Home খবরা খবর আবার কী ব‍্যর্থ ইতিহাস ফেরার অপেক্ষায়

আবার কী ব‍্যর্থ ইতিহাস ফেরার অপেক্ষায়

Will History Repeat Itself

0 comments 485 views

বাংলাস্ফিয়ার:   (নিউ ইয়র্কারে প্রকাশিত বিশেষজ্ঞ জন ক‍্যাসিডির সাপ্তাহিক কলামের ভাবানুবাদ)
শনিবার মার-আ-লাগোতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাংবাদিক সম্মেলনটি দেখতে দেখতে—যেখানে তিনি বললেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলাকে “চালাবে” এবং সে দেশের তেলের সম্পদের একটি অংশ দখল করবে “আমাদের যে ক্ষতি হয়েছে তার ক্ষতিপূরণ হিসেবে”—আমার মনে ফিরে গেল ২০০৩ সালে। ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের পরপরই আমি কয়েক সপ্তাহ দেশটির বিভিন্ন তেল উৎক্ষেপন কেন্দ্রে ঘুরে বেড়িয়েছিলাম। অনেক জায়গায় তখনওগোলাবারুদ ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল, যুদ্ধের সময় যেগুলো ফাটেনি।। আমি কথা বলেছিলাম মার্কিন নেতৃত্বাধীন টাস্ক ফোর্স ‘রিও’র সদস্যদের সঙ্গে (‘রিও’ মানে ছিল ‘রেস্টোর ইরাকি অয়েল’) এবং স্থানীয় শ্রমিকদের সঙ্গেও। বাগদাদে গিয়ে ইরাকের তেল মন্ত্রকের কর্মকর্তাদেরও সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম।

অবশ্যই ভেনেজুয়েলা ইরাক নয়, আর অন্তত এখনো পর্যন্ত সেখানে কোনও মার্কিন দখলদারি ঘটেনি। যদিও ট্রাম্প মন্তব্য করেছিলেন, “মাটিতে বুট নামাতে আমরা ভয় পাই না।” তবু গত তেইশ বছরে এই দ্বিতীয়বার আমেরিকা একটি তেলসমৃদ্ধ দেশের কর্তৃত্ববাদী শাসককে অপসারণ করল। ২০১১ সালে ন্যাটোর লিবিয়া আক্রমণ ধরে নিলে তৃতীয়বার, যা মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতন ত্বরান্বিত করেছিল। ইতিহাস এখানে কিছু শিক্ষা দিয়ে যায়।

ট্রাম্প যেখানে নির্লজ্জ পেট্রো-সাম্রাজ্যবাদী, সেখানে বুশ প্রশাসনের সদস্যরা জোর দিয়ে বলতেন,ইরাকে শাসন পরিবর্তনের উদ্যোগের সঙ্গে হাইড্রোকার্বনের কোনও যোগ নেই। ডোনাল্ড রামসফেল্ড তো একবার বলেই ফেলেছিলেন, এর সঙ্গে তেলের “আক্ষরিক অর্থেই কোনো সম্পর্ক নেই”। তাঁদের দাবি ছিল, যুদ্ধোত্তর ইরাকের তেল শিল্প পুনর্গঠন পুরোপুরি সে দেশের কল্যাণের জন্য। বাসরার একটি তেল শোধনাগারে আমি এক বৈঠকে বসেছিলাম—যেটির সভাপতিত্ব করছিলেন টাস্ক ফোর্স রিও-র প্রধান এক মার্কিন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল। তাঁর এক সহকারী আমাকে একটি হ্যান্ডআউট দিয়েছিলেন, তাতে লেখা ছিল: “ইরাকের তেল শিল্প কে চালাবে? জ্বালানি খাতের দায়িত্বে থাকবে ইরাকিরাই।”

তবু আমেরিকার প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ ছিল প্রবল। তখন পশ্চিম এশিয়ায় প্রমাণিত তেল মজুতের দিক থেকে ইরাক ছিল দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসেই বুশ একটি ‘এনার্জি ক্রাইসিস’-এর কথা ঘোষণা করেছিলেন। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র তার ব্যবহৃত তেলের প্রায় অর্ধেকই আমদানি করত। ভাইস-প্রেসিডেন্ট ডিক চেনির নেতৃত্বে গঠিত একটি এনার্জি টাস্ক ফোর্স—যিনি আগে হ্যালিবার্টনের প্রধান নির্বাহী ছিলেন—একটি রিপোর্ট দেয়। তাতে নবায়নযোগ্য শক্তি, শক্তি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ও জীবাশ্ম জ্বালানিতে আরও বিনিয়োগের সুপারিশ ছিল। পাশাপাশি লাতিন আমেরিকা থেকে—বিশেষ করে ভেনেজুয়েলা থেকে—আরও তেল আমদানির কথাও বলা হয়। তখন ভেনেজুয়েলা ছিল আমেরিকার তৃতীয় বৃহত্তম বিদেশি তেল সরবরাহকারী, কানাডা ও সৌদি আরবের পরে। ইরাকের কথা প্রায় না তুলেই রিপোর্টে বলা হয়েছিল: “জ্বালানি নিরাপত্তা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ও পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার হওয়া চাই।”

আজ ছবিটা আলাদা। শেল-অয়েল বিপ্লব বা ফ্র্যাকিংয়ের জোরে আমেরিকা এখন বিশ্বের বৃহত্তম তেল উৎপাদক—সৌদি আরবেরও ওপরে—এবং নিট রফতানিকারক । কিন্তু এআই-ভিত্তিক পরিকাঠামো দ্রুত বাড়তে থাকায় বিদ্যুতের চাহিদাও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। রিনিউেবল এনার্জি সম্পর্কে প্রতি অনীহা সত্ত্বেও ট্রাম্প প্রশাসন তাদের সদ্য প্রকাশিত জাতীয় নিরাপত্তা ঘোষণাপত্রে যাকে বলেছে “এনার্জি ডমিন্যান্স”,তা অর্জনে বদ্ধপরিকর। এই প্রেক্ষাপটে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেল মজুতের দেশ ভেনেজুয়েলা (যার রিজার্ভ তিনশো বিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি) ট্রাম্পের নজরে পড়বে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ভেনেজুয়েলার অধিকাংশ তেল উত্তরাঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত অরিনোকো বেল্টে অবস্থিত। এই তেলের অনেকটাই ভারী কাদা-জাতীয়, উত্তোলন ও শোধন করা কঠিন। একমাত্র উপযুক্ত পেশাদারি দক্ষতা ও পুঁজি থাকলে তা সম্ভব। তাছাড়া আমেরিকার বহু শোধনাগার—বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চল ও পশ্চিম উপকূলে—এই ভারী ক্রুডের উপযোগী করে বানানো।

তবু ভেনেজুয়েলায় উৎপাদন বাড়ানো বিশাল এক কাজ। সাদ্দাম হুসেনের আমলের ইরাকের মতোই, বছরের পর বছর নিষেধাজ্ঞা ও দীর্ঘস্থায়ী অবহেলায় ভেনেজুয়েলার তেল শিল্প ভেঙে পড়েছে। দক্ষ কর্মীদের অনেকেই দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। গত বছর উৎপাদন ছিল দৈনিক প্রায় দশ লক্ষ ব্যারেল—পঁচিশ বছর আগের এক-তৃতীয়াংশ। শনিবার ট্রাম্প বলেছিলেন, বড় মার্কিন তেল কোম্পানিগুলি “ঢুকে পড়বে, বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করবে, ভেঙে পড়া তেল পরিকাঠামো ঠিক করবে, আর দেশের জন্য টাকা কামাতে শুরু করবে।” বাস্তবে বিষয়টা এত সহজ নয়।

একটি বড় বাধা বিনিয়োগের পরিমাণ। এক জ্বালানি বিশ্লেষক ফিনান্সিয়াল টাইমস-কে বলেছেন, উৎপাদন দ্বিগুণ করতে একশো বিলিয়ন ডলারেরও বেশি লাগবে। আরেকটি সমস্যা তেলের দাম যা সম্প্রতি ষাট ডলারের নিচে নেমে চার বছরের সর্বনিম্নে পৌঁছেছে। এই মুহূর্তে শেভরনই একমাত্র বড় মার্কিন কোম্পানি, যারা ভেনেজুয়েলায় কাজ করছে। বড়দিনের ঠিক আগে জানা যায়, প্রশাসন এক্সনমোবিল ও কনোকোফিলিপস-এর মতো সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে (চাভেজ সরকারের সময় যাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল) তারা ফিরতে আগ্রহী কি না জানতে। সেই বাজেয়াপ্তকরণ নিয়ে মামলাও এখনো চলছে। পলিটিকো জানিয়েছে, শিল্পমহল থেকে আসা প্রতিক্রিয়ার অনেকটাই ছিল নেতিবাচক। এক সূত্র বলেছিল, “সোজা কথা, তেলের দাম কম আর বিশ্বজুড়ে আরও আকর্ষণীয় ক্ষেত্র থাকায় কোম্পানিগুলির তেমন আগ্রহ নেই।”

মাদুরোর পতন দেখে তেল কোম্পানিগুলো হিসেব বদলাতে পারে, কিন্তু ইরাকের অভিজ্ঞতা শেখায়, দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা ছাড়া তারা বড় বিনিয়োগ করে না। ২০০৩ সালে ইরাকের অন্তর্বর্তী তেলমন্ত্রী আমাকে বলেছিলেন, বিদেশি বিনিয়োগ টানাটা “শুধু চুক্তির কাঠামো দাঁড় করানোর ব্যাপার।” কিন্তু হোয়াইট হাউস-নিযুক্ত উপদেষ্টা, হিউস্টনের তেল ব্যবসায়ী ফিলিপ জে. ক্যারল ছিলেন বেশি সতর্ক। তাঁর কথায়, “তেল কোম্পানিগুলি আগে দেখতে চাইবে ইরাকে একটি সরকার আছে কি না এবং তার ওপর আস্থা রাখা যায় কি না। তারা জানতে চাইবে, ছয়-সাত বছর পর দুনিয়াটা কেমন হবে।” এই সংশয় অমূলক ছিল না। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে গৃহযুদ্ধ ও সহিংস বিদ্রোহ বিদেশি সংস্থাগুলিকে দূরে রেখেছিল। আক্রমণের দুই দশকেরও বেশি পরে, মাত্র সাম্প্রতিক বছরগুলোতেই এক্সন ও শেভরনের মতো সংস্থা সেখানে ফিরতে শুরু করেছে।

এই মুহূর্তে ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ অস্পষ্ট। দীর্ঘমেয়াদে ট্রাম্প প্রশাসন আসলে কেমন সরকার চায়, মাদুরোর কোনও প্রাক্তন সহযোগী, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেতা, না কি কোনও মার্কিন ভাইসরয়,তা-ও পরিষ্কার নয়। তবে যা-ই ঘটুক, ইয়াঙ্কি পেট্রো-সাম্রাজ্যবাদের গন্ধ পেলেই ভেনেজুয়েলার সব রাজনৈতিক ধারার মানুষই তার বিরোধিতা করবে।— এ এমন এক ছায়া, যেটা কাটাতে দেশটির প্রায় এক শতক লেগেছিল।

প্রায় একশো বছর আগে, যখন স্ট্যান্ডার্ড অয়েল অব নিউ জার্সি (আজকের এক্সনের পূর্বসূরি), গালফ অয়েল (যা ১৯৮৪ সালে শেভরন কিনে নেয়) এবং রয়্যাল ডাচ/শেল ভেনেজুয়েলায় ঢোকে, তারা অত্যন্ত সুবিধাজনক চুক্তি আদায় করেছিল, সরকারকে স্বল্প কমিশন দিলেই চলত। চল্লিশের দশকে ভেনেজুয়েলা সরকার তেলের আয়ে পঞ্চাশ-পঞ্চাশ ভাগ দাবি করে। ১৯৬০ সালে ভেনেজুয়েলা ওপেক-এর একমাত্র আরব দুনিয়ার বাইরের দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হয়—যার লক্ষ্য ছিল ‘সেভেন সিস্টার্স’ নামে পরিচিত পশ্চিমা তেল দৈত্যদের কাছ থেকে ভালো দাম আদায়। ১৯৭৬ সালে, মাঝারি বামপন্থী আকসিওন ডেমোক্রাটিকা পার্টির প্রতিষ্ঠাতাদের একজন কার্লোস আন্দ্রেস পেরেসের নেতৃত্বে সরকার তেল শিল্পের বড় অংশ জাতীয়করণ করে এবং রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা পেট্রোলিওস দে ভেনেজুয়েলা গঠন করে। এরপর থেকে পিডিভিএসএ এই শিল্পে আধিপত্য বজায় রেখে আসছে যদিও পরে কয়েকটি মার্কিন কোম্পানিকে নতুন প্রকল্পে ঢুকতে দেওয়া হয়েছিল।চাভেজ সরকার ২০০৭ সালে সেগুলিও দখলে নিয়ে নেয়।

অনেক ভেনেজুয়েলানই মানেন, তেল শিল্প পুনর্গঠনে বিদেশি পুঁজি দরকার। মাদুরো-বিরোধীরা উৎপাদন বাড়িয়ে দৈনিক চল্লিশ লক্ষ ব্যারেলে নেওয়ার একটি পরিকল্পনাও করেছে। কিন্তু পঁচিশ বছরের রাজনৈতিক ভাঙন, নিষেধাজ্ঞা আর নানান অর্থনৈতিক দুর্দশার পরে, এটাই দেশের একমাত্র কাজ হিসেবে অবশিষ্ট থাকছেনা। প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো গড়ে তুলতে হবে, বিপুল বিদেশি ঋণের বোঝা কমাতে হবে, আর দেশছাড়া লক্ষ লক্ষ মানুষকে ফিরিয়ে আনতে হবে। কারাকাসের ক্যাথলিক আন্দ্রেস বেলো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ভেনেজুয়েলান অর্থনীতিবিদ অরল্যান্ডো ওচোয়া সম্প্রতি ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-কে বলেছিলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের উচিত এক ধরনের মার্শাল প্ল্যান বাস্তবায়ন করা। বিষয়টা শুধু তেল-গ্যাস খাতে ঢুকে মাটি থেকে তেল তুলে নেওয়ার চেয়ে অনেক বড়।” কথাটা নিঃসন্দেহে ঠিক। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প কি তা বুঝবেন—আর সেই অনুযায়ী কাজ করবেন—এমন কোনো সম্ভাবনা আদৌ আছে কি?

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles