Home সুমন নামা সভ্যতার কারিগর কে? আগ্রাসন না উদ্ভাবন

সভ্যতার কারিগর কে? আগ্রাসন না উদ্ভাবন

0 comments 34 views

বাংলাস্ফিয়ার: আমাদের দেশজ জমিদার মহাজনেদের মতো, আঠারো শতকের জ্যামাইকায় থমাস থিসলউডও বন্দুকের নলের জোরে শ্রমিক-কৃষকদের খাটুনির বিনিময়ে বিপুল ফুলে-ফেঁপে উঠেছিলেন। তবে সেদেশের অধিকাংশ মহাজন বা দাসমালিকদের তুলনায় তাঁর একটি বিশেষ অভ্যাস ছিল। নিজের নিষ্ঠুরতার বিস্তারিত বর্ণনা, তিনি নিয়মিত লিখে রাখতেন। প্রকাশের উদ্দেশে নয়, বরং ব্যক্তিগত ডায়েরির ঢঙেই তাঁর লেখা, দাসপ্রথার দৈনন্দিন বিভীষিকার অন্যতম দলিল হয়ে আছে। নির্বিকার ভাষায় থিসলউড লিখেছেন, কীভাবে তিনি তাদের বেত্রাঘাত করতেন এবং ক্ষতস্থানে লঙ্কার গুঁড়ো মাখাতেন; কীভাবে তিনি শতাধিক নারীকে ধর্ষণ করেছিলেন! কীভাবেই বা এক পলাতক দাসকে শিকলে বেঁধে, শরীরে গুড় মাখিয়ে, সারাদিন উলঙ্গ অবস্থায় মৌমাছির সামনে ফেলে রাখা হয়েছিল।

এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ ক্লিফটন ক্রেইস, থিসলউডের এই বিভৎস কাহিনি আর এমন অসংখ্য ঘটনার কথা বিচার করে, এক চমকপ্রদ যুক্তি দাঁড় করান। তাঁর মতে, থিসলউডের মতো নিষ্ঠুরতা আধুনিক বিশ্বের কাছে কেবল কলঙ্কমাত্র নয়। এই আধুনিকতাকে গড়ে তোলার জন্য, তা অপরিহার্য ছিল। ‘দ্য কিলিং এজ’ গ্রন্থে তিনি দাবি করেন, “বিশ্বব্যাপী সহিংসতা না থাকলে শিল্পবিপ্লব আদৌ ঘটত না।”

এই যুক্তি দুটি ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যা দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়-পড়ুয়া বামপন্থীদের মধ্যে জনপ্রিয়। প্রথমত, বিশ্বের অধিকাংশ দুর্দশার জন্য পাশ্চাত্যই দায়ী। ক্রেইসের ভাষায়, “হত্যাই বিশ্ব ইতিহাসে পশ্চিমের সবচেয়ে গভীর অবদান।” দ্বিতীয়ত, পুঁজিবাদ নিজেই এক মারাত্মক ব্যবস্থা। আমেরিকার ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্টস নামক সংগঠনের ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, “এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই সহিংসতার মূল কারণ”। যে দলে নিউইয়র্কের নতুন, জনপ্রিয় মেয়র জোহরান মামদানির মতো নেতারাও রয়েছেন।

বর্তমানের আলোকে অতীতকে ব্যাখ্যা করার প্রলোভন সব যুগেই প্রবল। শেক্সপিয়ার রাজা তৃতীয় রিচার্ডকে এক ঘৃণ্য খলনায়ক হিসেবে চিত্রিত করেছিলেন, কারণ কুঁজো রিচার্ডকে ক্ষমতাচ্যুত করা টিউডর রাজবংশকে অসন্তুষ্ট করার ঝুঁকি তিনি নিতে পারেননি। আবার ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা রোমান সাম্রাজ্যের গৌরবগাথা গেয়ে নিজেদের তথাকথিত “সভ্যতা-প্রদান” মিশনকে ? তা দিয়েছিলেন।

এবছর যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০ বছর পূর্তিতে ‘মাগা’ ঘরানার লোকেরা আত্মতৃপ্ত ইতিহাসচর্চায় মেতে উঠেছে। হোয়াইট হাউসের “টাস্কফোর্স ২৫০” নিঃসংকোচে আমেরিকার ইতিহাসকে “সবচেয়ে মহান রাজনৈতিক যাত্রা” মেনে উল্লাসের আহ্বান জানিয়েছে। এর বিপরীতে ‘দ্য ১৬১৯ প্রজেক্ট’ প্রতিবেদনে বর্ণবাদী অবচারকেই আমেরিকার ইতিহাসের কেন্দ্রীয় সত্য হিসেবে তুলে ধরে নিউ ইয়র্ক টাইমস। তাদের মতে, ভার্জিনিয়া প্রদেশে প্রথমবারের জন্য কালাশ্রমিক বোঝাই জাহাজ আগমনের দিনটিই আমেরিকার প্রকৃত জন্মদিন।

ক্রেইস আরও একধাপ এগিয়ে তাঁর যুক্তিকে বিশ্বব্যাপী প্রয়োগ করেন। সাতশোরও বেশি রক্তাক্ত পৃষ্ঠাজুড়ে তিনি দাবি করেন, “পুঁজিবাদের ‘বিগ ব্যাং’—যা পৃথিবীর ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মোড়—নিছক অর্থ উপার্জনের জন্য ব্যবহৃত বৈশ্বিক সহিংসতা থেকেই গড়ে উঠেছে।”

তাঁর যুক্তিতে, আঠারো শতকের শেষভাগে পশ্চিমে অস্ত্রপ্রযুক্তির দ্রুত উন্নতি ঘটে। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো বেসরকারি সংস্থাগুলি নতুন বন্দুক ব্যবহার করে বিদেশি ভূখণ্ড দখল ও লুণ্ঠন করে। আবার বহু অস্ত্র বিক্রি করা হয় স্থানীয় যুদ্ধবাজদের কাছে, যারা সেগুলি দিয়ে প্রতিবেশীদের ওপর হামলা চালাবে। এভাবেই বৈশ্বিক বাণিজ্য, কার্যত একরকম অস্ত্র প্রতিযোগিতার দ্বারা চালিত হতে থাকে। পৃথিবীর সর্বত্র মানুষকে হয় বন্দুক কিনতে হয়, নয়তো বন্দুকধারীদের হাতে সর্বস্বান্ত হতে হয়। তাই প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করতে তারা যা কিছু পারে বিক্রি করে—বোর্নিওর জঙ্গল থেকে মোম, কর্পূর ও পাখির বাসা। আফ্রিকা থেকে হাতির দাঁত আর লাখো মানুষ—দাস হিসেবে।

পরিসংখ্যানের পাহাড় তুলে ধরে ক্রেইস দেখান, অস্ত্রব্যবসা সত্যিই এক বিশাল শিল্প ছিল বটে। উনিশ শতকের ইংল্যান্ডে প্রতিবছর যে পরিমাণ ভারতীয় পটাশিয়াম নাইট্রেট আমদানি হতো, তা দিয়ে এক থেকে তিন বিলিয়ন মাস্কেট গুলি তৈরির মতো বারুদ বানানো সম্ভব—যা তখনকার বিশ্বের মোট জনসংখ্যার থেকেও বেশি। অস্ত্র বেচাকেনা, লুণ্ঠন ও দাসত্ব থেকে আসা বিপুল লাভের একাংশ বিনিয়োগ হয়েছিল কয়লানির্ভর কারখানা ও রেলপথে—যেগুলো শিল্পবিপ্লবের ভিত্তি গড়ে তোলে। তাঁর মতে, এইভাবে “ধ্বংসই আধুনিক পৃথিবীকে নির্মাণ করেছে” এবং একই সঙ্গে বুনে দিয়েছে আজকের অস্তিত্বসংকট—জলবায়ু পরিবর্তনের বীজ।

তবে তাঁর যুক্তিকে একেবারে নিখুঁত বলে মানা যায় না। আঠারো শতকের শেষের পর যে হঠাৎ বিশ্বজুড়ে আরও বেশি হিংস্রতা ছড়িয়েছিল, তার প্রমাণ স্পষ্ট নয়। থিসলউডের অত্যাচার যতই জঘন্য হোক, তা আগেকার যুগ বা অন্য অঞ্চলের দাসমালিকদের অত্যাচারের চেয়ে যে বহুডিগ্রি ভয়াবহ ছিল, এমন বলা যায় না। রোমানরা তো প্রকাশ্যেই ক্রুশবিদ্ধ করত। আবার উনিশ শতকের যুদ্ধবাজ ও সাম্রাজ্যবাদীরা যে আগের যুগের—কনস্টান্টিনোপল লুট করা ক্রুসেডার বা ইউরেশিয়াজুড়ে রক্তের ছাপ রেখে যাওয়া মঙ্গোলদের চেয়ে নিষ্ঠুরতায় এগিয়ে ছিলেন, তাও স্পষ্ট নয়।

দূর অতীতের তথ্য বিতর্কিত ও অসম্পূর্ণ হলেও, হার্ভার্ডের স্টিভেন পিঙ্কারের মতো গবেষকেরা দেখিয়েছেন যে, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সহিংসতা নাটকীয়ভাবে কমেছে। চতুর্দশ শতকের জার্মানি, ইতালি ও স্পেনে হত্যার হার ছিল আজকের তুলনায় যথাক্রমে প্রায় ৭০, ২০০ ও ৫০ গুণ বেশি। কিছু প্রাক-আধুনিক শিকারি-সংগ্রাহক সমাজে তো, জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত মানুষ হিংস্র মৃত্যুর শিকার হতো।

যিশুর জন্মের পর, প্রায় আঠারো শতক ধরে মাথাপিছু বৈশ্বিক আয় প্রায় স্থির ছিল। তারপর ১৮২০ সালের পর তা আচমকাই চৌদ্দ গুণ বেড়ে যায়। এই বিপুল সমৃদ্ধির কারণ সহিংসতা—এমন ধারণা মোটেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। বদল ঘটেছিল মানুষের নিষ্ঠুরতায় নয়, বরং নতুন ভাবনার বিস্ফোরণে। ১৭৮৪ সালে রবার্ট বার্নস “মানুষের মানুষের প্রতি নিষ্ঠুরতা” কথাটি ব্যবহার করেছিলেন, অথচ সেই দশকেই পাওয়ার লুম, প্যাডল স্টিমার, শস্যমাড়াই যন্ত্র ও দ্বিফোকাল চশমার মতো যুগান্তকারী উদ্ভাবনও হয়েছিল।

industrial revolution

industrial revolution

শিল্পবিপ্লবের প্রকৃত চালিকাশক্তি ছিল নতুন ধারণার উদ্ভাবন, বিস্তার ও প্রয়োগ—যার ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল আরও পুরোনো এক প্রযুক্তি, মুদ্রণযন্ত্র। বইয়ের দাম যখন একজন শ্রমিকের মাসের পর মাসের মজুরি থেকে কয়েক ঘণ্টার আয়ে নেমে আসে, তখন জ্ঞানচর্চা ও তার বিস্তৃতি গতি পাওয়াটাই স্বাভাবিক।

 

 

 

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles