়
সোশ্যাল মিডিয়ার বিস্তার যত বেড়েছে, ততই বেড়েছে উদ্বেগ। শিশু ও কিশোরের জীবনে অতিরিক্ত স্ক্রিন-টাইম তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর কী প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে। এই প্রেক্ষিতেই শনিবার এক ভিডিও বার্তায় রাষ্ট্রপতি মাক্রোঁ বলেন, “আমাদের শিশু ও কিশোরদের আবেগ বিক্রির পণ্য নয়-না আমেরিকান প্ল্যাটফর্মের কাছে, না চীনা অ্যালগরিদমের হাতে।” মাক্রোঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, এই আইন কেবল স্বাস্থ্য বা শিক্ষার বিষয় নয়, বরং এটি সাংস্কৃতিক ও মানসিক সার্বভৌমত্বের প্রশ্নও। তাঁর মতে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলি আজ শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; তারা চিন্তা, অনুভূতি এবং দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণের শক্তিশালী হাতিয়ার।
সংসদীয় ভোট ও সময়সীমা
সোমবার গভীর রাতে অনুষ্ঠিত ভোটে ১১৬ জন সাংসদ নিষেধাজ্ঞার পক্ষে এবং ২৩ জন বিপক্ষে ভোট দেন। সরকারের লক্ষ্য, নতুন অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রে এই আইন ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের শুরু থেকেই কার্যকর করা।
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এবং সংসদের নিম্নকক্ষে মাক্রোঁর রেনেসাঁ দলের নেতা গ্যাব্রিয়েল আত্তাল জানিয়েছেন, তিনি আশা করছেন ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই সিনেট এই বিল পাশ করবে।
তাঁর কথায়, “১ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন অ্যাকাউন্টে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে। এর পর সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলিকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় দেওয়া হবে-যেসব পুরনো অ্যাকাউন্ট বয়সসীমা মানে না, সেগুলি নিষ্ক্রিয় করতে।”
শুধু স্বাস্থ্য নয়, ‘মন দখলের’ বিরুদ্ধেও লড়াই
আত্তাল স্পষ্ট করে বলেন, এই পদক্ষেপের লক্ষ্য কেবল কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষা নয়। তাঁর মতে, সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে এমন কিছু শক্তি সক্রিয় রয়েছে যারা পরিকল্পিতভাবে “মনের দখল” নিতে চায়। রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তারের এই লড়াইয়ে ফ্রান্স পিছিয়ে থাকতে চায় না।
“ফ্রান্স এক মাসের মধ্যেই ইউরোপের পথপ্রদর্শক হতে পারে। আমরা আমাদের তরুণদের ও পরিবারগুলির জীবন বদলাতে পারি, এমনকি আমাদের দেশের স্বাধীনতার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশও পাল্টে দিতে পারি।”
জনস্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কতা
এই রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেই ফ্রান্সের জাতীয় জনস্বাস্থ্য পর্যবেক্ষক সংস্থা ANSES চলতি মাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দিয়েছে। সংস্থার মতে, Tik Tok, Snapchat এবং Instagram-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলি কিশোর-কিশোরীদের উপর একাধিক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে-বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে।
ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে সাইবার-বুলিং, হিংসাত্মক কনটেন্টের সংস্পর্শ, এবং সামাজিক তুলনার চাপ। যদিও ANSES এটাও স্পষ্ট করেছে-সোশ্যাল মিডিয়া একমাত্র কারণ নয়, তবে এটি সমস্যাকে তীব্রতর করে তুলছে।
আইনের পরিধি ও ব্যতিক্রম
প্রস্তাবিত আইনে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে- “কোনও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম পরিচালিত সামাজিক নেটওয়ার্কিং পরিষেবায় ১৫ বছরের নীচে নাবালকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ।”
তবে নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখা হয়েছে অনলাইন বিশ্বকোষ এবং শিক্ষামূলক ডিরেক্টরি, যাতে শিক্ষার মৌলিক ডিজিটাল সম্পদ ব্যবহারে বাধা না আসে।
আইন কার্যকর করতে গেলে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে কার্যকর বয়স-যাচাই ব্যবস্থা। ইউরোপীয় স্তরে ইতিমধ্যেই এমন একটি প্রযুক্তিগত কাঠামো তৈরির কাজ চলছে বলে জানিয়েছে ফরাসি সরকার।
মোবাইল ফোন নিষেধাজ্ঞা: পুরনো অভিজ্ঞতা, নতুন প্রশ্ন
উল্লেখযোগ্য যে, ২০১৮ সালেই ফ্রান্স মধ্যবিদ্যালয়ে-১১ থেকে ১৫ বছর বয়সী ছাত্রছাত্রীদের জন্য-মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করেছিল। কিন্তু এই অভিজ্ঞতা সবসময় মসৃণ হয়নি।
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এলিজাবেথ বর্ন সোমবার টেলিভিশন চ্যানেল France 2-কে বলেন,
“বিষয়টা এত সহজ নয়। আগে আমাদের নিশ্চিত হতে হবে, মধ্যবিদ্যালয়ে যে নিষেধাজ্ঞা আছে, তা সত্যিই কার্যকর হচ্ছে কি না।”
এই মন্তব্য থেকেই বোঝা যায়, নতুন আইনের বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশাসনিক স্তরে এখনও প্রশ্ন ও সংশয় রয়ে গেছে।
ইউরোপ ও বিশ্বের দিকে তাকিয়ে ফ্রান্স
ডিসেম্বরে অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের নীচে শিশুদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করে বিশ্বে প্রথম নজির তৈরি করেছে। ফ্রান্স যদি এই আইন কার্যকর করতে পারে, তবে তা ইউরোপজুড়ে ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে একটি শক্তিশালী দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে।
এটি শুধু একটি সামাজিক আইন নয়; এটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ক্ষমতা, রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ এবং শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চলতে থাকা বৈশ্বিক বিতর্কের এক নতুন অধ্যায়।