বাংলাস্ফিয়ার: ৩ জানুয়ারির গভীর রাতে ভেনেজুয়েলার স্বৈরশাসক নিকোলাস মাদুরো অপহৃত হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের আসল উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে দিলেন। তাঁর ভাষায়, “ভেনেজুয়েলার তেল ব্যবসা বহু বছর ধরেই সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে—একেবারে সর্বনাশ। আমরা আমাদের বিশাল মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোকে সেখানে পাঠাব, তারা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করবে, ধ্বংসপ্রাপ্ত পরিকাঠামো সারিয়ে তুলবে, আর আমেরিকার জন্য জন্য বিপুল অর্থ সমাগমের রাস্তা প্রশস্ত করবে।”
এই ঘোষণায় ছিল প্রতিশোধের মধুর স্বাদ। আঠারো বছর আগে, হুগো চাভেজের আমলে, ভেনেজুয়েলা আমেরিকাসহ পশ্চিমী সব কোম্পানিগুলোর মালিকানাধীন তেল কোম্পানিগুলি জাতীয়করণ করেছিল। তার জেরে যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক আদালতে ভেনেজুয়েলা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থা পিডিভিএসএ-র বিরুদ্ধে প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণের দাবি জমা পড়ে। ১৬ ডিসেম্বর ট্রাম্প প্রকাশ্যেই দাবি করেছিলেন, ভেনেজুয়েলা যেন “আমাদের কাছ থেকে আগে যে তেল, জমি আর সম্পদ চুরি করেছিল, সব ফিরিয়ে দেয়।”
কিন্তু প্রেসিডেন্টের লক্ষ্য কেবল প্রতিশোধ নয়। কয়েক দশকের অবহেলা ও অপদার্থ ব্যবস্থাপনার ফলে বেশ কিছুকাল হোল ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কমে এখন দৈনিক প্রায় ১০ লক্ষ ব্যারেলে নেমে এসেছে।ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, বন্ধ পড়ে থাকা উৎপাদন ক্ষমতা ফের সচল করা গেলে ভেনেজুয়েলা যেমন ধনী হবে, তেমনি মার্কিন পকেটও ভরবে। তার ওপর দেশটির মাটির নিচে রয়েছে আনুমানিক ৩০০ বিলিয়ন ব্যারেল তেল,বিশ্বের মোট মজুতের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ,যার মানে, কাগজে-কলমে অন্তত উৎপাদন আরও বাড়ার সুযোগ আছে, অন্তত কিছু সময়ের জন্য। ভেনেজুয়েলার ভারী, সালফারসমৃদ্ধ অপরিশোধিত তেল ঠিক সেই ধরনের, যার তীব্র ঘাটতিতে ভুগছে আমেরিকার রিফাইনারিগুলো, আর এমন এক সময়ে, যখন এই তেলের আর এক বড় সরবরাহকারী কানাডার সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক টানাপোড়েনের মধ্যে।
তাহলে ট্রাম্পের এই তেলের জন্য ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টায় অপছন্দের কী আছে? উত্তর—অনেক কিছু। অদূর ভবিষ্যতে ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন বাড়ার চেয়ে কমার সম্ভাবনাই বেশি।গত ডিসেম্বরে আমেরিকা কালো তালিকাভুক্ত ট্যাঙ্কারে ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানির ওপর অবরোধ জারি করে এবং তার পর একটি ট্যাঙ্কার বাজেয়াপ্তও করে। এর ফলে রপ্তানি কার্যত ধসে পড়েছে, সমুদ্রে অলসভাবে ভাসমান রয়ে গিয়েছে ভেনেজুয়েলার অ-বিক্রীত তেলবাহী অসংখ্য জাহাজ। উপরন্তু, ভেনেজুয়েলায় এই মুহূর্তে ন্যাফথার মারাত্মক ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এটি এমন একটি তরল যা না মেশালে ভেনেজুয়ালার অতিরিক্ত ঘন তেল বিক্রয় ও পরিবহণযোগ্য করে তোলা যায়না। রাশিয়া থেকে ন্যাফথার আমদানিও পুরোপুরি বন্ধ। ফলে এমন শ্বাসরোধকারী অবরোধ চলতে থাকলে এ দেশের তেল উৎপাদন আরও বর্তমানের দশ লাখ থেকে দৈনিক ৭ লক্ষ ব্যারেলের নিচে নামাতে হতে পারে।
সবকিছু মসৃণভাবে এগোলে এবং আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ তুলে নিলে কয়েক মাসের মধ্যে উৎপাদন কিছুটা ঘুরে দাঁড়াতে পারে। সামান্য রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতির কাজে অর্থ খরচ করে মাধ্যমে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ উৎপাদন দৈনিক ১২ লক্ষ ব্যারেলে পৌঁছাতে পারে বলে অনুমান কেপলারের মতো তথ্য সংস্থার। তবু এক সময় ভেনেজুয়ালায় যে পরিমান তেল দৈনিক উত্তোলন হোত, তার ধারেকাছেও পৌঁছন যাবেনা।এরপরেও উৎপাদনের নিরিখে বিশ্বে ১৮তম স্থানে থাকা লিবিয়ার একটু পিছনেই থেকে যাবে ভেনেজুয়েলা।এর চেয়ে বেশি তেল তুলতে হলে দেশটিকে তিনটি বড় বাধা টপকাতে হবে—তীব্র অর্থাভাব, শ্রমিকের ঘাটতি এবং ইতিমধ্যেই উপচে পড়া আন্তর্জাতিক বাজার।
রিস্টাড এনার্জি নামের এক পরামর্শক সংস্থার হিসেব অনুযায়ী, কেবল অনুসন্ধান ও উৎপাদন ক্ষেত্রে ভেনেজুয়েলাকে ১৫ বছর আগের স্তরে ফেরাতে প্রয়োজন হবে প্রায় ১১০ বিলিয়ন ডলারের পুঁজি যা ২০২৪ সালে বিশ্বের সর্বত্র মিলিয়ে আমেরিকার সব তেল জায়ান্ট যত বিনিয়োগ করেছে, তার দ্বিগুণ। ট্রাম্পের ধারণা, এই কোম্পানিগুলো ঝাঁপিয়ে পড়ে মোটা অঙ্কের চেক লিখে দেবে। শেভরন, যারা ইতিমধ্যেই ভেনেজুয়েলায় রয়েছে এবং নিষেধাজ্ঞায় ছাড়পত্রে নিয়ে দৈনিক প্রায় ২ লক্ষ ব্যারেল তেল আমেরিকায় রফতানি করছে, তারা হয়তো কাজের পরিধি বাড়াতে পারে।
কিন্তু অন্যরা অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা ভুলে যায়নি। ট্রাম্পের পরিকল্পনার সাফল্য তাই মোটেই নিশ্চিত নয়। সাড়ে তিন বছরের একটু বেশি সময়ের মধ্যেই তিনি হোয়াইট হাউস ছাড়বেন, তার আগেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলাও অসম্ভব নয়। আপাতত মার্কিন তেল জায়ান্টরা তাঁর আহ্বানে নীরব। আন্তর্জাতিক পণ্য ব্যবসায়ীরাও “শুরু করার ব্লকে দাঁড়িয়ে নেই,” বলছেন পরামর্শক জঁ-ফ্রাঁসোয়া লঁবের। আর যেসব ব্যাংক ও বিমা সংস্থা অর্থায়ন ও পরিবহণের ঝুঁকি কভার করবে, তারা তো আরও ধীরগতিতে ফিরবে।
ধরে নেওয়া যাক, প্রয়োজনীয় সংখ্যক তেল কোম্পানিকে বিনিয়োগে রাজি করানো গেল। তবুও প্রশ্ন থেকে যায়, ভেনেজুয়েলার তেল শিল্প কি সেই গতি ধরে রাখতে পারবে? সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি ভয়াবহ মেধাপাচারের শিকার হয়েছে। ইঞ্জিনিয়ার থেকে ভূতত্ত্ববিদ, দশ হাজারের বেশি দক্ষ কর্মী দেশ ছেড়েছেন। পিডিভিএসএ এখন কার্যত সেনাবাহিনীর দ্বারা পরিচালিত। পশ্চিমা কোম্পানির সঙ্গে টেকসই যৌথ উদ্যোগ গড়তে হলে ৭০ হাজার কর্মীর এই সংস্থাকে সম্পূর্ণভাবে সংস্কার করতে হবে, যা বহু বছরেও সম্ভব না হতে পারে।
আর যে অতিরিক্ত তেল তোলা হবে, তা ঢুকবে এক ইতিমধ্যেই স্যাচুরেটেড বাজারে। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার পূর্বাভাস—ব্রাজিল, গায়ানা ও আমেরিকার মতো দেশে শক্তিশালী উৎপাদন এবং চাহিদার মন্থর বৃদ্ধির ফলে দশকের শেষ পর্যন্ত বিশ্বে তেলের জোগান চাহিদাকে ছাড়িয়ে যাবে। বহু বিশ্লেষকের ধারণা, এর ফলে চলতি ও আগামী বছর তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৫০ ডলারের দিকে, এমনকি তার নিচেও নেমে যেতে পারে যা ভেনেজুয়েলার বেশিরভাগ বর্তমান তেল কোম্পানির ক্ষেত্রের ব্রেক-ইভেন দামেরও কম। নতুন প্রকল্পগুলো তো আরও কম প্রতিযোগিতামূলক।
সবচেয়ে আশাবাদী পরিস্থিতিতেও কেপলারের পূর্বাভাস—২০২৮ সালের মধ্যে ভেনেজুয়েলার উৎপাদন বেড়ে দৈনিক ১৭–১৮ লক্ষ ব্যারেলে পৌঁছাতে পারে। তাতে বৈশ্বিক বাণিজ্যপ্রবাহে কিছু রদবদল হবে। আমেরিকার রিফাইনারিগুলো বাড়তি কিছু ব্যারেল লুফে নেবে, ২০১০-এর দশকের শুরুতে তারা দৈনিক ৫ লক্ষ ব্যারেল বেশি আমদানি করত। ভেনেজুয়েলার কাছ থেকে দীর্ঘদিন সুবিধাজনক শর্তে তেল কেনা কিউবা সাহায্যের জন্য মেক্সিকো ও রাশিয়ার দিকে তাকাবে। চীনের তথাকথিত “টিপট” রিফাইনারিগুলো, যারা আগে সুবিধাজনক দরে ভেনেজুয়েলার অধিকাংশ তেল কিনত, এই বাণিজ্য থেকে বাদ পড়তে পারে; এমনকি চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানিগুলোও সেখানে নিজেদের উপস্থিতি কমাতে পারে।
এসব পরিবর্তন আদৌ যদি ঘটে বাণিজ্যিক ও ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে আমেরিকার কিছুটা লাভ হলেও হতে পারে।শকিন্তু তা সীমিত পরিসরেই। আরও বড় কিছু, যেমন ভেনেজুয়েলার উৎপাদনকে ফের দৈনিক ২৫–৩০ লক্ষ ব্যারেলে তোলা (যা ২০১০-এর দশকের শেষ দিকে ছিল এবং আজ কুয়েত যতটা তেল তোলে) তা দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প বলেই মনে করেন রিস্টাড এনার্জির জর্জে লেওন। মাদুরোকে ধরে আনা ছিল ট্রাম্পের এক ঝটিকা, নাটকীয় সাফল্য। কিন্তু তার অর্থনৈতিক সুফল আসবে ধীরে—আর মোটেই ততটা চমকপ্রদ নয়।