অয়ন মুখোপাধ্যায়:
আধুনিক আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গণতন্ত্র আজ আর কোনো আদর্শ নয়, এক ধরনের কূটনৈতিক অনুমোদন পত্র। কে গণতান্ত্রিক, কে নয়—এই সিদ্ধান্ত এখন আর জনগণ বা সংবিধান নেয় না, নেয় বৈশ্বিক ক্ষমতার কেন্দ্রগুলো। ব্যালট বাক্সের ফলাফলের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। যে সরকার সেই স্বীকৃতি পায়, সে বৈধ; যে পায় না, সে প্রশ্নবিদ্ধ—ভোট যতই পাকাপোক্ত হোক না কেন।
এই বাস্তবতা নতুন নয়, কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা আরও নির্লজ্জ। ভেনেজুয়েলা, বলিভিয়া, ইরান কিংবা প্যালেস্টাইন—একেকটি উদাহরণ দেখিয়ে দেয়, কীভাবে “গণতন্ত্র” শব্দটি কৌশল গতভাবে ব্যবহার করা হয়। কোথাও নির্বাচন হলেই তাকে বলা হয় ভুয়ো, কোথাও নির্বাচন না হলেও সরকার “স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার” হয়ে ওঠে। প্রশ্নটা তাই আর গণতন্ত্র বনাম স্বৈরতন্ত্রের নয়; প্রশ্নটা আনুগত্য বনাম অবাধ্যতার।
পশ্চিমা শক্তির পররাষ্ট্রনীতিতে গণতন্ত্র ক্রমশ একটি এক্সপোর্টযোগ্য ধারণা হয়ে উঠেছে। তার সঙ্গে জুড়ে যায় এনজিও, পর্যবেক্ষক দল, মিডিয়া রিপোর্ট, নিষেধাজ্ঞা এবং প্রয়োজনে সামরিক হস্তক্ষেপ। প্রথমে বলা হয়—দেশটিতে মানবাধিকার বিপন্ন। তারপর অর্থনৈতিক চাপ। শেষে ঘোষণা—এই রাষ্ট্র নিজের জনগণকে শাসন করার যোগ্য নয়। এই পুরো প্রক্রিয়ার কোথাও জনগণের দৈনন্দিন জীবন, ক্ষুধা, কাজ বা নিরাপত্তা মুখ্য হয়ে ওঠে না।
এই গণতন্ত্র-রফতানির একটি মৌলিক সমস্যা আছে। এটি ধরে নেয় যে গণতন্ত্র বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া যায়। অথচ ইতিহাস বলে, গণতন্ত্র কোনো আমদানিকৃত পণ্য নয়। এটি সামাজিক সংগ্রামের ফল, দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইয়ের পরিণতি। বাইরে থেকে আসা “গণতন্ত্র” প্রায়শই ভেঙে দেয় বিদ্যমান রাষ্ট্রকাঠামো, অথচ স্থিতিশীল বিকল্প গড়ে তুলতে পারে না। ইরাক বা লিবিয়ার দিকে তাকালেই তার প্রমাণ মেলে।
আরও গভীর সমস্যা হলো—এই প্রক্রিয়ায় মানবাধিকার নিজেই একটি নির্বাচিত ধারণায় পরিণত হয়। কোথাও বেসামরিক মানুষের মৃত্যু আন্তর্জাতিক অপরাধ, কোথাও তা কোল্যাটারাল ড্যামেজ। কোথাও অবরোধকে যুদ্ধাপরাধ বলা হয়, কোথাও তাকে নীতিগত চাপ বলে বৈধতা দেওয়া হয়। একই কাজের ভিন্ন নাম—এই দ্বিচারিতাই আন্তর্জাতিক নৈতিকতার সবচেয়ে বড় সংকট।
এর ফলে বিশ্ব রাজনীতিতে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রগুলো আর সার্বভৌম নয়, তারা পরীক্ষাধীন। তাদের নীতির গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে বাইরের শক্তির স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যের ওপর। গণতন্ত্র তখন আর জনগণের ক্ষমতায়ন নয়, বরং একটি অনুমোদন ব্যবস্থা—কে বৈধ, কে অবৈধ তা নির্ধারণের হাতিয়ার।
সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো, এই প্রক্রিয়ায় গণতন্ত্র শব্দটিই তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। সাধারণ মানুষ যখন দেখে যে ভোট দিয়েও তার সরকার আন্তর্জাতিকভাবে অস্বীকৃত, আবার ভোট ছাড়াই কোথাও সরকারকে বৈধ বলা হচ্ছে, তখন গণতন্ত্র সম্পর্কে আস্থাই ভেঙে পড়ে। এর ফলেই জন্ম নেয় হতাশা, চরমপন্থা এবং রাষ্ট্রবিরোধী রাজনীতি।
গণতন্ত্র যদি সত্যিই রক্ষা করতে হয়, তবে তাকে কর্পোরেট কৌশল বা সামরিক নীতির হাতিয়ার বানালে চলবে না। গণতন্ত্র মানে শুধু নির্বাচন নয়, আবার শুধু স্বীকৃতিও নয়। গণতন্ত্র মানে জনগণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার—ভুল করার অধিকারসহ। সেই অধিকার বাইরে থেকে নিয়ন্ত্রিত হলে, গণতন্ত্র নামটাই কেবল বেঁচে থাকে, আত্মাটা হারিয়ে যায়।
আজ আন্তর্জাতিক রাজনীতির সামনে মূল প্রশ্নটি তাই এই—গণতন্ত্র কি একটি বৈশ্বিক আদর্শ, নাকি একটি ক্ষমতাশালী দেশের লাইসেন্সিং সিস্টেম? এই প্রশ্নের সৎ উত্তর না খুঁজলে, গণতন্ত্র এক্সপোর্ট করার নামে বিশ্ব আরও বেশি অস্থির, বিভক্ত এবং অবিশ্বাসী হয়ে উঠবে।