বাংলাস্ফিয়ার- একটি গণতন্ত্র কীভাবে ধীরে ধীরে ব্যক্তি-নির্ভর রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়—ভারতের রাজনীতিতে ক্ষমতা, দৃশ্যমানতা ও প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘ ছায়ার গল্প।
ভারতের রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলো খুব কম ক্ষেত্রেই বিপ্লবের মতো আসে। এখানে পরিবর্তন আসে ক্ষয় হয়ে, জমে জমে, প্রায় অদৃশ্যভাবে। একদিন হঠাৎ করে আমরা বুঝতে পারি,যে জিনিসটাকে একসময় ব্যতিক্রম মনে হয়েছিল, সেটাই এখন স্বাভাবিক। যে দৃশ্যটাকে একসময় অস্বস্তিকর লাগত, সেটাই এখন রাজনীতির দৈনন্দিন ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ।
আজ যদি কাউকে জিজ্ঞেস করা হয়,ভারতের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু কী—উত্তরে খুব কম মানুষই কোনও মতাদর্শের নাম নেবে। কেউ হয়তো ‘উন্নয়ন’ বলবে, কেউ ‘জাতীয়তাবাদ’। কিন্তু কথোপকথন যত এগোবে, ততই স্পষ্ট হবে যে সব রাস্তা গিয়ে শেষ হচ্ছে একটি মুখে।

Narendra Modi
নরেন্দ্র মোদি।
তিনি আর কেবল একজন প্রধানমন্ত্রী নন। তিনি একটি দৃশ্য, একটি অভ্যাস, একটি সর্বব্যাপী উপস্থিতি। এমন উপস্থিতি, যা ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের কাঠামোকে আড়াল করে দেয়, আর রাষ্ট্রের বদলে সামনে এনে দাঁড় করায় একজন মানুষকে।
ভারতের সংবিধান এমন কোনও ব্যবস্থা তৈরি করেনি যেখানে নাগরিকরা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে ভোট দিতে পারেন। ভারত একটি সংসদীয় গণতন্ত্র—ওয়েস্টমিনস্টার মডেলের উত্তরাধিকার। তাত্ত্বিকভাবে ভোট হয় দলের জন্য, সংসদের জন্য, স্থানীয় প্রতিনিধির জন্য। কিন্তু বাস্তবে আজ একটি অঘোষিত সমীকরণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে: বিজেপিকে দেওয়া প্রতিটি ভোট কার্যত একজন মানুষের প্রতি আস্থার ঘোষণা।
আইনে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন সংসদ থেকে; বাস্তবে তিনি নির্বাচিত হন পোস্টার, বিজ্ঞাপন ও আবেগ থেকে।
এই পরিবর্তন একদিনে হয়নি। এটি ধীরে ধীরে নির্মিত—রাজনৈতিক দক্ষতা, মিডিয়া ব্যবস্থাপনা, রাষ্ট্রীয় দৃশ্যভাষা এবং জনমানসের পুরনো অভ্যাসকে কাজে লাগিয়ে।
সকালে খবরের কাগজ খুললে খুব কম দিনই যায়, যখন মোদির মুখ চোখে পড়ে না। কখনও তিনি কোনও প্রকল্পের উদ্বোধক, কখনও কোনও যোজনার মুখ, কখনও আন্তর্জাতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে ‘ভারতের কণ্ঠ’। বিজ্ঞাপন আর সংবাদ এখানে আলাদা করা কঠিন হয়ে যায়। সরকারি প্রকল্পের পোস্টার আর দলীয় প্রচারের মধ্যে সীমারেখা ঝাপসা।
তিনি শুধু নেতা নন—তিনি চিহ্ন। একটি ব্র্যান্ড।
সরকারি ওয়েবসাইটে তাঁর ছবি থাকে এমনভাবে, যেন রাষ্ট্র নিজেই একজন মানুষের মুখ হয়ে কথা বলছে। সামাজিক মাধ্যমে সরকারি বিজ্ঞাপন আর রাজনৈতিক প্রচারের পার্থক্য প্রায় বিলুপ্ত। বিলবোর্ডে তাঁর মুখ ঝুলে থাকে এমন ভঙ্গিতে, যেন নাগরিকের দিকে তাকিয়ে আছেন নজর রাখছেন বোঝা দুষ্কর।
এই দৃশ্যভাষার সঙ্গে জুড়ে গেছে পরিকাঠামো। ভারতের সবচেয়ে বড় ক্রিকেট স্টেডিয়াম তাঁর নামে। রাজধানীমুখী এক আধুনিক রেল পরিষেবার নাম তাঁর নামের সংক্ষিপ্ত রূপে। এমনকি তাঁর মায়ের নামেও রাস্তা। এই নামকরণগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এগুলো রাষ্ট্র ও ব্যক্তির এক ধরনের প্রতীকী মিলন।
একজন বিদেশি পর্যটক দিল্লিতে একদিন কাটালে যে বিষয়টি লক্ষ্য করবেন, তা কেবল ট্র্যাফিক বা দূষণ নয়। বরং একটি মুখের সর্বব্যাপী উপস্থিতি। মজার বিষয় হলো,এই উপস্থিতি অনেক স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চেয়েও বেশি দৃশ্যমান, অথচ তা গণতন্ত্রের ভেতরেই ঘটছে।
ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে ব্যক্তিত্বের প্রাধান্য অবশ্য নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই শক্তিশালী নেতারা রাষ্ট্রের প্রতীক হয়ে উঠেছেন। জওহরলাল নেহরু ছিলেন স্বাধীন ভারতের কণ্ঠ। ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন ক্ষমতার একক কেন্দ্র। একসময় তাঁর স্তাবককুল নির্দ্বিধায় বুক বাজিয়ে বলেছিলেন“ভারত মানেই ইন্দিরা, ইন্দিরা মানেই ভারত।”
কিন্তু আজকের পার্থক্যটি সূক্ষ্ম, তাই আরও বিপজ্জনক। ইন্দিরার ব্যক্তি-রাজনীতি ছিল স্পষ্ট, সংঘাতময় এবং অনেক সময় জোর করে চাপানো। মোদির যুগে ব্যক্তি-রাজনীতি অনেক বেশি মসৃণ, প্রযুক্তিনির্ভর এবং স্বাভাবিকীকৃত।
এখানে কেউ জোর করে কিছু চাপায় না। বরং নাগরিক নিজেই অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।
স্বৈরতন্ত্র আসে ভয় দিয়ে। আধুনিক ব্যক্তিত্ব-রাজনীতি আসে অভ্যাস দিয়ে।
এই অভ্যাস শুধু কেন্দ্রেই সীমাবদ্ধ নয়। একবার ভাষাটা তৈরি হয়ে গেলে, অন্যরাও তা শিখে নেয়। রাজনীতির প্রতিটি স্তরে আলাদা আলাদা মুখ গড়ে ওঠে,সনীতির জন্য নয়, দৃশ্যমানতার জন্য।
বিদেশমন্ত্রীকে দেখা হয় কঠোর দরকষাকষি করতে পারা নায়ক হিসেবে। তাঁর চোখে যোগ করা হয় কাল্পনিক লেজার, কারণ সামাজিক মাধ্যমে শক্তি এখন ভিজ্যুয়াল। সড়ক ও পরিকাঠামো মন্ত্রীকে তুলে ধরা হয় একমাত্র ব্যক্তি হিসেবে, যিনি দেশকে ‘পিছিয়ে পড়া’ থেকে বাঁচাতে পারেন। যেন পরিকাঠামো কোনও নীতিগত প্রক্রিয়া নয়, বরং একজন মানুষের ইচ্ছার ফল।
এই প্রবণতা রাজ্য রাজনীতিতে আরও স্পষ্ট, আরও নাটকীয়।
মহারাষ্ট্রে মুখ্যমন্ত্রীর বিলবোর্ডে কোনও প্রকল্পের নাম নেই, কোনও কর্মসূচির ব্যাখ্যা নেই। আছে শুধু একটি দৃশ্য—এক মধ্যযুগীয় যোদ্ধা-রাজার পায়ে ফুল বর্ষণ। নিচে একটি ঘরোয়া ডাকনাম। যেন ক্ষমতার উৎস প্রশাসন নয়, ইতিহাস ও আবেগ।
এই নাটক শুধু বিজেপি-শাসিত রাজ্যে নয়। পশ্চিমবঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর ছবি দেয়াল থেকে সরকারি হোর্ডিং—সবখানেই। এক ধরনের মাতৃমূর্তির আবেশ তৈরি করা হয়। তামিলনাড়ুতে শাসকের মুখ প্রায়শই তাঁর প্রয়াত পিতার সঙ্গে, ব্যক্তিত্বের পাশাপাশি উত্তরাধিকারের ঘোষণা। উত্তর ভারতের শহরে শহরে স্থানীয় বিধায়করা বেআইনি ব্যানারে নিজেদের মুখ ঝুলিয়ে রাখেন—কারণ দৃশ্যমান না হলে অস্তিত্ব নেই।
আজকের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় অপরাধ হলো অদৃশ্য হয়ে যাওয়া।
এই ব্যক্তি-নির্ভরতা রাজনীতির বাইরে গিয়েও ছড়িয়ে পড়ে প্রশাসনে। একসময় দিল্লি মেট্রোর সাফল্যের পর একজন আমলার মতামত এমন মর্যাদা পেয়েছিল, যেন তা কোনও চূড়ান্ত সত্য। একজন বিজ্ঞানী, যিনি পারমাণবিক কর্মসূচির মুখ ছিলেন, জনপ্রিয়তার জোরে রাষ্ট্রপতি হন। প্রশাসনিক সাফল্য এখানে কাঠামোর ফল নয়,ব্যক্তির কৃতিত্ব হিসেবে লেখা হয়।
এর পেছনে একটি গভীর ঐতিহাসিক বাস্তবতা আছে। ভারত স্বাধীনতার পরে যে প্রশাসনিক কাঠামো উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিল, তা ছিল মূলত ঔপনিবেশিক ও সামন্ততান্ত্রিক। শাসন মানে ছিল আদেশ। প্রতিষ্ঠান মানে ছিল কর্তৃত্ব। নাগরিক মানে ছিল প্রজা।
এই কাঠামোর মৌলিক চরিত্র খুব একটা বদলায়নি। ফলে নাগরিকেরা জানেন, এখানে নিয়ম নয়, মানুষই শেষ কথা বলে। আর যখন মানুষই শেষ কথা বলে, তখন মানুষকেই বড় করে দেখতে হয়।
কিন্তু এখানেই বিপদ।
১৪৫ কোটির দেশ, ২৮টি রাজ্য, অসামান্য বৈষম্য, দুর্বল জনপরিষেবা—এই বাস্তবতা কোনও ব্যক্তি দিয়ে সামলানো যায় না। যত বড় ব্যক্তিত্ব, তত ছোট প্রতিষ্ঠান। আর ছোট প্রতিষ্ঠান মানে এমন রাষ্ট্র, যা খারাপ নেতা বা অযোগ্য আমলার হাতেও নিজেকে রক্ষা করতে পারে না।
গণতন্ত্র ব্যক্তিত্বে টেকে না। টেকে নিয়মে, প্রক্রিয়ায়, প্রতিষ্ঠানেই।
এই জায়গায় এসে প্রশ্নটা ব্যক্তিকে নিয়ে নয়। প্রশ্নটা কাঠামো নিয়ে। প্রশ্নটা এই—ভারত কি ধীরে ধীরে এমন এক রাজনীতিতে ঢুকছে, যেখানে রাষ্ট্রের বদলে ব্যক্তি বড় হয়ে উঠছে?
ইতিহাস জানায়, এই পথের শেষটা কখনও ভালো হয় না।
ভারতের ব্যক্তি-কেন্দ্রিক রাজনীতিকে কেবল নেতাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা বা দলীয় কৌশলের ফল বলে ব্যাখ্যা করলে একটি বড় সত্য আড়ালে থেকে যায়। এই রাজনীতি টিকে থাকে—এবং ক্রমশ শক্তিশালী হয়—কারণ সমাজ নিজেই একে গ্রহণ করেছে। শুধু মেনে নিয়েছে নয়; অনেক ক্ষেত্রে স্বাগত জানিয়েছে।
এই সম্মতির সবচেয়ে বড় কারখানা হোল মিডিয়া।
একসময় ভারতীয় মিডিয়ার কাজ ছিল—ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা, রাষ্ট্রকে ব্যাখ্যা করা, নীতিকে বিশ্লেষণ করা। আজ সেই ভূমিকা ক্রমশ বদলে গেছে। টেলিভিশন স্টুডিওগুলো বিশ্লেষণের জায়গা থেকে পরিণত হয়েছে মঞ্চে; সংবাদ উপস্থাপকরা সাংবাদিকের বদলে হয়ে উঠেছেন ঘোষক; রাজনীতি হয়ে উঠেছে দৃশ্যমানতার প্রতিযোগিতা।
এই ব্যবস্থায় ব্যক্তি রাজনীতির জন্য আদর্শ।
নীতির জটিলতা বোঝানো কঠিন। প্রশাসনিক ব্যর্থতা ব্যাখ্যা করা সময়সাপেক্ষ। কিন্তু একজন মানুষকে দেখানো সহজ। তাঁর কণ্ঠস্বর, দেহভঙ্গি, চোখের ভাষা—সবই টেলিভিশনের জন্য উপযোগী। ক্যামেরা কাঠামো বোঝে না; ক্যামেরা মুখ বোঝে।
ফলে রাজনীতি রূপ নেয় মুখের নাটকে।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ আর একটি রাজনৈতিক বক্তব্য থাকে না; তা হয়ে ওঠে “ইভেন্ট”। মন্ত্রীদের সাক্ষাৎকার আর নীতির আলোচনা নয়; তা হয়ে ওঠে পারফরম্যান্স। প্রশ্নের জায়গা নেয় প্রশংসা, সংশয়ের জায়গা নেয় দৃশ্যমান আত্মবিশ্বাস।
এই পরিবর্তন কেবল মিডিয়ার দোষ নয়। এটি মিডিয়া ও রাজনীতির এক পারস্পরিক সমঝোতার ফল। ব্যক্তি-কেন্দ্রিক রাজনীতি মিডিয়াকে সহজ কনটেন্ট দেয়। মিডিয়া বিনিময়ে সেই ব্যক্তিকে সর্বত্র দৃশ্যমান করে তোলে।

Mamata Banerjee
যেখানে বিশ্লেষণ ব্যয়বহুল, সেখানে ব্যক্তিই সবচেয়ে সস্তা কনটেন্ট।
এই দৃশ্যমানতা শুধু সংবাদে সীমাবদ্ধ নয়। সরকারি বিজ্ঞাপন, সামাজিক মাধ্যমের প্রচার, ইউটিউব ক্লিপ, হোয়াটসঅ্যাপ ফরোয়ার্ড—সব মিলিয়ে এক ধরনের নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ তৈরি হয়। নাগরিক আলাদা করে খোঁজ না করলেও তিনি সেই মুখের মুখোমুখি হন।
এখানেই ব্যক্তি-রাজনীতির সবচেয়ে সূক্ষ্ম শক্তি, এটি বিরোধিতা চায় না, শুধু অভ্যস্ততা তৈরি করে।
দিনের পর দিন একই মুখ দেখলে, একই কণ্ঠ শুনলে, একই নাম শুনলে, সেটি প্রশ্নের বাইরে চলে যায়। মানুষ তাকে আর বিশ্লেষণ করে না; গ্রহণ করে। ঠিক যেমন ট্র্যাফিক শব্দ বা শহরের কোলাহল,অস্বস্তিকর হলেও স্বাভাবিক।
এই অভ্যাস ভোটারের মনস্তত্ত্ব বদলে দেয়।
ভারতের ভোটার ঐতিহাসিকভাবে শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের প্রতি আকৃষ্ট। এর একটি কারণ সামাজিক কাঠামো। ভারতীয় সমাজ বহু শতাব্দী ধরে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতার সঙ্গে পরিচিত—রাজা, জমিদার, সাহেব, কালেক্টর। প্রতিষ্ঠান এখানে কখনও নিরপেক্ষ রক্ষাকবচ হয়ে ওঠেনি; বরং ব্যক্তির হাতেই ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত ছিল।
স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র বদলেছে, কিন্তু মানসিক কাঠামো খুব একটা বদলায়নি।
ফলে ভোটার আজও বিশ্বাস করেন—যদি কেউ “শক্তিশালী” হন, তবে তিনি কিছু করতে পারবেন। নিয়ম দুর্বল, কিন্তু মানুষ শক্তিশালী—এই ধারণা আজও গভীর।
এই কারণেই ব্যক্তি-রাজনীতি কেবল উপর থেকে চাপানো নয়; নিচ থেকে উঠে আসে।
ভোটার যখন দেখেন যে হাসপাতাল ঠিকমতো চলে না, স্কুলে শিক্ষক নেই, আদালতে বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকে, তিনি প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করেন না। কারণ প্রতিষ্ঠান তাঁর কাছে বিমূর্ত। তিনি দায়ী করেন মানুষকে। আবার আশাও রাখেন মানুষেই।
এই দ্বৈততা থেকেই জন্ম নেয় ক্যারিশমার রাজনীতি।
যে সমাজ প্রতিষ্ঠান থেকে ন্যায় পায় না, সে ব্যক্তিত্বের কাছেই অলৌকিক প্রত্যাশা রাখে।
এই প্রত্যাশা পূরণের প্রতিশ্রুতি দেন রাজনীতিকেরা। তাঁরা বলেন—“আমি আছি।” “আমি ঠিক করে দেব।” “আমি লড়ব।” এই “আমি”-র ভাষা ধীরে ধীরে “আমরা”-কে গ্রাস করে।
এখানে একটি গভীর সাংবিধানিক বিপর্যয় ঘটে—কিন্তু নীরবে।
কারণ গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো প্রক্রিয়া। নিয়ম। ধারাবাহিকতা। ব্যক্তিত্ব নয়। কিন্তু ব্যক্তি-রাজনীতিতে সবকিছু নির্ভর করে উপস্থিতির উপর। নেতা থাকলে কাজ হবে, না থাকলে হবে না।
এই মানসিকতা প্রতিষ্ঠানকে অলস করে তোলে।
যখন সাফল্য ব্যক্তির নামে লেখা হয়, তখন ব্যর্থতার দায়ও ব্যক্তির উপর পড়ে,কিন্তু ব্যবস্থা অক্ষত থাকে। ফলে ব্যবস্থা শেখে না, সংশোধিত হয় না। একই ভুল বারবার হয়, আর প্রতিবার নতুন মুখ এসে প্রতিশ্রুতি দেয়।
এই জায়গায় এসে ব্যক্তি-রাজনীতি আর শুধু বিপজ্জনক থাকে না; এটি আত্মবিস্মৃত রাষ্ট্র তৈরি করে।
বিরোধীরাও এই ফাঁদ এড়াতে পারে না।
অনেকে মনে করেন, ব্যক্তি-কেন্দ্রিক রাজনীতি কেবল ক্ষমতাসীনদের অস্ত্র। বাস্তবে এটি সংক্রামক। যখন একজন নেতা এই ভাষায় সফল হন, অন্যরা বাধ্য হন একই ভাষা শিখতে।
ফলে বিরোধী দলও ধীরে ধীরে নীতির বদলে মুখ খোঁজে। তারা আর বলে না—“আমাদের প্রোগ্রাম এই।” তারা বলে—“আমাদের নেতা ওনার মতো শক্তিশালী।” এই তুলনার মধ্যেই প্রতিষ্ঠান হেরে যায়।
এভাবে রাজনীতি এক ধরনের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়—কে বেশি দৃশ্যমান, কে বেশি পরিচিত, কে বেশি “বড়”।

Amit Shah
যখন রাজনীতি প্রতিযোগিতা হয়ে ওঠে ব্যক্তিত্বের, তখন রাষ্ট্র হেরে যায় নীরবে।
এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে কী তৈরি করে?
একটি রাষ্ট্র, যেখানে নিয়ম ভঙ্গ হলেও সংশোধন নেই সেখানে প্রশাসন অপেক্ষা করে নির্দেশের জন্য। যেখানে আমলারা ঝুঁকি নিতে ভয় পান। যেখানে প্রতিষ্ঠান সিদ্ধান্ত নেয় না,ব্যক্তির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
এই রাষ্ট্র খুব দ্রুত কাজ করতে পারে, কিন্তু খুব ধীরে শেখে।
এবং সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয়, এই রাষ্ট্রে খারাপ নেতার হাতেও সমানভাবে ক্ষমতা থেকে যায়। কারণ কোথাও স্বয়ংক্রিয় ব্রেক নেই। কোনও প্রতিষ্ঠান নেই যা বলবে, “এখানে থামো।”
এই জায়গাতেই ব্যক্তি-রাজনীতির প্রকৃত বিপদ।
এটি আজ ভালো লাগতে পারে। কার্যকরও মনে হতে পারে। কিন্তু এটি এমন এক ব্যবস্থা তৈরি করে, যা নিজেকে শুধরাতে জানে না।
গণতন্ত্রের আসল শক্তি কখনওই একজন মানুষের মধ্যে থাকে না। থাকে সেই সব অদৃশ্য কাঠামোর মধ্যে, যেগুলি মানুষ বদলালেও টিকে থাকে। আদালত, প্রশাসন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, স্থানীয় সরকার—এগুলিই রাষ্ট্রের স্মৃতি। কিন্তু ব্যক্তি-কেন্দ্রিক রাজনীতির সবচেয়ে গভীর ক্ষতি এখানেই: এটি স্মৃতিকে দুর্বল করে।
প্রতিষ্ঠান হঠাৎ ভেঙে পড়ে না। ভাঙনের শব্দও হয় না। বরং ধীরে ধীরে তারা নিজেদের ভূমিকা ছেড়ে দেয়। কখনও ভয় থেকে, কখনও সুবিধা থেকে, কখনও অভ্যাসের বশে।
ভারতে এই প্রক্রিয়াটি খুব সূক্ষ্মভাবে ঘটেছে।
যখন রাজনীতি ব্যক্তি-নির্ভর হয়ে ওঠে, তখন প্রশাসনের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি আর থাকে না—নিয়ম কী বলে?” প্রশ্নটি হয়ে দাঁড়ায়—“নেতা কী চান?” এই মানসিক পরিবর্তনটি আইনবইয়ে লেখা থাকে না, কিন্তু অফিসের ফাইলে, নোটশিটে, মৌখিক নির্দেশে ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ে।
একজন আমলা তখন আর সিদ্ধান্ত নিতে চান না। সিদ্ধান্ত নেওয়া মানেই ঝুঁকি। আর ঝুঁকি নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে তখনই, যখন প্রতিষ্ঠান নিজের দায়িত্বে বিশ্বাস করে। ব্যক্তি-রাজনীতিতে দায়িত্ব ব্যক্তির। প্রতিষ্ঠান শুধু বাহক।
এই কারণে প্রশাসন ধীরে ধীরে প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে। সে আর উদ্যোগ নেয় না; অপেক্ষা করে। সে আর সমস্যা সমাধান করে না; নির্দেশ খোঁজে। এর ফল হলো—যন্ত্রটি কাজ করে, কিন্তু চিন্তা করে না।

Mayawati
যখন প্রতিষ্ঠান সিদ্ধান্ত নেওয়া ভুলে যায়, তখন রাষ্ট্র কেবল নির্দেশ মানার যন্ত্রে পরিণত হয়।
এই প্রবণতা কেবল আমলাতন্ত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। আদালত, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, এমনকি স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলিও একই চাপে পড়ে। কারণ ব্যক্তি-নির্ভর রাজনীতিতে স্বাধীনতা আর নিরপেক্ষতা গুণ নয়; এগুলো ঝুঁকি।
যে বিচারক বেশি প্রশ্ন করেন, তিনি “অস্বস্তিকর” হয়ে ওঠেন। যে নিয়ন্ত্রক সংস্থা দৃঢ় অবস্থান নেয়, তাকে “বাধা” হিসেবে দেখা হয়। যে বিশ্ববিদ্যালয় বা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্ষমতার ভাষার বাইরে কথা বলে, তাকে “অপ্রয়োজনীয় বিতর্কের কেন্দ্র” বানানো হয়।
এইভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে শিখে নেয়—নীরব থাকাই নিরাপদ।
এই নীরবতা অনেক সময় নাগরিকের চোখে পড়ে না। কারণ ব্যক্তি-রাজনীতি এক ধরনের বিভ্রম তৈরি করে। যতক্ষণ নেতা দৃশ্যমান, ততক্ষণ মনে হয় রাষ্ট্র সক্রিয়। ফাইল চলছে না, কিন্তু বক্তৃতা চলছে। প্রকল্প আটকে আছে, কিন্তু উদ্বোধন হচ্ছে।
এই বৈপরীত্যটি বিপজ্জনক।
কারণ রাষ্ট্রের প্রকৃত কাজ—স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিচার, স্থানীয় পরিষেবা—এসব দৃশ্যমান নয়। এগুলো ধীর, একঘেয়ে, নিয়মনির্ভর। ব্যক্তি-রাজনীতি এগুলোকে পছন্দ করে না। এগুলো ক্যামেরার জন্য উপযোগী নয়।
ফলে রাষ্ট্রের শক্তি ক্রমশ সরে যায় সেই জায়গাগুলো থেকে, যেখানে নাগরিকের জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে।
যা ক্যামেরায় ধরা পড়ে না, ব্যক্তি-রাজনীতিতে তার মূল্যও থাকে না।
এই জায়গায় এসে “শক্ত নেতা” বনাম “কার্যকর রাষ্ট্র”—এই দ্বন্দ্বটি স্পষ্ট হয়।
শক্ত নেতা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তিনি নিয়ম ভাঙতে পারেন। তিনি প্রশাসনকে চাপ দিতে পারেন। স্বল্পমেয়াদে এটি কার্যকরও হতে পারে। কিন্তু কার্যকর রাষ্ট্র অন্য জিনিস চায়,ধারাবাহিকতা, পূর্বানুমেয়তা, সংশোধনের ক্ষমতা।
একজন শক্ত নেতা রাষ্ট্র চালাতে পারেন। কিন্তু তিনি রাষ্ট্র হতে পারেন না।
সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন রাষ্ট্র নিজেই এই পার্থক্যটি ভুলে যায়। যখন প্রতিষ্ঠান নিজেদের জায়গা ছেড়ে দেয়। তখন রাষ্ট্র আর নিজেকে শাসন করতে পারে না; তাকে শাসন করতে হয়।
এই অবস্থায় রাষ্ট্র খুব দ্রুত কাজ করতে পারে, কিন্তু খুব ধীরে শেখে। ভুল হলে সংশোধন হয় না; শুধু মুখ বদলায়। পরবর্তী নেতা এসে আগের মতোই কাজ করেন—শুধু পোস্টারে মুখ বদলায়।
এই কারণেই ব্যক্তি-রাজনীতির সবচেয়ে বড় বিপদ খারাপ নেতা নয়। বিপদ হলো—এই ব্যবস্থা খারাপ নেতার হাতেও সমানভাবে কাজ করে।
একবার যদি প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে যায়, তবে নেতা ভালো হোক বা খারাপ, রাষ্ট্রের নিজের কোনও প্রতিরোধ থাকে না।
ইতিহাস এই বিষয়ে নির্মমভাবে স্পষ্ট।
বিশ শতকের বহু দেশে দেখা গেছে, প্রথম শক্ত নেতা জনপ্রিয় ছিলেন। তিনি শৃঙ্খলা এনেছিলেন, গতি এনেছিলেন, মানুষ তাঁকে ভালোবেসেছিল। কিন্তু তাঁর হাত ধরে যে ব্যক্তি-নির্ভর ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল, সেটিই পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রকে অচল করে দেয়।
কারণ পরবর্তী নেতা সবসময় আগের মতো সক্ষম হন না। কিন্তু ততদিনে প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়েছে। সংশোধনের কোনও পথ নেই।

kejriwal
ভালো নেতা চলে গেলে প্রতিষ্ঠান থাকলে রাষ্ট্র বাঁচে। প্রতিষ্ঠান না থাকলে রাষ্ট্রও চলে যায়।
এই জায়গায় এসে ভারতের প্রশ্নটি আর কোনও একজন নেতাকে নিয়ে থাকে না। প্রশ্নটি হয়ে ওঠে—এই কাঠামো কতদিন টিকবে? এবং এর মূল্য কে দেবে?
এর মূল্য দেবে নাগরিক—যখন আদালত দেরি করবে, যখন হাসপাতাল কাজ করবে না, যখন প্রশাসন দায়িত্ব নেবে না। তখন আর পোস্টার কাজ করবে না।
কিন্তু তখন সংশোধন কঠিন হয়ে যাবে। কারণ ব্যক্তি-রাজনীতি প্রতিষ্ঠান ভাঙে সহজে, গড়ে তুলতে সময় লাগে প্রজন্মের পর প্জন্ম।
এই জায়গায় এসে একটি অস্বস্তিকর সত্য সামনে আসে: ব্যক্তি-রাজনীতি যতই জনপ্রিয় হোক, এটি রাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল করে। আর দুর্বল রাষ্ট্র মানে দুর্বল
ব্যক্তি-কেন্দ্রিক রাজনীতি কোনও দেশের একান্ত নিজস্ব ব্যাধি নয়। এটি একটি পুরোনো রাজনৈতিক প্রবণতা—প্রায় চিরন্তন। ইতিহাসের প্রতিটি যুগেই মানুষ কোনও না কোনও সময় এমন একজনকে খুঁজেছে, যিনি “সব ঠিক করে দেবেন।” যিনি বিশৃঙ্খলার মধ্যে শৃঙ্খলা আনবেন। যিনি জটিলতাকে সরল করে দেবেন।
এই চাহিদা নতুন নয়। নতুন হোল—এই চাহিদা এখন গণতন্ত্রের ভেতরেই পূরণ হচ্ছে।
একসময় শক্তিমান শাসক আসতেন গণতন্ত্রের বাইরে থেকে,রাজা, সাম্রাজ্যবাদী, সেনানায়ক। আজ তিনি আসেন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। ব্যালটের বাক্স দিয়ে।
এই রূপান্তরই ব্যক্তি-রাজনীতিকে আরও বিপজ্জনক করে তোলে। কারণ এটি আর নিজেকে বিরোধী শক্তি হিসেবে ঘোষণা করে না। এটি বলে—আমি গণতন্ত্রেরই পরিণতি।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, ব্যক্তি-রাজনীতির উত্থান প্রায়শই ঘটে এক বিশেষ মুহূর্তে,যখন সমাজ ক্লান্ত, প্রতিষ্ঠান অকার্যকর, আর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। তখন মানুষ নিয়মে আস্থা হারায়। প্রক্রিয়ায় বিশ্বাস কমে। তারা দ্রুত ফল চায়। নিশ্চিত কণ্ঠস্বর চায়।
এখানেই ব্যক্তি আবির্ভূত হন।
তিনি বলেন—আমি সময় নষ্ট করব না। আমি নিয়মে আটকে থাকব না। আমি সিদ্ধান্ত নেব।
এই প্রতিশ্রুতি অত্যন্ত আকর্ষণীয়। কারণ এটি নাগরিককে দায় থেকে মুক্তি দেয়। সিদ্ধান্তের বোঝা ব্যক্তির ঘাড়ে চাপানো যায়। রাষ্ট্রের জটিলতা একটি মুখে সঙ্কুচিত হয়।
যখন ভবিষ্যৎ ভয় দেখায়, মানুষ নিয়ম নয়—নেতার হাত ধরতে চায়।
এই মানসিকতা শুধু রাজনীতিতে নয়, সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রেও দেখা যায়। ধর্মে আমরা গুরু খুঁজি। প্রতিষ্ঠানে আমরা “স্টার সিইও” খুঁজি। এমনকি পরিবারেও আমরা একজন সিদ্ধান্তদাতা চাই। ব্যক্তি-নির্ভরতা এক ধরনের মানসিক আরাম দেয়।
কিন্তু রাষ্ট্র সেই জায়গা নয়।
রাষ্ট্রকে আরামের জন্য নয়, ন্যায়ের জন্য কাজ করতে হয়। আর ন্যায় কখনও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে স্থায়ী হয় না; ন্যায় টিকে থাকে নিয়মে।
ইতিহাসের সমস্যা হলো—মানুষ প্রায়শই এই পার্থক্যটি ভুলে যায়।
বিশ শতকে একাধিক দেশ এই ভুল করেছে। প্রথমে এসেছে একজন শক্তিশালী নেতা। তিনি জনপ্রিয় ছিলেন। তিনি শৃঙ্খলা এনেছিলেন। তিনি ভাঙা ব্যবস্থায় গতি এনেছিলেন। মানুষ স্বস্তি পেয়েছিল।
কিন্তু সেই স্বস্তির বিনিময়ে যা হারিয়েছে, তা তারা পরে বুঝেছে—প্রতিষ্ঠান।
যখন শক্ত নেতা চলে গেলেন, তখন রাষ্ট্রের ভিত ফাঁকা। নতুন নেতা আগের মতো দক্ষ নন। কিন্তু ততদিনে নিয়ম দুর্বল, প্রতিরোধ নেই। রাষ্ট্র আর নিজেকে সংশোধন করতে পারে না।
এই পুনরাবৃত্তি ইতিহাসে এতবার ঘটেছে যে একে দুর্ঘটনা বলা যায় না। এটি এক ধরনের রাজনৈতিক প্রবণতা।

Bal Thackeray
ইতিহাসে ব্যক্তি-রাজনীতি কখনও শেষ অধ্যায় নয়; এটি প্রায়শই মধ্যবর্তী বিপর্যয়।
এই কারণেই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ—মানুষ কেন বারবার এই পথে হাঁটে, জেনেও যে ফল ভালো হয় না?
একটি কারণ হলো—স্বল্পমেয়াদি লাভ।
ব্যক্তি-রাজনীতি দ্রুত ফল দেখায়। দ্রুত সিদ্ধান্ত। দ্রুত শাস্তি। দ্রুত পুরস্কার। এই গতি নাগরিককে বিভ্রম দেয়—যেন রাষ্ট্র অবশেষে কাজ করছে।
কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি লাভ আসে ধীরে। শিক্ষা সংস্কার, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা—এগুলির ফল দশক ধরে আসে। ব্যক্তি-রাজনীতি এই অপেক্ষা সহ্য করতে পারে না। আর নাগরিককেও অপেক্ষা করতে শেখানো হয়নি।
আরেকটি কারণ হলো—দায় এড়ানোর সুবিধা।
যখন প্রতিষ্ঠান কাজ করে না, নাগরিক দায়ী হতে পারেন। ভোট দিয়েছেন, দাবি করেননি, নজর রাখেননি। কিন্তু যখন একজন ব্যক্তির হাতে সব ক্ষমতা তুলে দেওয়া হয়, দায়ও তাঁর। নাগরিক নিজেকে নির্দোষ ভাবতে পারেন।
এই দায়হীনতা ব্যক্তি-রাজনীতির নৈতিক আকর্ষণ।
ব্যক্তি-রাজনীতি নাগরিককে শুধু ক্ষমতাহীন করে না; এটি তাকে দায়হীনও করে তোলে।
এই জায়গায় এসে গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সামনে আসে—গণতন্ত্র কি কেবল ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা, না কি দায়িত্ব নেওয়ার সংস্কৃতি?
যদি গণতন্ত্র কেবল ভোট হয়, তবে ব্যক্তি-রাজনীতি স্বাভাবিক। কিন্তু যদি গণতন্ত্র মানে হয় নিয়মে আস্থা, প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ, প্রশ্ন করার অধিকার,তবে ব্যক্তি-রাজনীতি তার বিরোধী।
এই দ্বন্দ্ব থেকেই ভারতের বর্তমান সংকটকে বুঝতে হবে।
ভারত একটি তরুণ দেশ নয়, কিন্তু একটি তরুণ রাষ্ট্র। তার প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও পরিপক্ব নয়। তার সামাজিক বৈষম্য গভীর। তার প্রশাসনিক সক্ষমতা অসম। এই অবস্থায় ব্যক্তি-রাজনীতি স্বাভাবিকভাবেই আকর্ষণীয়।
কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।
কারণ ভারত যদি এই পথেই এগোয়, তবে একদিন এমন এক মুহূর্ত আসবে, যখন ব্যক্তি থাকবেন না—কিন্তু প্রতিষ্ঠানও থাকবে না।
তখন রাষ্ট্রকে নতুন করে গড়তে হবে। আর রাষ্ট্র গড়া ব্যক্তির চেয়েও কঠিন।

Indira gandhi
রাষ্ট্র ভাঙে দ্রুত। রাষ্ট্র গড়ে ধীরে—খুব ধীরে।
অস্যার্থ এটি, কোনও দলের প্রতি অভিযোগ নয়। অভিযোগ নয়। এটি একটি কাঠামোর প্রশ্ন। একটি ঐতিহাসিক সতর্কতা।
ব্যক্তি-রাজনীতি আকর্ষণীয়। এটি আবেগ জাগায়। এটি গতি দেয়। কিন্তু এটি একটি ঋণ—যার সুদ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দিতে হয়।
এই প্রবন্ধের এতদূর পর্যন্ত যাত্রা যদি কোনও একটি সত্য স্পষ্ট করে, তা হলো—ব্যক্তি-কেন্দ্রিক রাজনীতি কোনও অস্বাভাবিক বিচ্যুতি নয়। এটি একটি স্বাভাবিক প্রলোভন। বিশেষত এমন সমাজে, যেখানে প্রতিষ্ঠান দুর্বল, বৈষম্য গভীর এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
প্রশ্নটি তাই এই নয়—ব্যক্তিত্ব-রাজনীতি কেন আকর্ষণীয়। প্রশ্নটি হলো—গণতন্ত্র কীভাবে এই আকর্ষণের মধ্যেও নিজেকে রক্ষা করে।
কারণ গণতন্ত্র কখনও নিখুঁত ছিল না। কিন্তু তার শক্তি ছিল আত্মসংশোধনের ক্ষমতায়। সেই ক্ষমতাই ব্যক্তি-রাজনীতির চাপে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
গণতন্ত্র টিকে থাকে চারটি স্তম্ভে—নিয়ম, প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সচেতনতা এবং সময়। ব্যক্তি-রাজনীতি এই চারটির প্রতিটিকেই দুর্বল করে, কিন্তু ভিন্ন ভিন্নভাবে।
নিয়ম দুর্বল হয়, কারণ সিদ্ধান্ত ব্যক্তির ইচ্ছার উপর নির্ভর করে। প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়, কারণ তারা নির্দেশের অপেক্ষায় থাকে। নাগরিক দুর্বল হয়, কারণ সে দায় এড়িয়ে যায়। আর সময়—সময়কে তাড়াহুড়ো করে ফেলা হয়, যেন দীর্ঘমেয়াদি কাজের কোনও মূল্য নেই।
এই চক্র ভাঙা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়।
প্রথম প্রয়োজন—একটি মানসিক পরিবর্তন। গণতন্ত্রকে আর “দ্রুত ফল দেওয়া যন্ত্র” হিসেবে দেখা যাবে না। গণতন্ত্র ধীর। এটি বিরক্তিকর। এটি অনেক সময় হতাশাজনক। কিন্তু এর মধ্যেই তার শক্তি।
যে রাষ্ট্র দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়, সে দ্রুত ভুলও করে। যে রাষ্ট্র ধীরে সিদ্ধান্ত নেয়, সে ভুল সংশোধনের সুযোগ রাখে।
গণতন্ত্রের গতি কম হওয়া তার দুর্বলতা নয়; সেটাই তার সুরক্ষা।
দ্বিতীয় প্রয়োজন—প্রতিষ্ঠানকে আবার দৃশ্যমান করা। ব্যক্তি-রাজনীতির সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো—প্রতিষ্ঠানকে অদৃশ্য করে দেওয়া। আদালত, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, স্থানীয় সরকার—এসবকে নাগরিকের দৈনন্দিন আলোচনায় ফিরিয়ে আনতে হবে।
নাগরিককে জানতে হবে—কোন সিদ্ধান্ত কোথায় হয়, কে নেয়, কীভাবে সংশোধন করা যায়। যতক্ষণ প্রতিষ্ঠান অচেনা থাকবে, ততক্ষণ মানুষ ব্যক্তির দিকেই তাকাবে।
এই জায়গায় মিডিয়ার ভূমিকা অপরিসীম। যদি সংবাদ মানে শুধু মুখ আর বক্তব্য হয়, তবে প্রতিষ্ঠান কখনও আলোচনায় আসবে না। কিন্তু যদি সংবাদ মানে হয় প্রক্রিয়া, নিয়ম, ফলাফল—তবে ব্যক্তি নিজে থেকেই আড়ালে যাবে।
তৃতীয় প্রয়োজন—নাগরিকের দায় স্বীকার।
গণতন্ত্রে সবচেয়ে সহজ কাজ হলো ভোট দেওয়া। সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো ভোটের মাঝখানের সময়টাতে সচেতন থাকা। প্রশ্ন করা। দাবি করা। নজর রাখা।
ব্যক্তি-রাজনীতি নাগরিককে এই মাঝের সময় থেকে অব্যাহতি দেয়। বলে—সব দায়িত্ব নেতার। গণতন্ত্র বলে—দায় সবার।
ভোট দেওয়াই গণতন্ত্র নয়। ভোটের পরও নাগরিক থাকা—সেটাই গণতন্ত্র।
চতুর্থ প্রয়োজন—অপেক্ষা করার শিক্ষা।
এটি সবচেয়ে অস্বস্তিকর সত্য। ভালো রাষ্ট্র রাতারাতি তৈরি হয় না। ভালো স্কুল, ভালো হাসপাতাল, কার্যকর বিচারব্যবস্থা—এসবের ফল এক দশক পরে আসে। ব্যক্তি-রাজনীতি এই সময় দিতে চায় না। নাগরিকও দিতে শেখেনি।
কিন্তু সময় ছাড়া প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে না।
ভারতের মতো দেশের জন্য এই শিক্ষা আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানকার বৈচিত্র্য, জনসংখ্যা ও বৈষম্য এমন যে, কোনও একক ইচ্ছা দিয়ে তা সামলানো যায় না। এখানে দরকার ধারাবাহিকতা—নেতা বদলালেও নীতি বদলাবে না, সরকার বদলালেও প্রতিষ্ঠান চলবে।
এই জায়গায় এসে প্রশ্নটি আর কোনও একজন নেতাকে ঘিরে থাকে না। প্রশ্নটি হয়ে ওঠে—ভারত কী ধরনের রাষ্ট্র হতে চায়?
একটি এমন রাষ্ট্র, যেখানে প্রতিটি সংকটে একজন মানুষের দিকে তাকাতে হয়?
না কি এমন রাষ্ট্র, যেখানে সংকট এলে নিয়ম কাজ করে?
একটি এমন রাষ্ট্র, যেখানে পোস্টার বদলালে মনে হয় পরিবর্তন হয়েছে?
না কি এমন রাষ্ট্র, যেখানে ধীরে ধীরে জীবন বদলায়—নীরবে, কিন্তু স্থায়ীভাবে?
এই প্রশ্নের উত্তর কোনও নির্বাচনে একবারে পাওয়া যায় না। এটি প্রজন্মের সিদ্ধান্ত।
রাষ্ট্র গড়ে ভোটে নয়—গড়ে ধৈর্যে।
এই প্রবন্ধ কোনও আশাবাদী সমাপ্তি দিতে চায় না। আশাবাদ এখানে দায়িত্বহীন হতে পারে। বরং এটি একটি সতর্ক সমাপ্তি।
ভারত এখনও এই পথ থেকে ফিরতে পারে। প্রতিষ্ঠান এখনও পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। নাগরিক সমাজ এখনও নিঃশেষ হয়নি। আদালত এখনও কথা বলে। প্রশাসন এখনও কাজ করে—যদিও ধীরে।
কিন্তু সময় সীমাহীন নয়।
ব্যক্তি-রাজনীতি যত দীর্ঘস্থায়ী হয়, প্রত্যাবর্তন তত কঠিন হয়। কারণ মানুষ তখন ভুলে যায়—রাষ্ট্র কখনও একজন মানুষ ছিল না।
রাষ্ট্র ছিল নিয়ম। প্রক্রিয়া। স্মৃতি।
আর সেই স্মৃতিই আজ সবচেয়ে বিপন্ন।
ভারত যখন একজন মানুষ হয়ে ওঠে, তখন সেটি কেবল একজন মানুষের উত্থান নয়। সেটি রাষ্ট্রের আত্মসংকোচন।
গণতন্ত্রের প্রকৃত পরীক্ষা কোনও শক্ত নেতার হাতে নয়। পরীক্ষা তখনই শুরু হয়, যখন শক্ত নেতা চলে যান।
প্রশ্নটা তাই খুব সাধারণ, কিন্তু গভীর—
নেতা চলে গেলে কি রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে থাকবে?
এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যত।
ফলে রাজনীতি রূপ নেয় মুখের নাটকে।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ আর একটি রাজনৈতিক বক্তব্য থাকে না; তা হয়ে ওঠে “ইভেন্ট”। মন্ত্রীদের সাক্ষাৎকার আর নীতির আলোচনা নয়; তা হয়ে ওঠে পারফরম্যান্স। প্রশ্নের জায়গা নেয় প্রশংসা, সংশয়ের জায়গা নেয় দৃশ্যমান আত্মবিশ্বাস।
এই পরিবর্তন কেবল মিডিয়ার দোষ নয়। এটি মিডিয়া ও রাজনীতির এক পারস্পরিক সমঝোতার ফল। ব্যক্তি-কেন্দ্রিক রাজনীতি মিডিয়াকে সহজ কনটেন্ট দেয়। মিডিয়া বিনিময়ে সেই ব্যক্তিকে সর্বত্র দৃশ্যমান করে তোলে।