- বাংলাস্ফিয়ার: যে বছরটি স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে তুলনামূলকভাবে শীতল হওয়ার কথা ছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত
রেকর্ডে লেখা হয়ে রইল অন্যতম উষ্ণ বছর হিসেবে। এই সপ্তাহে ইউরোপ ও আমেরিকার প্রধান জলবায়ু ও আবহাওয়া
পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলি ২০২৫ সাল সম্পর্কিত তাদের বার্ষিক মূল্যায়ন প্রকাশ করেছে। সব ক’টি প্রতিবেদনের সুর
একই—বিশ্ব উষ্ণায়নের গতি আরও দ্রুত হচ্ছে।
পরিমাপ শুরু হওয়ার পর থেকে গত ১১ বছরই উষ্ণ থেকে উষ্ণতর হয়েছে; তার মধ্যে সাম্প্রতিক তিন বছর শীর্ষস্থান দখল করে আছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তপ্ত ছিল ২০২৪ সাল। সেই বছরটি একদিকে শক্তিশালী এল নিনোর সঙ্গে মিলে গিয়েছিল, বাতাস ও সমুদ্রস্রোতের এমন এক বিন্যাস, যা বিশ্ব তাপমাত্রাকে স্বাভাবিকের তুলনায় এক ধাপে বেশ কিছুটা বাড়িয়ে দেয়। তদোপরি সে বছরেই ছিল সূর্যের ১১-বছরের চক্রের শীর্ষ মুহূর্ত।এটা এমন একটা সময় যখন সূর্য সবচেয়ে উজ্জ্বল থাকে। কিন্তু ২০২৫ সালে এল নিনোর প্রভাব কমে আসে; তার জায়গা নেয় বিপরীত প্রবণতা, লা নিনা। একই সঙ্গে সূর্যের উজ্জ্বলতাও ম্লান হয়ে যায়, কমতে শুরু করে। ফলে ২০২৫ সাল ২০২৪-এর তুলনায় কিছুটা ঠান্ডা হবে, এটিই প্রত্যাশিত ছিল।কিন্তু লা নিনার বছর হিসেবে বিচার করলে, ২০২৫ ছিল অস্বাভাবিক রকমের গরম—লা নিনা ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছর।
এর আগে লা নিনা যে বছরটিতে লালা দেখা গিয়েছিল দেখা দিয়েছিল—সে (২০০২) বছর বিশ্ব তাপমাত্রা শিল্পবিপ্লব- পূর্ব গড়ের তুলনায় ১.১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল, বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) হিসেব অনুযায়ী। ২০২৫ সালে সেই ব্যবধান বেড়ে দাঁড়ায় ১.৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, লা নিনার বছরে যাকে অপ্রত্যাশিত বৃদ্ধি বলা যেতে পারে। সাম্প্রতিক তিন বছরের গড় উষ্ণতা শিল্পবিপ্লব-পূর্ব স্তরের
তুলনায় ১.৪৮ থেকে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে, কোন ডেটাসেট ধরা হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে।
অনেক জলবায়ু বিজ্ঞানী ২০২৩ সালের পর থেকে দেখা এই ব্যতিক্রমী উষ্ণতা নিয়ে বড়সড় সিদ্ধান্ত টানতে এখনই রাজি নন। কারণ তাঁদের মনে আছে এক বিপরীত অভিজ্ঞতার কথা। ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে টানা কয়েক বছর ধরে তাপমাত্রা
জলবায়ু মডেলগুলির পূর্বাভাসের তুলনায় কম ছিল। যাকে তখন ‘জলবায়ু স্থবিরতা’ বা climate hiatus বলা হয়েছিল। সেই সময়
জলবায়ু পরিবর্তন তত্ত্বের বিরোধীরা জোর গলায় ঘোষণা করেছিল, বিশ্ব উষ্ণায়ন বুঝি থেমেই গেছে। বাস্তবে যা ঘটেছিল তা হলো কয়েকটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র সাময়িকভাবে একসঙ্গে কাজ করে পৃথিবীকে কিছুটা ঠান্ডা করে দিয়েছিল।
তবু এমন বেশ কিছু প্রমাণ রয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে উষ্ণায়নের একটি স্থায়ী পর্ব শুরু হয়ে গেছে। তার একটি হলো মূল সমস্যা বাড়ছে বই কমছেনা। অর্থাৎ মানুষসৃষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ, বিশেষ করে (ত কার্বন ডাই- অক্সাইড যা শুধু অব্যাহতই নেই, বরং পরিমাণে আরও বাড়ছে। আরেকটি কারণ, খানিকটা বিপরীতধর্মী, হলো বায়ুমণ্ডলে সালফেট কণার পরিমাণ কমে যাওয়া। সালফেট মানবস্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর, এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণের ফলে এর দুটি প্রধান উৎস, পণ্যবাহী জাহাজ ও চিনের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নির্গমন কমেছে। এই সালফেট কণাগুলি সূর্যের বিকিরণ প্রতিফলিত করে মহাকাশে ফিরিয়ে দিতে সাহায্য করে, ফলে পৃথিবী অতটা গরম হয় না। তাই বাতাস থেকে সালফেট দূর হওয়া স্বাস্থ্যগতভাবে লাভজনক হলেও, তা উষ্ণায়নকে আরও তীব্র করে তোলে।
এ নিয়েও বিতর্ক রয়েছে যে জলবায়ু ব্যবস্থায় হয়তো গ্রিনহাউস গ্যাসের উষ্ণায়ন ক্ষমতা নিয়ে আমরা যতটা ভাবিত, সমস্যাটি তার চেয়ে জটিল এবং সংবেদনশীল।সম্প্রতি ইংল্যান্ডের এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু গবেষক এবং ব্রিটেনের ইনস্টিটিউট অ্যান্ড ফ্যাকাল্টি অব অ্যাকচুয়ারিজের সদস্যরা যৌথভাবে একটি গবেষণা প্রকাশ করেছেন। সেখানে বলা হয়েছে, এই সংবেদনশীলতা প্রচলিত অনুমানের উচ্চ সীমার দিকেই ঝুঁকে আছে। যদি তা সত্যি হয়, তবে এই শতকের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যেতে পারে। জলবায়ু মডেলগুলি দেখাচ্ছে, ২ ডিগ্রির ওপরে গেলে উষ্ণায়নের প্রভাব অপরিবর্তনীয় ‘টিপিং পয়েন্ট’-এর ঝুঁকি সহ ১.৫ ডিগ্রির তুলনায় অনেক বেশি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। অথচ ১.৫ডিগ্রিই ছিল ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত রাষ্ট্রসংঘের প্যারিস চুক্তির লক্ষ্যসীমা।
গত বছরের চরম উত্তাপের পিছনেএকটি বড় ভূমিকা ছিল পৃথিবীর দুই মেরু অঞ্চলের অস্বাভাবিক উষ্ণতা। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ শুরু হওয়ার পর (সত্তরের দশকের শেষ দিক থেকে) উত্তর ও দক্ষিণ—উভয় মেরুতেই বরফের বিস্তার ছিল সর্বনিম্ন। একই সঙ্গে অ্যান্টার্কটিকা রেকর্ডে সবচেয়ে উষ্ণ বছর পার করেছে। ইউরোপে জুলাইয়ের শেষ এবং আগস্টের শুরুতে গরম ও ঝোড়ো আবহাওয়ার ফলে স্পেন ও পর্তুগালে ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়ে। এসব আগুন থেকে প্রায় ১ কোটি ৪০ লক্ষ টন কার্বন বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়েছে, কার্বন ডাই-অক্সাইড হিসেবে এবং কালো ধোঁয়ার কণা হিসেবেও, যা সূর্যের বিকিরণ শোষণ করে উষ্ণায়ন বাড়ায়। আগের কোনো বছরেই এত বেশি নির্গমন রেকর্ড হয়নি।
এই উষ্ণায়নের ধারা যদি আগামী বছরগুলিতেও বজায় থাকে, তবে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক আগেই পেরিয়ে যাবে। গত ৩০ বছরের উষ্ণতার গতি সামনে বাড়িয়ে ধরলে মোটামুটি হিসেব দাঁড়ায় এই রকম।এই দশকের শেষ বছরেই সেই সীমা অতিক্রান্ত হতে পারে। গত বছর প্রকাশিত অন্যান্য হিসেবের সঙ্গেও এটি মিলে যায়। ইউরোপের কোপারনিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের পরিচালক কার্লো বুয়ন্তেম্পোর মতে, এখানে মানসিকতার বদল প্রয়োজন। তাঁর কথায়, “প্রশ্নটা আর এই নয় যে ১.৫ ডিগ্রির সীমা লঙ্ঘন হবে কি না; প্রশ্নটা হলো, আমরা সেই লঙ্ঘনকে কীভাবে সামলাব।”
লা নিনা সর্বশেষ যে বছরটি দেখা দিয়েছিল—২০২২—সে বছর বিশ্বের গড় তাপমাত্রা শিল্পবিপ্লব-পূর্ব স্তরের তুলনায় ১.১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল, বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার হিসেব অনুযায়ী। তার পরের বছর, অর্থাৎ গত বছর, এই ব্যবধান বেড়ে দাঁড়ায় ১.৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে—লা নিনার বছরে যা একটি উল্লেখযোগ্য ঊর্ধ্বগতি। সাম্প্রতিক তিন বছরে শিল্পবিপ্লব-পূর্ব স্তরের তুলনায় গড় উষ্ণতা ১.৪৮ থেকে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে, কোন ডেটাসেট বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে।
তবু ২০২৩ সালের পর থেকে যে ব্যতিক্রমী উষ্ণতা দেখা যাচ্ছে, তা নিয়ে অনেক জলবায়ু বিজ্ঞানী এখনই বড় সিদ্ধান্তে পৌঁছোতে চাইছেন না। কারণ তাঁদের স্মৃতিতে রয়েছে এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা। ২০০০-এর দশকের গোড়ার দিকে দীর্ঘ সময় ধরে তাপমাত্রা জলবায়ু মডেলগুলির পূর্বাভাসের তুলনায় কম ছিল—যার ফলে তৈরি হয়েছিল তথাকথিত ‘জলবায়ু স্থবিরতা’ বা climate hiatus। তখন জলবায়ু পরিবর্তন-সন্দেহবাদীরা ঢালাওভাবে দাবি করেছিলেন, বিশ্ব উষ্ণায়ন নাকি থেমে গেছে। বাস্তবে অবশ্য হয়েছিল ঠিক উল্টোটা—কয়েকটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র সাময়িকভাবে একসঙ্গে কাজ করে পৃথিবীকে কিছুটা ঠান্ডা করে দিয়েছিল, এই যা।
তবু এমন একাধিক প্রমাণ রয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে উষ্ণায়নের একটি দীর্ঘস্থায়ী ত্বরণ শুরু হয়ে গেছে। তার একটি হলো মূল সমস্যা—মানুষসৃষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ, বিশেষ করে (তবে কেবল নয়) কার্বন ডাই-অক্সাইড—শুধু অব্যাহতই নেই, বরং আকারে আরও বাড়ছে। আরেকটি কারণ, খানিকটা বিপরীতধর্মী, হলো বায়ুমণ্ডলে সালফেট কণার পরিমাণ কমে যাওয়া। সালফেট মানবস্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর; কঠোর নিয়ন্ত্রণের ফলে এর দুটি প্রধান উৎস—পণ্যবাহী জাহাজ এবং চিনের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র—থেকে নির্গমন কমেছে। কিন্তু এই সালফেট কণাগুলির আরেকটি ভূমিকা আছে: এগুলি সূর্যের বিকিরণ প্রতিফলিত করে মহাকাশে ফিরিয়ে দেয়, ফলে পৃথিবী অতটা গরম হয় না। তাই বাতাস থেকে সালফেট দূর হওয়া স্বাস্থ্যগতভাবে লাভজনক হলেও, তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে উষ্ণায়ন তীব্রতর হয়।
এ নিয়েও বিতর্ক রয়েছে যে জলবায়ু ব্যবস্থা হয়তো গ্রিনহাউস গ্যাসের উষ্ণায়নক্ষমতার প্রতি আমরা যতটা ধরে নিয়েছি, তার চেয়ে বেশি সংবেদনশীল। এই সপ্তাহে ইংল্যান্ডের এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু গবেষকরা এবং ব্রিটেনের ইনস্টিটিউট অ্যান্ড ফ্যাকাল্টি অব অ্যাকচুয়ারিজের সদস্যরা যৌথভাবে যে গবেষণা প্রকাশ করেছেন, তাতে বলা হয়েছে—এই সংবেদনশীলতা প্রচলিত অনুমানের উচ্চ সীমার দিকেই অবস্থান করছে। যদি তা সত্যি হয়, তবে এই শতকের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস
অতিক্রম করতে পারে। জলবায়ু মডেলগুলি দেখাচ্ছে, ২ ডিগ্রির ঊর্ধ্বে গেলে বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব—অপরিবর্তনীয় ‘টিপিং পয়েন্ট’-এর ঝুঁকি সহ—১.৫ ডিগ্রির তুলনায় অনেক বেশি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। অথচ ১.৫ ডিগ্রিই ছিল ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত রাষ্ট্রসংঘের প্যারিস চুক্তিতে নির্ধারিত লক্ষ্যসীমা, যার উদ্দেশ্য ছিল জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়াকে সমন্বিত করা। হয়তো আগামী বারো মাস কোনও অপ্রত্যাশিত ঘটনা এসে তুলনামূলক ঠান্ডা তাপমাত্রা উপহার দেবে। কিন্তু সে সম্ভাবনা ক্ষীণ। পূর্বাভাসকারীরা বলছেন, বছরের শেষের দিকে আবার এল নিনো ফিরে আসতে পারে। জলবায়ু গবেষকদের ধারণা, ২০২৬ সালও তাপমাত্রার রেকর্ড শীর্ষে জায়গা করে নেওয়ার আরও একটি বছর হওয়া প্রায় অবশ্যম্ভাবী।