বাংলাস্ফিয়ার: ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে তাঁর সামরিক অভিযানের মাধ্যমে তাঁর কোন মহৎ উদ্দেশ্যটি সাধিত হবে—এই প্রশ্ন উঠলে ডোনাল্ড ট্রাম্প এতদিন ধরে কেবল অস্পষ্ট উত্তরই দিতেন। কখনও বলতেন, অবৈধ অভিবাসী আর অপরাধীদের যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকা ঠেকানোই উদ্দেশ্য। কখনও দাবি করতেন, ভেনেজুয়েলা থেকে মাদক পাচার বন্ধ করাই মূল লক্ষ্য। আবার শেষের দিকে বলতে শুরু করেন, বহু দশক আগে জাতীয়করণ করা ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ—যেমনটা বহু দেশই করেছিল—সেগুলি “ফিরিয়ে আনা” দরকার। খুব কমই, প্রায় কখনওই তিনি শাসন পরিবর্তনের কথা সরাসরি উচ্চারণ করেননি। সম্ভবত কারণটা তিনি জানতেন—মুসলিম বিশ্বে কয়েক দশক ধরে চলা ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’-এর অভিজ্ঞতার পরে তাঁর রাজনৈতিক সমর্থকেরা আর কোনও নতুন বিদেশি জটিলতায় জড়াতে আগ্রহী নন।
কিন্তু ৩ জানুয়ারি ভোররাতে, মার্কিন বিশেষ বাহিনীর এক নাটকীয় অভিযানে ভেনেজুয়েলার শক্তিমান শাসক নিকোলাস মাদুরোকে পাকড়াও করার পর, ট্রাম্প হঠাৎ করেই লাতিন আমেরিকায় মার্কিন শক্তির ব্যবহার নিয়ে এক বিস্ময়কর দৃষ্টিভঙ্গি সামনে আনলেন—যার নাম তিনি নিজেই দিলেন “ডনরো নীতি”। তাঁর বক্তব্য ছিল স্পষ্ট ও নির্দয়। বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলভান্ডারের অধিকারী একটি দেশকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই “চালাবে”—প্রয়োজনে মাটিতে সেনা নামিয়েই। আমেরিকার বৃহত্তম কর্পোরেশনগুলি সেখানে ঢুকে বিপুল পরিমাণ সম্পদ হস্তগত করবে—যা নাকি আমেরিকান ও ভেনেজুয়েলাবাসী, উভয়েরই সমৃদ্ধির জন্য।
ট্রাম্পের প্রয়োজনে ভেনেজুয়েলার গণতন্ত্রকে তাঁর ফৌজের জ্যাকবুটের তলায় মাথা নত করতেই হবে। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনে জয় ছিনিয়ে নেওয়া বিরোধী নেত্রী ও নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত মারিয়া কোরিনা মাচাদোর জন্য আপাতত কোনও ভূমিকাই থাকছে না—এ কথা ট্রাম্প কার্যত স্পষ্ট করে দিলেন। বরং তাঁর দাবি, মাদুরোর মনোনীত উপরাষ্ট্রপতি ডেলসি রদ্রিগেজ নতুন মার্কিন কর্তাদের সঙ্গে সহযোগিতা করবেন—যদিও রদ্রিগেজ নিজে এই দাবি প্রকাশ্যে অস্বীকার করেছেন। অঞ্চলটির অন্যান্য দেশ—মেক্সিকোর মতো মিত্র হোক বা কিউবার মতো প্রতিদ্বন্দ্বী—সবাইকে কার্যত জানিয়ে দেওয়া হল: আমেরিকার সঙ্গে সহযোগিতা করুন, নইলে তার পরিণতি ভোগ করুন। কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোকে, যাঁর বিরুদ্ধে ট্রাম্প অভিযোগ করেন যে তিনি “কোকেন তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠান”, হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হল—তাঁকে নিজের পিঠ সামলে চলতে হবে।
ট্রাম্প বললেন, যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরে ঊনিশ শতকের মনরো নীতি কার্যকর করতে ভুলে গিয়েছিল—যে নীতির লক্ষ্য ছিল লাতিন আমেরিকাকে বাইরের শক্তির প্রভাবমুক্ত রাখা। এখন থেকে আর তা হবে না। তাঁর ঘোষণা, “পশ্চিম গোলার্ধে আমেরিকার আধিপত্য আর কখনও প্রশ্নের মুখে পড়বে না। এটা আর কখনও হবে না।”
মাদুরোকে গ্রেপ্তারের এই অভিযানটি ঘটল ঠিক ৩৬ বছর আগে পানামার স্বৈরশাসক ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে গ্রেপ্তারের দিনেই—যেটি ছিল লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের শেষ সরাসরি শাসন পরিবর্তনের অভিযান। মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস একটি সুরক্ষিত কক্ষে পালানোর আগেই ধরা পড়েন এবং দ্রুত তাঁদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয় উভচর যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস আইও জিমায়। সেখান থেকেই নিউইয়র্কে বিচারের প্রস্তুতি—মাদক পাচার ও অন্যান্য অপরাধের অভিযোগে।

Captured Maduro
এই আকাশপথে চালানো অভিযানের সাফল্য এবং ‘পলাতক’ মাদুরোর বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ—এই দুই বিষয় সম্ভবত রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্যদের আশঙ্কা অনেকটাই প্রশমিত করবে। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ মনে করছিলেন, ভেনেজুয়েলায় এই হস্তক্ষেপ যুদ্ধক্ষমতা আইন লঙ্ঘন করছে, যে আইন প্রেসিডেন্টের কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া বিদেশে যুদ্ধ চালানোর ক্ষমতা সীমিত করে। ডেমোক্র্যাটরা অবশ্য এই অভিযানে সরাসরি বেআইনির তকমা সেঁটেছেন।
বামপন্থী লাতিন আমেরিকান সরকারগুলি—বিশেষ করে ব্রাজিল—জাতিসংঘ সনদ লঙ্ঘনের বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ডানপন্থীরা উল্টো সুরে কথা বলেছে। আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই এই অভিযানের প্রশংসা করে বলেছেন, এটি “মুক্ত বিশ্বের জন্য অসাধারণ খবর”। ইউরোপের বহু নেতা ইতিমধ্যেই স্থিতিশীলতার আবেদন জানিয়েছেন।
মার্কিন পররাষ্ট্রসচিব মার্কো রুবিওর কাছে মাদুরোর অপসারণ সবসময়ই একটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ ছিল—ক্যারিবীয় অঞ্চলের সবচেয়ে ধনী বামপন্থী শাসনব্যবস্থাটিকে ভেঙে দেওয়া, যাতে নিকারাগুয়া ও কিউবার মতো দেশগুলি সস্তা ভেনেজুয়েলান তেলের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয় এবং একই সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিকে অঞ্চলটি থেকে হটানো যায়।এই অভিযানের পরে ভেনেজুয়েলা আর কিউবাকে সস্তার তেল দিতে পারবেনা বলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন।
এতদিন পর্যন্ত এসব কথা প্রশাসনের তরফে কেবল ইঙ্গিতে বলা হত। নভেম্বর মাসে প্রকাশিত জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত ঘোষণায় শুধু বলা হয়েছিল, “পশ্চিম গোলার্ধে আমেরিকার কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হবে।” এখন ‘অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজ়লভ’-এর মাধ্যমে তা প্রকাশ্যে এল নির্দ্বিধায়।
ট্রাম্প প্রশাসন আপাতত সরাসরি সামরিক দখলের বদলে ডেলসি রদ্রিগেজের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে ভেনেজুয়েলা চালানোর আশা করছে—যেমনটা আফগানিস্তান ও ইরাকে সরাসরি দখলের মাধ্যমে করেছিল এবং যার ফল সুখকর হয়নি। রুবিও তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন এবং ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, “তিনি মূলত আমাদের যা প্রয়োজন, তাই করতে রাজি—ভেনেজুয়েলাকে আবার মহান করে তুলতে।” কিন্তু রদ্রিগেজ সম্পূর্ণ ভিন্ন সুরে কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, ভেনেজুয়েলা “কারও উপনিবেশ হবে না”, এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনকারী “একটি ভয়াবহ নৃশংসতা” বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং মাদুরোর মুক্তির দাবি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে মারিয়া কোরিনা মাচাদো বলেছেন, নির্বাচিত বিরোধীরা “আমাদের জনসমর্থনের ম্যান্ডেট কার্যকর করতে এবং ক্ষমতা দখল করতে প্রস্তুত।” কিন্তু ট্রাম্পের সমর্থন ছিল নিতান্তই ঠান্ডা। তিনি বলেন, “ওঁর পক্ষে নেতা হওয়া খুব কঠিন,” এবং দাবি করেন যে মাচাদোর দেশে যথেষ্ট সমর্থন বা সম্মান নেই। একেবারেই ট্রাম্পের মনগড়া ভাষ্য যা বাস্তবসম্মত নয়। আর্মি ওয়ার কলেজের বিশেষজ্ঞ ইভান এলিস বলেন, বিরোধী নেতৃত্বকে এভাবে উড়িয়ে দেওয়ায় বহু মার্কিন বিশেষজ্ঞ “হতবাক”। মায়ামিতে উদযাপনরত বহু ভেনেজুয়েলান বিশ্বাসই করতে পারেননি, ট্রাম্প একথা বলছেন। তাঁদের মনে হয়েছে হয়ত তাঁরা শুনতে ভুল করেছেন।
মার্কিন সেনাকে কি দীর্ঘদিন ভেনেজুয়েলায় থাকতে হবে—এই প্রশ্নের উত্তরে ট্রাম্প বলেন, “প্রয়োজনে মাটিতে সেনা নামাতে আমরা ভয় পাই না।” তবে তিনি ইঙ্গিত দেন, আমেরিকার উপস্থিতি হয়তো মূলত তেলশিল্প সুরক্ষাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে। “আমরা এটা ঠিকভাবে চালাব, পেশাদারভাবে চালাব। বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল কোম্পানিগুলো সেখানে গিয়ে শত শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে,” বলেন তিনি। ভেনেজুয়েলায় আমেরিকার প্রশাসনের কোনও সময়সীমাও তিনি নির্দিষ্ট করেননি—শুধু বলেছেন, যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন করতে চান।
সব মিলিয়ে এটি তাঁর প্রশাসনের বিদেশে হস্তক্ষেপ না করার নীতির সম্পূর্ণ উল্টো ছবি। গত জুন মাসে ট্রাম্প ইরানের পরমাণু কেন্দ্রে বোমা ফেললেও দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেননি।অন্তত এ সপ্তাহ পর্যন্ত, যখন তিনি হুঁশিয়ারি দেন যে ইরানের মোল্লাতন্ত্র যদি সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা চালায় চালায়, তবে আমেরিকা ফের আরও সামরিক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে। ওয়াশিংটনের বিশেষজ্ঞ রায়ান বার্গের মতে, ট্রাম্প পশ্চিম গোলার্ধকে দেখেন ভিন্ন চোখে—এটি তাঁর কাছে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’-এরই এক সম্প্রসারণ।
তবে ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনী ও মিলিশিয়ারা যদি প্রতিরোধে নামে—যেমনটা রদ্রিগেজ ও অন্য নেতারা প্রকাশ্যে বলেছেন—তাহলে ট্রাম্প কীভাবে দেশটি নিয়ন্ত্রণে রাখবেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়। অনেক কিছুই নির্ভর করছে ক্ষমতাসীন শিবিরের ভেতরের শক্তির ভারসাম্যের ওপর। মাদুরোকে যেভাবে দ্রুত দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, তাতে স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে যে প্রশাসনের অভ্যন্তরে উচ্চপর্যায়ের কেউ গোপনে সহযোগিতা করেছিলেন—সম্ভবত ভবিষ্যতের কোনও সমঝোতার আশায়, অথবা মাদুরোর গ্রেফতারের জন্য ঘোষিত পাঁচ কোটি ডলারের পুরস্কারের লোভে।
ট্রাম্প ইতিমধ্যেই দেখিয়ে দিয়েছেন তাঁর বাহিনী কী করতে পারে। কারাকাসে ক্ষমতার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামা রদ্রিগেজ ও অন্যরা এখন জানেন—তাঁরা যতই প্রতিপক্ষকে হারান না কেন, মার্কিন শক্তির খাঁড়া তাদের মাথার উপরেই ঝুলে থাকবে। ট্রাম্পের ভাষায়, “ভেনেজুয়েলার সব রাজনৈতিক ও সামরিক নেতার বোঝা উচিত—মাদুরোর সঙ্গে যা হয়েছে, তা তাদের সঙ্গেও হতে পারে। যদি তারা ন্যায়সঙ্গত না হয়, সৎ না হয়, নিজেদের জনগণের প্রতি ন্যায্য না হয়—তাহলে তা হবেই।”
ভেনেজুয়েলার জনগণের উদ্দেশে তিনি বলেন, “স্বৈরাচারী ও সন্ত্রাসী মাদুরো অবশেষে বিদায় নিয়েছে। মানুষ এখন মুক্ত—তারা আবার মুক্ত।” কিন্তু সেই মুক্তি কতটা বাস্তব, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। কারণ তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী ভেনেজুয়েলা দৈনন্দিনভাবে শাসিত হবে একজন প্রবীণ চাভিস্তা নেতার হাতে, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেতৃত্বকে বাইরে রেখে, আর দেশের সম্পদ থাকবে আমেরিকান কর্পোরেশনগুলোর নিয়ন্ত্রণে।