Home খবরা খবর কানাডাও ট্রাম্পকে সম্ভাব‍্য শত্রু ভাবছে

কানাডাও ট্রাম্পকে সম্ভাব‍্য শত্রু ভাবছে

Canada wakes up to new American threat

by Titli Karmakar
0 comments 173 views

বাংলাস্ফিয়ার: কানাডা তার নাগরিকদের দেশরক্ষার জন্য নাম লেখাতে আহ্বান জানাচ্ছে—এটা নতুন কিছু নয়। কিন্তু এখন সেই আহ্বানের ধরনটাই বদলে যাচ্ছে। জেনি কারিগান, কানাডার শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা, এমন কানাডিয়ানদের খুঁজছেন—বয়স ১৬ হোক বা ৬৫—যাঁরা সামরিক আক্রমণ বা ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় দেশের পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত থাকবেন। “আমাদের ভারী যন্ত্রপাতির অপারেটর লাগবে,” বলেন জেনারেল কারিগান। “আমাদের ড্রোন অপারেটর লাগবে। প্রয়োজনে সাইবার অপারেটরও লাগতে পারে।” চাইলে তাঁকে ‘আন্টি জেনি’ বলেই ডাকা যেতে পারে।

কারাকাসে, ভেনেজুয়েলার রাজধানীতে, ৩ জানুয়ারি রাতে ডোনাল্ড ট্রাম্প যে নাটকীয় অভিযানে নিকোলাস মাদুরোকে তাঁর নিরাপদ আশ্রয় থেকে তুলে আনলেন, তার সঙ্গে কারিগানের ৪ লক্ষ সদস্যের এক অসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনী গঠনের পরিকল্পনার সরাসরি কোনও যোগ নেই।কিন্তু সময়টা যে মোটেই কাকতালীয় নয় সেটাও স্পষ্ট। গত এক বছরে ট্রাম্প বারবার বলেছেন, কানাডার পক্ষে নাকি আমেরিকার ৫১তম অঙ্গরাজ্য হয়ে যাওয়াই শ্রেয়। অবশ্য দায়িত্বশীল কোনও মহলই বিশ্বাস করে না আমেরিকা কখনও কানাডা আক্রমণ করবে। এমনকি ট্রাম্প নিজেও সেকথা পরোক্ষে স্বীকার করছেন।যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল সামরিক শক্তি ব্যবহার করে কানাডাকে অন্তর্ভুক্ত করবেন কি না, তাঁর উত্তর ছিল “না”, অথবা বড়জোর ‘ভেরি আনলাইকলি’।

তবু সবাই একমত কানাডার সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক ট্রাম্প জমানায় নাটকীয়ভাবে বদলে গিয়েছে। কারণ ট্রাম্পের লাগাতার বাগাড়ম্বর আর শুল্ক নীতি।কানাডার সামনে আর কোনও বিকল্প ছিল না।তাকে এমন একটি দেশে পরিণত হতেই হয়েছে যে দেশ নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে এমন অর্বাচীন হুমকি মোকাবিলা করতে পারে,তার খামখেয়ালি বৃহৎ প্রতিবেশী পাশে থাকুক বা না থাকুক। সাধারণত কানাডার দুশ্চিন্তা থাকে রাশিয়া ও চিনকে নিয়ে, তাদের চোরাগোপ্তা কারবার, সম্ভাব্য সাইবার আক্রমণ এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোর ওপর হামলা। কিন্তু আমেরিকার কারাকাস অভিযান, তার পর প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি, এমন এক বাস্তবতা সামনে এনে দিয়েছে যা অগ্রাহ‍্য করা অসম্ভব।১৮১২ সালের পর থেকে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক থাকা দুই দেশের মধ্যে সামরিক সংঘর্ষ হতে পারে এমন সম্ভাবনা আর সম্পূর্ণ অকল্পনীয় নয়। ১৮১২ সালে যুদ্ধের পরেই তো কানাডা স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল।

ট্রাম্প যখন বলেছিলেন তিনি “অর্থনৈতিক শক্তি” ব্যবহার করে কানাডিয়ানদের যোগ দিতে বাধ্য করতে পারেন, ঠিক সেই সময় থেকেই একটি অসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনীগড়ে তোলার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।কানাডার প্রধানমন্ত্রীর প্রাক্তন চিফ অব স্টাফ এবং সেদেশের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্কো মেন্ডিসিনো বলেছেন, “এই প্রেক্ষাপটে সরকারের দায়িত্ব হল সব ধরনের সম্ভাব্য পরিস্থিতি ও বিকল্প খতিয়ে দেখা, যার মধ্যে রয়েছে স্বেচ্ছাসেবী এক অসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনী যা প্রয়োজনে কানাডার সশস্ত্র বাহিনীকে সহায়তা করতে পারে।”

কানাডার প্রতিরক্ষা দফতর ( সংক্ষেপে ডিএনডি) ইতিমধ্যেই সম্ভাব‍্য সব পরিস্থিতির নানা রকম ‘ওয়ার গেম’ চালিয়েছে। আমেরিকা থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ কানাডায় ঢোকার চেষ্টা করতে পারে, এমন পরিস্থিতি মোকাবিলার পরিকল্পনা এখন নিয়মিত হচ্ছে। ট্রাম্প যেভাবে ডেমোক্র্যাট শাসিত রাজ্যে সেনা পাঠাচ্ছেন এবং নিজের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগকে ব্যবহার করছেন, বস্তুত কানাডাকে বাধ্য করেছে প্রতিবেশী দেশে অন্তর্দ্বন্দ বা অস্থিরতা দেখা দিলে তার জন্যও প্রস্তুত থাকতে।

সামরিক পরিকল্পনাকারীরা এমন পরিস্থিতিও এঁকেছেন যেখানে রাশিয়া বা চিনের মতো কোনও প্রতিপক্ষ কানাডার পরিকাঠামোতে আঘাত হানতে পারে, বিদ্যুৎ ও জলের উৎস বন্ধ করে দিতে পারে যাতে আমেরিকার সামরিক প্রতিক্রিয়াকে আটকে রাখা যায় আর সেই ফাঁকে তারা বাল্টিক দেশগুলি বা তাইওয়ানে হামলা চালায়। জেনারেল কারিগান বলেন, কানাডা প্রতিনিয়ত সাইবার আক্রমণ ঠেকিয়ে চলেছে। “আমরা সব সময় সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিই,” বলেন তিনি আশ্বস্ত করার সুরে।

তবে সব কিছু নিয়ে কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে কথা বলতে আগ্রহী নন। একদিকে সম্ভাব্য শত্রুকে কানাডার প্রস্তুতি বা দুর্বলতার ইঙ্গিত দিতে তাঁরা চান না। অন্যদিকে, ট্রাম্পকে উসকে দেওয়ার আশঙ্কাও তাঁদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে। খুব কম মানুষই প্রকাশ্যে সাক্ষাৎকার দিতে রাজি, কিন্তু বাস্তবতা হল যে ‘সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি’র কথা এত দিন অকল্পনীয় মনে হত, তাতে এখন তাতে আমেরিকাও প্রবেশ করে গিয়েছে।

জেনারেল কারিগানের মতে, অসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনী গঠনের এই পরিকল্পনা ওয়াশিংটনের পছন্দ হওয়ার কথা। কারণ এতে প্রকারান্তরে ট্রাম্পের সেই দাবিই পূরণ হয় যেআমেরিকার মিত্রদের নিজেদের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব নিজেদেরই বেশি করে নিতে হবে আর আক্রমণ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় তাদের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। গত নভেম্বরে তিনি একটি দল পাঠিয়েছিলেন ফিনল্যান্ডে, যেখানে রাশিয়ার দীর্ঘদিনের হুমকির মুখে গড়ে ওঠা শক্তিশালী অসামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখা হয়।

ফিনল্যান্ডের ‘কমপ্রিহেনসিভ সিকিউরিটি কনসেপ্ট’ অনুসারে নাগরিকদের বলা হযেছে অন্তত ৭২ ঘণ্টার জন্য খাদ্য, জল ও চিকিৎসা সরঞ্জাম মজুত রাখতে। চিকিৎসা, উদ্ধারকাজ ও অগ্নিনির্বাপণে প্রশিক্ষিত নাগরিকদের তালিকা তৈরি হয়েছে, যাঁরা প্রয়োজনে আপৎকালীন দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা মানুষজনকে নির্ধারিত বম্ব শেল্টারে নিয়ে যাবেন।। এই আশ্রয়কেন্দ্রগুলি ফিনল্যান্ডের ৮৫ শতাংশ মানুষকে ধরে রাখতে সক্ষম। এই বাঙ্কারগুলির নির্মান পরিকল্পনাও অত্যাশ্চর্য যেখানে আশ্রয়প্রার্থীদের অবরুদ্ধ অবস্থাকে সহনীয় করে তোলার যাবতীয় ব‍্যবস্থা করা আছে। আছে ভূগর্ভস্থ খেলার জায়গা আর অবশ্যই সনা বাথ।

কানাডিয়ান প্রতিনিধিরা মুগ্ধ হয়েছিলেন। “ওদের সর্বত্র বাঙ্কার আছে, আর সেগুলোকে স্বাভাবিক ব্যবহারযোগ্য জায়গা বানিয়ে রেখেছে। কোনও কোনওটায় আবার সুইমিং পুলও আছে,” বলেন এক কর্মকর্তা। তবে এটাও স্পষ্ট হয়েছিল—কানাডা ফিনল্যান্ডের চেয়ে প্রায় ৩০ গুণ বড় দেশ, আর তার বিশাল, জনবিরল অঞ্চলগুলোতে আমেরিকার সাহায্য ছাড়া সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব।

প্রধানমন্ত্রী কার্নি সেই বাস্তবতা বদলাতে চান। তিনি আগামী পাঁচ বছরে ৮২ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার (প্রায় ৫৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) প্রতিরক্ষায় খরচ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যাতে ২০৩৫ সালের মধ্যে কানাডা জিডিপির ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষায় ব্যয় করার পথে এগোতে পারে। এই অর্থের বড় অংশই খরচ হবে কানাডার উত্তরে। রুশ সাবমেরিন আর চিনা ‘গবেষণা’ জাহাজ ক্রমেই কানাডার আর্কটিক জলসীমায় ঢুকে পড়ছে। “উত্তর দিক থেকে একটা হুমকি আসছে। আমরা এমন পরিস্থিতিতে অন‍্যের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে পারিনা।”

কানাডার সশস্ত্র বাহিনীতে বর্তমানে ৬৭ হাজার পূর্ণকালীন সেনা ও ২৭ হাজার রিজার্ভ সদস্য রয়েছেন, সবাই স্বেচ্ছায় যোগ দিয়েছেন। পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশকে রক্ষা করার পাশাপাশি তাঁরা নানা দূরবর্তী মিশনে অতিমাত্রায় ব্যস্ত। লাটভিয়ায় তাঁরা বাল্টিক রাষ্ট্রগুলির প্রতিরক্ষা জোরদার করছেন, আর নৌবাহিনীর একটি মিশন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য তাইওয়ান প্রণালি খোলা রাখতে কাজ করছে।

এই বাহিনী ছড়িয়ে রয়েছে কানাডার প্রায় এক কোটি বর্গকিলোমিটার জুড়ে। জলবায়ু পরিবর্তন হয়তো দেশের অগ্রাধিকারের তালিকায় কিছুটা নীচে নেমেছে কিন্তু ক্রমবর্ধমান বিপজ্জনক আবহাওয়ার ক্ষতি-খয়রাতি থামেনি। বন্যা কিংবা অরণ‍্যে হঠাৎ হঠাৎ দাবানলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের সাহায্য করতে নিয়মিত সেনা নামাতে হয়। ২০২০ সালে অন্টারিও ও কুইবেক প্রদেশে চরম জনবলসংকটগ্রস্ত বৃদ্ধাশ্রমে যখন কোভিড-১৯ তাণ্ডব চালায়, তখন সেখানেও সেনাবাহিনী পাঠানো হয়েছিল। নতুন অসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনী এই ধরনের জরুরি পরিস্থিতিতে সাহায্য করতে পারবে ।ফলে সেনাবাহিনী মূলত দেশের প্রতিরক্ষায় মন দিতে পারবে।

এতে কানাডিয়ানদের দীর্ঘদিনের আত্মতৃপ্তি থেকেও জাগিয়ে তোলার একটা রাস্তা পাওয়া যেতে পারে।আত্মতৃপ্তি শুরু হয়েছিল তিন দশকেরও বেশি আগে, যখন প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ২ শতাংশের নিচে নেমে গিয়েছিল। এর অর্থ ছিল, কানাডা তার ভূখণ্ড রক্ষার ক্ষেত্রে অনেকটাই আমেরিকার ওপর নির্ভরশীল। তাতে তখন কারও বিশেষ আপত্তি ছিল না। অটোয়ার কার্লটন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ ফিলিপ লাগাসে বলেন, আজ কানাডা এমন হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে আছে যা সে আগে কখনও দেখেনি। তাঁর কথায়, এই নতুন বাস্তবতা “কানাডিয়ান মানসের পক্ষে হজম করা কঠিন”।

তবে কানাডিয়ানরা ধীরে ধীরে জেগে উঠছেন। প্রায় নিশ্চিতভাবেই এর কারণ ট্রাম্পের গোলার্ধব্যাপী উচ্চাকাঙ্ক্ষা যা এখন শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমেও দেখানো হচ্ছে। জেনারেল কারিগান বলেন, জনসমক্ষে বক্তৃতার পর তাঁকে প্রায়ই ঘিরে ধরেন এমন কানাডিয়ানরা, যাঁরা দেশের জন্য কিছু করতে প্রস্তুত। বড়দিনের আগে এক প্রবীণ নাগরিক তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন তাঁকে কাজে লাগাতে তাঁর বয়স হয়েছে একথা ভুলে গিয়ে। তিনি বলেছিলেন, ‘দেখুন, আমি রাইফেল কাঁধে নিয়ে যুদ্ধে যেতে পারব না। কিন্তু আমি ইন্টারনেট ঘেঁটে নজর রাখছি। আমি সাহায্য করতে পারি। আপনি শুধু বলুন, কীভাবে’।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles