বাংলাস্ফিয়ার: এই মুহূর্ত্তে ইরানে যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, তাকে বিক্ষোভ না বলে, জনবিস্ফোরণই বলা উচিত। অনেকে মনে করছেন, ২০০৯ সালের আন্দোলনের চেয়েও এর প্রভাব সুবিস্তৃত। এমনকি অভিজ্ঞ মহলের মতে, ১৯৭৯ সালে শাহের পতনের পরে ইরান আর কখনও এমন গণরোষ দেখেনি। গত ২৮শে ডিসেম্বর ছোট ছোট মিছিল দিয়ে যে প্রতিবাদের শুরু হয়, মাত্র বারো দিনের মাথায় তা বিশাল এক জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। গ্রাম ও ছোটো শহর ছাড়িয়ে, সেই বিক্ষোভ এখন তেহরানের মতো বড় শহরেও ছড়িয়ে পড়েছে। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে, সেদেশের ৩১টি প্রদেশই বিক্ষোভে উত্তাল। কিছু পরিবর্তন সত্যিই অবাক করে দেয়। এতদিন রাজনীতির মূলস্রোত থেকে দূরে থাকা মধ্যবিত্ত, এমনকি মহিলারাও এখন বেকার তরুণদের সঙ্গে রাজপথে হাঁটছেন। স্লোগানে গলা মেলাচ্ছেন।
তেহরানের রাজপথে এখন একটাই স্লোগান- “স্বৈরাচারের মৃত্যু চাই”। সরাসরি দেশের সর্বাধিনায়ক, ৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেইকে লক্ষ্য করেই এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভকারীরা মসজিদ, মাদ্রাসা, ব্যাঙ্ক এবং পুলিশ স্টেশনে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। উপরন্তু, কট্টরপন্থীদের শক্ত ঘাঁটি ও ইরানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মাশাহাদেও আন্দোলনকারীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোশ্যাল মিডিয়ায় বলেই দিয়েছেন, সাধারণ মানুষ দেশটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে। ইরানের সরকারি এক কর্মচারীর মতে, আজ তার দেশ ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।
তবে এত কিছুর পরেও, খামেনেই পিছু হটতে চাইছেন না। ৯ই জানুয়ারির এক বক্তৃতায় তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, তিনি বিক্ষোভকারী এবং দাঙ্গাবাজদের মধ্যে কোনও পার্থক্য করেন না। তাঁর চোখে সবাই ট্রাম্পের তল্পিবাহক। ইরানবাসীর এই বিক্ষোভের উত্তরে, ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। সহজেই আন্দাজ করা যায়, আসন্ন ভবিষ্যতে ইরানে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের মাত্রা ঠিক কোন ডিগ্রিতে পৌঁছতে পারে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সমীক্ষায় জানা যাচ্ছে, এরই মধ্যে মৃতের সংখ্যা ৪০। গ্রেপ্তারের সংখ্যাও ২০০০ ছাড়িয়ে গেছে। কট্টরপন্থীদের মতে, কেবল রক্তপাতই এই পরিস্থিতি শিথিল করতে ও দেশবাসীর মনে ভীতি তৈরি করতে পারে। আন্দোলনকারীদের সরাসরি জঙ্গি হিসেবেও চিহ্নিত করে দিয়েছেন তারা।
খামেনেই বিশ্বাস করেন, শাসনের লাগাম আলগা করাতেই শাহের পতন হয়েছিল। এর আগেও অনেক বড়ো বড়ো আন্দোলন দেখেছে ইরান। অনেকেই সেগুলিকে আগেভাগে ‘সরকারের শেষ নিঃশাস’ বলে ভেবে নিয়েছিলেন। তবে আজ খামেনেইর জন্য আগামীর পথ খুব একটা সুবিধার মনে হচ্ছে না। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নিশ্চিতভাবে তাঁকে বিপুল পাশবিক শক্তি প্রয়োগ করতে হবে। দেশবাসী তাঁর ক্ষমতার ওপর ভরসা হারিয়েছে। এই সরকার তাদের জীবনযাত্রার সঙ্কট দূর করতে পারবে বলে আর বিশ্বাস করতে পারছেন না তারা।
খোদ ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও এবিষয়ে একমত। বিদ্যুৎ আর জলের সংকটের পাশাপাশি এবার মাথাচাড়া দিয়েছে খাদ্যের অভাব। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য বড়ো শহর ছাড়িয়ে গ্রামে পৌঁছচ্ছে না। স্থানীয় মুদ্রা, রিয়ালের মূল্য এতটাই দ্রুত কমছে যে, দোকানদাররা লোকসানে কেনাবেচা করার চেয়ে পণ্য মজুত করে রাখাকেই এই পরিস্থিতিতে শ্রেয় মনে করছেন। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রারম্ভিক কয়েক দশকে যে মধ্যবিত্ত শ্রেণি বৃদ্ধি পেয়েছিল, তারা এখন একেবারে নিঃস্ব। গত ১৫ বছরে সেদেশের দেড় কোটি মানুষ মধ্যবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত শ্রমিক স্তরে নেমে এসেছে। মানুষের বেতন থেকে জমানো পুঁজিতেও মুদ্রাস্ফীতির ভয়ানক প্রভাব পড়ছে। বর্তমানে ইরানের জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ চরম দারিদ্র্যের শিকার। বুলেট ছুঁড়ে যে পেটের ক্ষুধা মেটানো যায় না, ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি সেকথাই প্রমাণ করছে।
আন্তর্জাতিক স্তরেও এখন ইরান সরকারের দাপট ক্রমশ ক্ষীণতর হচ্ছে। ইরানিদের কাছে এই শাসনের শেষ সময় ঘনিয়ে এসেছে। গত দু’বছরে ইজরাইলি হামলায় ইসলামী মৌলবাদী আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোও বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। গত গ্রীষ্মে মাত্র ১২ দিনের বিমান হামলায় ইরানের সামরিক বাহিনীর অধিকর্তাদের হত্যা করেছে ইজরায়েল। অবস্থা এতটাই শোচনীয় যে, খামেইনি নিজেই এখন প্রাণভয়ে গা-ঢাকা দিয়েছেন।
অন্যদিকে আবার সর্বোচ্চ নিষেধাজ্ঞার পথে হাঁটছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। যার জেরে ইরানের তেল রপ্তানিও প্রায় বন্ধ। বিদেশের পাওনা টাকাও দেশে ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়েছে। ট্রাম্প সরাসরি খামেইনিকে হুমকি দিয়ে বলেছেন, আন্দোলনকারীদের ওপর কোনও দমনমূলক পথ নিলে, তিনি তাঁকে “জাহান্নামের শাস্তি” ভোগ করাবেন। সরকারের অনুগত সংবাদমাধ্যমগুলোর মতে, আমেরিকা তাদের ‘১০১তম এয়ারবোর্ন ডিভিশন’ সেনাদলকে ইরান সীমান্তের কাছে, ইরাকি কুর্দিস্তানে মোতায়েন করেছে। যদিও এই তথ্য প্রমাণিত নয়। ২০০৩ সালে প্রতিবেশী ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের জমানার পতনেও এই সেনাদল মূল ভূমিকা নিয়েছিল।
২০০৯ সালের পর আবারও দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ ইরানি একজন একক বিরোধী নেতার নেতৃত্বে একজোট হয়েছে। শেষ শাহের ৬৫ বছরের পুত্র রেজা পাহলভি, ৬ জানুয়ারি তাঁর ওয়াশিংটনের বাড়ি থেকে গণআন্দোলনের ডাক দেন। তারপরেই রাজপথে মানুষের ঢল নামে। প্রচুর ইরানি এখনো তাঁকে রাজপুত্র হিসেবেই শ্রদ্ধা করেন। আবার অনেকে নিরুপায় হয়ে তাঁর শরণাপন্ন। তেহরানের এক শিক্ষক, যিনি জনসমক্ষে এক দেওয়ালে খামেনেই-বিরোধী স্লোগান লিখেছেন, তাঁর বক্তব্য, “আমরা সকলেই জানি তিনি একজন ভাঁড়, তবে তাঁর মতো জনপ্রিয়তা দেশের আর কোনো বিরোধী নেতার নেই।” অবশ্য কুর্দি বা আজেরি এলাকাগুলোতে সবাই তাঁকে মেনে নেয়নি, সেখানে অনেকেই স্লোগানে তুলেছে: “স্বৈরতন্ত্রকে রুখে দিন, সে খামেইনি হোক বা শাহ।” ট্রাম্প নিজেও এব্যাপারে বেশ সতর্ক। তিনি পাহলভিকে প্রকাশ্যে “ভালো মানুষ” বললেও, তাঁর সাথে দেখা করা নিয়ে এখনো দ্বিধাগ্রস্ত।
এখনো পর্যন্ত প্রশাসনের ভিতরে কোনও ষড়যন্ত্রের খবর পাওয়া যায়নি। সরকার-ঘনিষ্ঠ এক ব্যবসায়ী ইঙ্গিত করেছেন, যাঁরা আগে সংস্কারের কথা বলতেন, তাঁরা সকলেই এখন মৃত্যুভয়ে ভীত। তবুও প্রশাসনের লোকেদের অভ্যন্তরীণ কয়েকটি গোপন অনলাইন প্লাটফর্মে নানা গুজব শোনা যাচ্ছে। ইন্টারনেটের ভাইরাল ভিডিও দেখাচ্ছে, কয়েকটি শহরে সাধারণ মানুষের আন্দোলনের চাপে পুলিশও ভয় পেয়ে পালাচ্ছে। দেশবাসীর প্রশ্ন, আর কতদিন দেশের নিরাপত্তা বাহিনী রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার কথা না ভেবে খামেইনির দাসানুদাস হয়ে থাকবে। একটানা ৩৬ বছর ক্ষমতায় থাকার পর, তাঁকেও এখন ক্লান্ত এবং পরিকল্পনাহীন লাগছে। বিক্ষোভ শুরু হওয়ার ঠিক আগে আন্দোলনকারীদের কেউ কেউ একজন ‘বোনাপার্ট’ বা শক্তিশালী সামরিক নেতার দাবি তুলেছিলেন। ‘ইসলামিক রেভেলিউশনারি গার্ড কোর-এর (IRGC) এর কোনো এক ক্ষমতাধর সদস্য দেশের দায়িত্ব নিক।
এদিকে খামেইনি নিজে ক্ষমতা থেকে সরে আসার কোনো আগ্রহই দেখাচ্ছেন না। সিরিয়ার প্রাক্তন স্বৈরশাসক বাশার আল-আসাদ যেমন রাশিয়ায় পালিয়ে গিয়েছিলেন, খামেনেইর তেমন কোনও পরিকল্পনা আছে বলেও মনে হচ্ছে না। যদিও ‘দ্য টাইমস’-এর একটি গোপন প্রতিবেদনে, এক মার্কিন গোয়েন্দার রিপোর্টে এর উল্টো সম্ভাবনার কথাই শোনা যাচ্ছে। খামেনেইর এক পরিজন বলেন, “খামেইনি ইরানের বিপ্লবী প্রজন্মের সন্তান। তাদের কাছে লড়াই করে শহীদ হওয়াই গৌরবের। তিনি পদত্যাগ করার চেয়ে, লড়াই করে প্রাণ দেওয়াকেই বেছে নেবেন।” এখন প্রশ্ন একটাই, ইরানের ভবিষ্যতের দায়িত্ব তাহলে কার উপর এসে পড়বে? শাসক না সাধারণ মানুষ? শেষ পর্যন্ত কে বা কারা এই যুদ্ধে জেদের সাথে টিকে থাকে, সেটাই এখন দেখার।