Home খবরা খবর কয়লা চুরি যেন রহস‍্য উপন‍্যাস

কয়লা চুরি যেন রহস‍্য উপন‍্যাস

Coal Scam Reads Like A Mystery Novel

0 comments 143 views

বাংলাস্ফিয়ার: রাত নামলে আসানসোল–রানিগঞ্জের মাটি আলাদা চেহারা নেয়। দিনের আলোয় যা নিস্তেজ, বন্ধ, পরিত্যক্ত বলে মনে হয়, রাতের অন্ধকারে সেখানেই জেগে ওঠে গোপন জীবনের স্পন্দন। পাহাড়ি ঢিবির গায়ে পুরনো শ্যাফটের মুখ, ঝোপে ঢাকা খনির গর্ত, মরচে ধরা রেললাইনের পাশে অচেনা ট্রাক—সবকিছু যেন অপেক্ষা করে থাকে সূর্য ডোবার জন্য। এই রাতই বাংলার কয়লা কেলেঙ্কারির প্রকৃত সময়।

এই গল্পের শুরু কোনও থানায় লেখা এফআইআর দিয়ে নয়। শুরু মাটির নিচে। যেখানে রাষ্ট্র একসময় বলেছিল—“এখানে খনি বন্ধ।” কাগজে কলমে খনির মৃত্যু হয়েছিল, কিন্তু মাটির নিচে কয়লা বেঁচে ছিল। সেই কয়লায় লেখা নেই রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা, কেন্দ্র–রাজ্য টানাপোড়েন বা নির্বাচনের খরচ কী। তবু কয়লা জানে তাকে তুলতে হলে হাত চাই, ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা চাই আর মাথার ওপরে উপরে এমন এক ছাতা চাই যার নীচে আইন অন্ধ।

প্রথমে আসে স্থানীয় ছেলেগুলো। দিনমজুর, বেকার, সাবেক খনি শ্রমিক। কেউ জানে কোন শ্যাফটের নিচে এখনও সিম আছে, কেউ জানে কোন গর্তে নামলে ধস নামবে না। রাতে তারা নামে। হাতে ড্রিল, বালতি, কখনও শুধু হাতুড়ি। মাথার ওপর কয়েক ইঞ্চি মাটি, নিচে অন্ধকার। কয়লা ওঠে। ঘামে ভেজা শরীর, কালো মুখ, চোখে আগুন। এই কয়লা তাদের কাছে জীবনের ঝুঁকির দাম। কিন্তু তারা জানে, তারা শুধু প্রথম ধাপ।

ভোর হওয়ার আগেই আসে ট্রাক। নম্বর প্লেট অনেক সময় কাদা মাখানো, অনেক সময় অন্য জেলার। কয়লা ওঠে ট্রাকে। এখানেই গল্পে ঢোকে মধ্যস্বত্বভোগী, যারা জানে কোন পথে গেলে পুলিশ থাকবে না, কোন রাতে চেকিং হয় না, কোন সাইডিংয়ে চোখ বন্ধ থাকে। এই মধ্যস্বত্বভোগীদের মাথার ওপরে থাকে আসল ছাতা—একটি নাম, একটি ডাকনাম, একটি ভয়। এলাকায় সবাই তাকে চেনে, কিন্তু কেউ উচ্চারণ করে না পুরো নাম। ডাকনামই যথেষ্ট।

এই মানুষটি কোনও অফিসে বসে ফাইল সই করে না। সে বসে থাকে নেটওয়ার্কের কেন্দ্রে। কার কয়লা উঠবে, কার উঠবে না—সেই সিদ্ধান্ত তার। কার ট্রাক ধরা পড়লে ফোন যাবে কোথায়—সেটাও সে জানে। সে জানে কোন অফিসার বদলি হতে চলেছে, কোনটা নিরাপদ সময়। এই ক্ষমতা হঠাৎ আসে না। বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠে। ছোটখাটো ‘ম্যানেজমেন্ট’ থেকে শুরু করে বড় অঙ্কের লেনদেন—সব মিলিয়ে এক অলিখিত শাসন।

 

কিন্তু কয়লা শুধু তুললেই হয় না। বিক্রি করতে হয়। সেখানেই আসে বৈধতার খেলা। কাগজ। পারমিট। রসিদ। কখনও আসল, কখনও নকল, কখনও পুরনো। রেল সাইডিং এখানে হয়ে ওঠে নাটকের মঞ্চ। রেললাইনে একবার উঠলে কয়লার অতীত ঝাপসা হয়ে যায়। কোন খনি থেকে এল, বৈধ না অবৈধ—সব মিশে যায় ওজনের অঙ্কে। এখানে যাদের চোখ বন্ধ থাকে, তাদের চোখ বন্ধ রাখারও একটা দাম আছে। এই দাম নগদে যায় না সবসময়। কখনও যায় আশ্বাসে, কখনও বদলিতে, কখনও ভবিষ্যতের নিরাপত্তায়।

কয়লা পৌঁছয় কারখানায়। আগুন জ্বলে চুল্লিতে। লোহা গলে। উৎপাদন হয়। সস্তা কয়লা মানে লাভ বেশি। কেউ প্রশ্ন করে না বেশি। প্রশ্ন করলে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। শিল্পের ভাষায় এটাকে বলে ‘সাপ্লাই চেইন স্টেবিলিটি’। বাস্তবে এটা নীরব সমঝোতা।

এখানেই গল্প মোড় নেয়। কারণ কয়লা পুড়লে ধোঁয়া ওঠে, কিন্তু টাকা পুড়লে নয়। টাকা জমে। নগদ। কালো। এই নগদ টাকা কোথায় যাবে? ব্যাঙ্কে ঢুকলেই বিপদ। তাই টাকা প্রথমে যায় এমন হাতে, যারা কোনও ব্যাঙ্কের দরজায় দাঁড়ায় না। শহরের বাইরে বাড়ি, অন্য রাজ্যে অথবা দেশে নতুন ফ্ল্যাট, কখনও বিদেশেও সম্পত্তি-ক্রয়, টাকা ঘুরতে থাকে, তার রং, রূপ, রস সব পথের মাঝে বদলে যায়। কখনও জমি কেনা হয়, কখনও শেল কোম্পানি, কখনও আবার ব্যবসার বিনিয়োগ। টাকার উৎস ধুয়ে যায়, কিন্তু গন্ধ থেকে যায়।

এই গন্ধই একদিন পৌঁছয় দিল্লিতে। কোনও ফাইলে, কোনও রিপোর্টে, কোনও ইনপুটে। তদন্ত শুরু হয়। প্রথমে নাম আসে নিচুতলার। ট্রাকচালক, হিসাবরক্ষক, হাওয়ালা এজেন্ট। তারপর ধীরে ধীরে ওপরে ওঠে । নামগুলো ক্রমশ বড় হতে থাকে, এমন সব নাম ভেসে ওঠে যা পিলে চমকে দেওয়ার মতো। মিডিয়া ঢুকে পড়ে। ক্যামেরা। শিরোনাম। তখনই কেলেঙ্কারি জন্ম নেয়।

তদন্তের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় রাজনীতির ভাষা। কেউ বলে,এটা প্রতিহিংসা। কেউ বলে, এটা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় লুট। সত্যি আর মিথ্যার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে ফাইল, হিসাব, জবানবন্দি। সাধারণ মানুষের চোখে তখন কয়লা আর কয়লা থাকে না। হয়ে ওঠে ক্ষমতার প্রতীক।

একসময় তদন্ত পৌঁছয় এমন জায়গায়, যেখানে রাজনীতি আর অপরাধের সীমারেখা মিলিয়ে যায়। প্রশ্ন ওঠে, এই নেটওয়ার্ক কি শুধু স্থানীয়? নাকি তার ছায়া লম্বা? নির্বাচনের সময় এত টাকা আসে কোথা থেকে? পোস্টার, মিটিং, ক্যাম্পেন—সবকিছুরই দাম আছে। কেউ মুখে বলে না, কিন্তু সবাই জানে—রাজনীতি বিনামূল্যের নয়।

এখানেই গল্পের নাটকীয় পর্ব। অভিযান। ভোরবেলা দরজায় কড়া নাড়া। ফাইল, পেনড্রাইভ, মোবাইল। বাইরে ভিড়। স্লোগান। একজন নেতা এসে দাঁড়ান, বলেন,এটা অন্যায়। তদন্তকারীরা বলেন—আইন নিজের পথে চলবে। এই সংঘাত আর শুধু ব্যক্তির নয়, ব্যবস্থার।

কিন্তু এই উপন্যাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র কোনও নেতা, কোনও তদন্তকারী, এমনকি কোনও কুখ্যাত সিন্ডিকেট–প্রধানও নয়। আসল চরিত্র হলো কাঠামো। সেই কাঠামো, যেখানে একটি খনি বন্ধ ঘোষণা হলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। যেখানে নজরদারির দায়িত্ব এত ভাগে ভাগ করা যে দায় কারও নয়। যেখানে স্থানীয় ক্ষমতা আর কেন্দ্রীয় আইন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়ে। যেখানে অবৈধ অর্থ শুধু অপরাধ নয়, প্রয়োজন হয়ে ওঠে।

এই কারণেই বাংলার কয়লা কেলেঙ্কারি শেষ হয় না। একজন ধরা পড়লে অন্যজন উঠে আসে। এক রুট বন্ধ হলে আরেকটা খুলে যায়। কারণ কয়লা এখনও মাটির নিচে আছে। শিল্প এখনও জ্বালানি চায়। রাজনীতি এখনও টাকা চায়।

রাত নামলে আজও আসানসোল–রানিগঞ্জের কোনও কোনও জায়গায় আলো জ্বলে ওঠে। হয়তো আগের মতো নয়, হয়তো সাবধানে। কিন্তু গল্প শেষ হয়নি। আদালতের রায় একদিন আসবে। কারও শাস্তি হবে, কারও মুক্তি। কিন্তু এই উপন্যাসের শেষ পাতা লেখা হবে সেদিনই, যেদিন মাটির নিচের কয়লা আর উপরের ক্ষমতার মধ্যে এই অলিখিত চুক্তি ভাঙবে।

তার আগে পর্যন্ত, বাংলার কয়লা কেলেঙ্কারি থাকবে—একটি অনুসন্ধানী উপন্যাস, যার প্রতিটি অধ্যায় লেখা হয় রাতের অন্ধকারে, আর পড়া হয় দিনের আলোয়।

 

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles