যে সমাজ সত্যকে হারায়, সে মিথ্যার পায়ে নতজানু হয়—এ এক অনন্ত সূত্র, যা ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে। সমাজ তার নায়ক বা দেবতার রূপে আসলে নিজেকেই প্রতিফলিত করে। যে জাতি তার সত্যিকারের মহত্ত্বের প্রতিমা গড়ে তুলতে জানে, সে তার সংস্কৃতি, বিবেক ও মানবিক শক্তিকে অক্ষুণ্ণ রাখে। কিন্তু যে জাতি তার আসল চরিত্র হারিয়ে ফেলে, সে গড়ে তোলে মিথ্যা দেবতা—দ্যুতিময়, কিন্তু ভিতরে শূন্য। একটি সমাজ কাকে পূজা করছে, তা-ই বলে দেয় সে আসলে কেমন হতে চায়, কিংবা কতটা ভয় পায় নিজের বাস্তবতাকে। এক সময় সক্রেটিস এথেনিয়ানদের সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, “আমি তোমাদের মধ্যে এক গাডফ্লাই—তোমাদের ঘুম ভাঙাতে এসেছি।” কিন্তু সেই সমাজ, যা অস্বস্তিকর সত্যকে সহ্য করতে পারে না, সেই সমাজই শেষ পর্যন্ত সক্রেটিসকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ইতিহাসের এই ঘটনার ভেতরেই লুকিয়ে আছে সভ্যতার এক চিরন্তন রোগ—সত্যের প্রতি ঘৃণা এবং মিথ্যার প্রতি ভক্তি।
যে সমাজের ভিত দুর্বল, তার কাছে সত্য বিপজ্জনক। কারণ সত্য প্রশ্ন তোলে, ভয় জাগায়, স্বপ্ন ভাঙে। মিথ্যা কিন্তু শান্ত করে, সান্ত্বনা দেয়, একতা তৈরি করে—যদিও সেটি ছদ্ম একতা। এ কারণেই মিথ্যা আইকনরা জনপ্রিয় হয়: তারা সমাজকে সত্যের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেয়। রাজনীতি, ধর্ম, বিনোদন—সব ক্ষেত্রেই মানুষ এমন মুখ খোঁজে যাকে সে নিরঙ্কুশভাবে ভালোবাসতে পারে, যাকে প্রশ্ন করতে হবে না। ফলে, ব্যক্তি-গঠিত পূজার স্থান নেয় সামষ্টিক আত্মসমর্পণ।
প্রাচীন রোমে মানুষ সাম্রাজ্যের পতনের মধ্যেও সম্রাটদের দেবতা বলে মানত। অক্টাভিয়ান অগাস্টাসের পর থেকে প্রায় প্রতিটি সম্রাটই নিজেকে ঈশ্বর বলে দাবি করত, আর প্রজারা তাকে পূজা করত। যখন সাম্রাজ্যের নৈতিকতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল, তখন তাদের দেবতার সংখ্যা বেড়েই চলেছিল। ইতিহাসবিদ এডওয়ার্ড গিবন এই প্রবণতাকে “civilisation’s comedy of idolatry” বলেছেন—যেখানে মানুষ নিজের পতনকে উৎসবে রূপ দেয়। আধুনিক যুগেও পার্থক্যটা কেবল পোশাকে। আজ দেবতারা মুকুট পরেন না, বরং স্যুট বা ইউনিফর্মে, কিংবা হীরার গয়না আর মেকআপে। তবু তাদের সামনে সমাজ একইভাবে মাথা নোয়ায়। মিথ্যা আইকনের পূজা আসলে এক মানসিক ব্যাধি, যার নাম আত্মবিস্মৃতি।
নৈতিকভাবে এটি সমাজের অবনমনের চূড়ান্ত লক্ষণ। নীতিহীনতা কখনও কেবল অপরাধের বৃদ্ধি নয়; তা হলো এমন এক অবস্থা যেখানে মানুষ আর ভালো-মন্দের পার্থক্য করতেই চায় না। একদা গ্রিক দার্শনিক এপিকটিটাস বলেছিলেন, “যে নিজের বিবেককে পরিত্যাগ করেছে, সে আর কিছু হারানোর ভয় পায় না।” মিথ্যা আইকনের ভক্তরাও তাই—তারা নিজের নৈতিক শক্তিকে বিলিয়ে দিয়েছে অন্যের হাতে। এই আত্মসমর্পণের মধ্যে রয়েছে স্বস্তি, এক ধরনের অলস শান্তি। সত্যিকারের চিন্তা, আত্মসমালোচনা, নৈতিক দায়বোধ—সবকিছুই তখন ক্লান্তিকর মনে হয়। সুতরাং সহজ বিকল্প: কোনও উজ্জ্বল মুখ, কোনও জোরালো কণ্ঠ, কোনও প্রচারের দেবতা—যার দিকে তাকিয়ে মানুষ ভাবে, “এই তো আমাদের মুক্তি।”
একজন নেতা যখন জাতির বিবেকের বদলে তার প্রতীক হয়ে ওঠেন, তখন গণতন্ত্র আর থাকে না, থাকে জনমনোরঞ্জন। হিটলারকে জার্মানির ভাঙা আত্মবিশ্বাস উদ্ধার করতে হয়েছিল; তিনি বলেছিলেন, “আমি তোমাদের রক্ত, আমি তোমাদের জাতির আত্মা।” সেই আত্মার প্রতিফলন ছিল মিথ্যা, কিন্তু তা মানুষকে মাতাল করেছিল। গোয়েবলস লিখেছিলেন, “একটি মিথ্যা যদি শতবার বলা যায়, তা-ই সত্য।” আর জনগণ যদি বিশ্বাস করতে চায়, তাহলে যুক্তি আর প্রমাণের প্রয়োজনই থাকে না। মিথ্যা আইকনের পূজা এমনই এক বিন্দুতে পৌঁছয়, যেখানে সত্যের মৃত্যুই আনন্দ দেয়।
একই দৃশ্য আমরা দেখি আধুনিক সমাজে—যেখানে সামাজিক মাধ্যমের পর্দা নতুন মন্দির। প্রতিদিনই নতুন দেবতার জন্ম হয়, নতুন উন্মাদনা, নতুন হ্যাশট্যাগ। কিন্তু এই অগণিত মিথ্যা দেবতার মধ্যে সমাজ নিজের পরিচয় হারায়। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, এই প্রবণতার মূল হলো “emotional projection”—মানুষ নিজের অপূর্ণতা, হীনমন্যতা, ভয়কে অন্যের গুণে রূপান্তর করে। ফলে সে এমন কাউকে পূজা করে, যিনি তার সবকিছু হতে পারেন—যা সে হতে পারে না। এরিক ফ্রম তাঁর বিখ্যাত বই Escape from Freedom-এ বলেছিলেন, “স্বাধীনতার বোঝা মানুষ বইতে পারে না, তাই সে নেতার শাসনে আশ্রয় খোঁজে।” স্বাধীনতা মানে দায়িত্ব, আর দায়িত্ব মানে আত্মসমালোচনা—যা অনেকের পক্ষেই অসহনীয়। তাই মিথ্যা আইকনের শাসন মানুষকে আরাম দেয়; সেখানে চিন্তার প্রয়োজন নেই, শুধু বিশ্বাসের।
এই বিশ্বাসের কাঠামো সমাজতাত্ত্বিকভাবে একটি “collective neurosis”। সমাজবিজ্ঞানী দুরখেইম যেভাবে anomie ধারণা দিয়েছিলেন, সেটাই এখানে প্রযোজ্য। যখন মূল্যবোধ ভেঙে পড়ে, যখন ধর্ম, শিক্ষা, ন্যায়বিচার বা পরিবার—সব প্রতিষ্ঠানের উপর মানুষের আস্থা হারিয়ে যায়, তখন সেই শূন্যতা পূরণ করতে আসে মিথ্যা প্রতীক। কেউ বলেন, “দেশ বাঁচাও”, কেউ বলেন, “ধর্ম রক্ষা করো”, কেউ বলেন, “ব্র্যান্ড ফলো করো”—সবই এক। উদ্দেশ্য একই: শূন্য মনকে দিক দেখানো, যদিও সেই দিক মরুভূমির দিকে।
দার্শনিক হান্না অ্যারেন্ট The Origins of Totalitarianism-এ লিখেছিলেন, “যখন সত্য আর মিথ্যার পার্থক্য বিলুপ্ত হয়, তখন মানুষ কেবল অনুভব করে—জানে না।” এই অনুভূতিই মিথ্যা আইকনের খাদ্য। তাদের শক্তি তথ্য নয়, আবেগ। তারা যুক্তি নয়, অনুভূতির রাজনীতি করে। যে সমাজ এমন রাজনীতিকে পুরস্কার দেয়, সে আর গণতান্ত্রিক নয়, সে ‘ইমোশনাল ডিক্টেটরশিপ’-এর বন্দী।
ঐতিহাসিকভাবে আমরা দেখি—রোমের গ্ল্যাডিয়েটর, ফ্রান্সের নেপোলিয়ন, সোভিয়েতের স্তালিন, আমেরিকার ম্যাকারথি, কিংবা আমাদের সময়ের ট্রাম্প, মোদি, এরদোয়ান—সবাই এক সূত্রে গাঁথা। এরা এমন এক সময়ে এসেছে যখন সমাজ ক্লান্ত, অনিশ্চিত, নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিভ্রান্ত। জনগণ তখন শক্তি চায়, গরিমা চায়, অলৌকিক উদ্ধার চায়। সেই আকাঙ্ক্ষা থেকেই তৈরি হয় মিথ্যা নায়ক—যিনি তাদের বলে দেন, “তোমরা বিশেষ”, “তোমাদের শত্রু আছে”, “আমি তোমাদের রক্ষা করব।” এই তিনটি বাক্যই প্রতিটি স্বৈরাচারের মূল মন্ত্র।
একজন ফরাসি চিন্তাবিদ রেমোঁ অ্যারঁ লিখেছিলেন, “যখন মানুষ চিন্তা বন্ধ করে, তখন সে মিথ্যার কবলে পড়ে।” এ কারণেই শিক্ষা, যুক্তিবোধ, ও স্বাধীন মতামতের সংস্কৃতি একটি সমাজের আত্মরক্ষার প্রাচীর। কিন্তু যেখানে শিক্ষাকে তুচ্ছ করা হয়, সেখানে আইকন-পূজা ধর্মে পরিণত হয়। ভারতের সামাজিক বাস্তবতাও তার উদাহরণ—যেখানে রাজনীতি, ধর্ম, খেলাধুলা ও বিনোদন একত্রে এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ তৈরি করেছে। চলচ্চিত্র নায়ক রাজনীতিবিদ হন, ধর্মীয় নেতা ব্যবসায়ী হন, আর ব্যবসায়ীরা জাতির মুক্তিদাতা সেজে ওঠেন। এই মিলনের ফল হলো বিভ্রান্তির গণতন্ত্র—যেখানে মানুষ জানে না কাকে প্রশ্ন করবে, কারণ প্রত্যেকে কারও না কারও দেবতা।
মনস্তাত্ত্বিকভাবে এই অবস্থাকে বলা যায় “collective infantilism”—অর্থাৎ সমাজ শিশুসম হয়ে পড়েছে। সে সহজ উত্তর চায়, সহজ শত্রু চায়, সহজ নায়ক চায়। কার্ল ইয়ুং বলেছিলেন, “যে সমাজ নিজের ছায়াকে অস্বীকার করে, সেই সমাজ জীবন্মৃত।” ফলে সমাজ নিজের অন্তরের অন্ধকারকে এক ব্যক্তির শরীরে ঢেলে দেয়—কখনও তাকে শত্রু বানায়, কখনও ত্রাণকর্তা। এই দুইয়ের মধ্যে দোল খায় জনমন। একদিকে ঘৃণা, অন্যদিকে ভক্তি—দুয়েরই উৎস হলো নিরাপত্তার অভাববোধ।।
এই অনিরাপত্তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো প্রচার। গোয়েবলসের কথাই যথেষ্ট: “প্রচারের উদ্দেশ্য সত্য খোঁজা নয়, বিশ্বাস সৃষ্টি করা।” আজকের যুগে প্রচার নতুন রূপে বেঁচে আছে—অ্যালগরিদম, রিল, হ্যাশট্যাগ, কৃত্রিম জনপ্রিয়তা। সত্য সেখানে পরিসংখ্যান নয়, অনুভূতির পণ্য। ফলত সমাজ যখন মিথ্যা আইকনের প্রতি আকৃষ্ট হয়, তখন আসলে সে নিজের প্রযুক্তিগত কাঠামোরই দাসত্ব মেনে নিচ্ছে।
ফরাসি সমাজতাত্ত্বিক বোর্দিয়ে বলেছেন, “দৃশ্যমানতা আজকের যুগের পুঁজি।” অর্থাৎ যে দৃশ্যমান, তিনিই গুরুত্বপূর্ণ। এই নীতিই মিথ্যা আইকনদের ভিত্তি। তারা জানে, মানুষের চোখকেই দখল করতে হবে। তাই তারা স্লোগান বানায়, নাটক সাজায়, রঙিন মঞ্চে দাঁড়ায়। একসময় সত্যের মর্যাদা ছিল ‘বাক্যে’; এখন তা ‘ব্র্যান্ডে’। নৈতিকতার পরিবর্তে এসেছে মার্কেটিং।
কিন্তু ইতিহাস বলে, প্রতিটি মিথ্যা দেবতার পতন অনিবার্য। রোম ভেঙেছে, তৃতীয় রাইখ ধ্বংস হয়েছে, সোভিয়েত সাম্রাজ্য ভেঙে পড়েছে, কারণ তারা নিজেদের মিথ্যার ভার বইতে পারেনি। মিথ্যা আইকনের পতনের আগে সমাজে আসে এক ধরনের ক্লান্তি, এক ধরনের চুপচাপ বিরক্তি। মানুষ তখন আর তালি দেয় না, হাসে। আর সেই হাসিই শেষ সংকেত।
তবু ইতিহাসের শিক্ষা মানুষ ভুলে যায়, কারণ প্রতিটি যুগ নিজের মিথ্যা সৃষ্টি করে নতুন নামে। আজকের মানুষ ভাবে, তার মিথ্যা ‘আধুনিক’, ‘দেশপ্রেমিক’, ‘সাংস্কৃতিক’। কিন্তু সত্য কখনও পুরনো হয় না। যেমন মার্ক টোয়েন বলেছিলেন, “মিথ্যা পৃথিবীর অর্ধেক ঘুরে আসে, যতক্ষণে সত্য জুতো পরে।” সমাজ সেই মিথ্যার গতির চোরাবালিতে বন্দী।
একটি সমাজের আত্মা মাপা যায় তার প্রতিমার চোখে। যদি সেই চোখে থাকে করুণা, চিন্তা, মানবিকতা, তবে সমাজ সুস্থ। যদি সেখানে থাকে অহংকার, ক্রোধ ও আড়ম্বর, তবে বোঝা যায়, সমাজ আত্মবিস্মৃত। মিথ্যা আইকনের পূজা তাই কেবল অন্যায় নয়, আত্মহত্যা।
থমাস কার্লাইলের সেই উক্তি আবার স্মরণ করি—“আমাকে বলো কাকে তোমরা পূজা করো, আমি বলে দেব তোমরা কে।” আমরা আজ যাদের পূজা করি, তারা কি সত্যিই আমাদের উচ্চতার প্রতীক, না আমাদের হীনতার প্রতিচ্ছবি? যে সমাজ মিথ্যা আইকনের সামনে মাথা নোয়ায়, সে নিজের বিবেককে হত্যা করে আনন্দিত হয়। কারণ সত্য তাকে অস্বস্তিকর করে তোলে, কিন্তু মিথ্যা তাকে গর্বিত করে। এই গর্বই তার বিষ।
মিথ্যা আইকনের পূজা কোনও ধর্ম নয়, এটি আত্মার শোকসভা। যে সমাজ নিজেকে সম্মান করতে ভুলে গেছে, সে অন্যের মুখে নিজের দেবতা খোঁজে। আর যখন দেবতা পড়ে যায়, সমাজ বলে—“আমাদের বিশ্বাস ভেঙে গেল।” আসলে বিশ্বাস ভাঙে না; ভাঙে বুদ্ধি। আর বুদ্ধিহীন বিশ্বাসই মিথ্যার চিরন্তন মন্দির।
যে সমাজ এই মন্দিরে প্রতিদিন প্রদীপ জ্বালে, সে একদিন দেখবে—তার নিজের আলো নিভে গেছে।
ইতিহাসের আয়না খুলে যদি দেখা যায়, প্রতিটি সভ্যতার পতনের আগে একবার করে তার নায়করা দেবতা হয়ে উঠেছিলেন। রোমের শেষ দিককার সম্রাটেরা আর শাসক ছিলেন না, তারা ছিলেন প্রতীক—তাদের পোশাক, স্থাপত্য, উৎসব, মঞ্চ, সবকিছুই এক প্রদর্শনী। যে জনগণ আগে রিপাবলিকের স্বাধীনতার জন্য লড়েছিল, সেই জনগণ শেষদিকে “ব্রেড অ্যান্ড সার্কাস”—রুটি ও প্রদর্শনী—এই দুইয়ের বিনিময়ে বিবেক বিক্রি করেছিল। জুভেনালের ব্যঙ্গোক্তি “Panem et circenses” শুধু ব্যঙ্গ নয়, সভ্যতার সারসংক্ষেপ। এক সময়ের বীর রোমান নাগরিক তখন আর নাগরিক ছিল না, সে দর্শক হয়ে গিয়েছিল। আধুনিক সমাজও সেই একই দর্শক সমাজ—যেখানে জনগণ নাটক দেখে, তাতে অংশ নেয় না।
এই দর্শককুল মিথ্যা আইকনের প্রথম শর্ত। যতক্ষণ সমাজ সক্রিয় থাকে, সে প্রশ্ন করে, সে নিজেকে যাচাই করে; কিন্তু যখন সে দর্শক হয়ে যায়, তখন সে অন্যের বেঁচে থাকাকে নিজের বেঁচে থাকা বলে ধরে নেয়। মঞ্চে নায়ক মরলে সে কাঁদে, জিতলে উল্লাস করে, কিন্তু নিজের জীবন নিস্তরঙ্গ থাকে। রাজনীতি, মিডিয়া, বিনোদন—সব মিলে আজকের মানুষ সেই দর্শক, যে পর্দার সামনে দাঁড়িয়ে ভাবে, সে ইতিহাসের অংশ, অথচ সে কেবল ক্রেতা।
অন্যভাবে একে কেউ কেউ আবার এই সমাজের নাম দিয়েছে “Specracle Society”—একটি সমাজ যেখানে সবকিছুই প্রদর্শনী, এমনকি প্রতিবাদও। কোনও সামাজিক আন্দোলনই এখন পুরোপুরি বিশুদ্ধ নয়; সেটিও মিডিয়া কাভারেজ, হ্যাশট্যাগ, ব্র্যান্ড ইমেজের উপর নির্ভরশীল। ফলে মিথ্যা আইকনের পতন ঘটলেও, তার জায়গায় নতুন আইকন তৈরি হয়, কারণ সমাজের দর্শক মানসিকতা বদলায় না।
একইভাবে দেখুন জার্মানির ইতিহাস। ১৯২০-এর দশকে এক ভগ্ন, অর্থনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত জাতি—যারা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর পরাজয়ের অপমান বয়ে বেড়াচ্ছিল—তারা হিটলারের মুখে শুনল এক অপরিচিত জাদুকরী ভাষা: “আমি তোমাদের হারানো গরিমা ফিরিয়ে দেব।” এই বাক্যেই ছিল মিথ্যা আইকনের জন্ম। মানুষ সেই প্রতিশ্রুতিকে ভালোবেসেছিল, কারণ তাতে ছিল গর্বের মরীচিকা। ইতিহাস সাক্ষী, এই গর্বের মূল্য ছিল ছয় কোটি প্রাণ, এবং এক জাতির আত্মার চিরন্তন কলঙ্ক। তবু মিথ্যা তখনও দেবতা, কারণ তা ছিল সান্ত্বনা।
গোয়েবলস বলেছিলেন, “প্রচার কখনও যুক্তি দিয়ে কাজ করে না, কাজ করে অনুভূতির মাধ্যমে।” এই অনুভূতির রাজনীতিই এখন বিশ্বের প্রতিটি দেশে নতুন রূপে ফিরে এসেছে—নামের পরিবর্তন ঘটেছে, কিন্তু গঠন একই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প, রাশিয়ার পুতিন, তুরস্কের এরদোয়ান, ভারতের সমসাময়িক রাজনীতিও এই ধারারই অংশ। প্রত্যেকেই জনগণকে দিয়েছে এক অলৌকিকতা—জাতীয় গৌরব, অতীতের মহিমা, বাহ্যিক শত্রুর বিরুদ্ধে ঐক্য। এগুলো সবই কল্পিত কাহিনি, কিন্তু সমাজ সেই কাহিনিকে বাস্তবের চেয়ে সত্য মনে করে।
এই প্রবণতা শুধু রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। ধর্মও ক্রমে পরিণত হয়েছে সামাজিক প্রদর্শনীতে। আগে ধর্ম ছিল আত্মজিজ্ঞাসার পথ, এখন তা হয়ে উঠেছে পরিচয়ের অস্ত্র। মন্দির, মসজিদ, গির্জা—সবই এখন টেলিভিশনের প্রেক্ষাগৃহ, যেখানে বিশ্বাস নয়, দৃশ্যের প্রতিযোগিতা চলে। ধর্মীয় নেতারা হয়ে উঠেছেন সেলিব্রিটি, তাঁদের কণ্ঠে প্রচার নয়, শোনা যায় প্ররোচনা। সমাজ সেই প্ররোচনায় মাতোয়ারা হয়, কারণ সেটি তাকে বৈধতা দেয়। মিথ্যা আইকনের ধর্ম এইভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয়—যেখানে সত্য অপ্রয়োজনীয়, বিশ্বাসই পূর্ণতা।
সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাসও মিথ্যা আইকনের ক্লাসিক উদাহরণ। স্তালিন এমন এক দেশ তৈরি করেছিলেন যেখানে সত্য লুকিয়ে রাখতে হত রাষ্ট্রীয় আদেশে। সংবাদপত্রে প্রকাশ পেত কেবল যা অনুমোদিত। মানুষ জানত যে তা মিথ্যা, তবু প্রতিবাদ করত না, কারণ সবাই একসঙ্গে বিশ্বাস করলে মিথ্যা আর মিথ্যা থাকে না। এই সমবেত জেনেও না জানার ভানই সমাজকে টিকিয়ে রাখত। শেষ পর্যন্ত যখন স্তালিন মারা গেলেন, মানুষ হঠাৎ খেয়াল করল—তারা কত বছর ধরে এক মৃত সত্যের প্রতি বিশ্বাস রেখেছিল। কিন্তু তার পরও তারা তাঁকে পূজা করে গেল, কারণ অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল দেবতা ছাড়া বাঁচতে না পারার।
আজকের পৃথিবীতে সেই স্তালিনতন্ত্র প্রযুক্তির রূপে ফিরে এসেছে। সামাজিক মাধ্যম এমনভাবে তৈরি হয়েছে যাতে মানুষ ক্রমাগত প্রতিক্রিয়া দেয়, কিন্তু কখনও চিন্তা করেনা। ক্রোধ, আনন্দ, ভয়—এই তিন আবেগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে সমকালীন মন। এই সীমাবদ্ধতাই মিথ্যা আইকনের শক্তি। অ্যালগরিদম জানে, মানুষ যা ভালোবাসে, সেটিই তাকে বারবার দেখাও; তাহলে সে কখনও সন্দেহ করবে না। এভাবে মিথ্যা আইকন হয়ে ওঠেন ডিজিটাল ঈশ্বর—অদৃশ্য, কিন্তু সর্বব্যাপী।
তবু ইতিহাসের গতি থেমে থাকে না। প্রতিটি মিথ্যা দেবতার পতনের সময় আসে। রোমে নিরোর আগুনের পর মানুষ বুঝেছিল, যে শিল্প-নাটক তারা দেখছিল, সেটি আসলে ধ্বংসের পূর্বাভাস। ফ্রান্সে ষোড়শ লুইয়ের রাজসভা যত বেশি বিলাসবহুল হয়েছিল, জনতা ততই ক্ষুধার্ত হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত গিলোটিনই তার পরিণতি হয়েছিল। স্তালিনের মৃত্যুর পর ‘ডি-স্তালিনাইজেশন’ যখন শুরু হলো, তখন রাশিয়ার লেখককুল—সোলঝেনিৎসিন, পাস্তেরনাক—যে সাহস দেখালেন, তা প্রমাণ করল, সত্য চিরকাল বেঁচে থাকে, কেবল তার মুখ ঢেকে রাখা হয়।
ভারতের ইতিহাসেও মিথ্যা আইকনের উত্থান ও পতন আছে। স্বাধীনতার পর যখন জনতা দেশগঠনের কঠিন বাস্তবতায় ক্লান্ত হয়ে পড়ল, তখনই শুরু হলো প্রতিমা-নির্ভর রাজনীতির যুগ। নেতা মানেই ত্রাণকর্তা, দল মানেই ধর্ম, সমালোচনা মানেই অপরাধ। এই সংস্কৃতি আজ গভীরভাবে প্রোথিত। যে সমাজ একসময় যুক্তি ও চিন্তার জন্য বিখ্যাত ছিল, আজ সে সামাজিক মাধ্যমে স্লোগানকে সত্য বলে গ্রহণ করে। বিশ্ববিদ্যালয় আর সত্যের অনুসন্ধান নয়, প্রমাণের মঞ্চ।
তবু সব শেষ নয়। কারণ ইতিহাসের প্রতিটি অন্ধকার যুগের পরই কিছু মানুষ আসেন যাঁরা মিথ্যার বিরুদ্ধে কথা বলেন, যদিও তাদের কণ্ঠ ক্ষীণ। তাঁরা হয়ে ওঠেন সমাজের বিবেক। যেমন গ্যালিলিও বলেছিলেন, “তবু পৃথিবী ঘুরছে।” এই ঘূর্ণনের মধ্যেই আশা। কারণ মিথ্যা আইকন যতই শক্তিশালী হোক, সত্যের একটিমাত্র বাক্যই তার রাজত্ব কাঁপিয়ে দিতে পারে।
নৈতিক পুনর্জাগরণ শুরু হয় এই বাক্য থেকেই। সমাজ তখন নিজের ভিতরের দুর্বলতাকে চিনতে শেখে। প্রথমে আসে লজ্জা, তারপর ক্রোধ, তারপর প্রশ্ন। প্রশ্নের জন্ম মানেই প্রতিরোধের শুরু। ইতিহাসে কোনও মিথ্যা দেবতা প্রশ্নকে দমিয়ে রাখতে রাখতে পারেনি। তাই সমাজ যদি সত্যিকারের মুক্তি চায়, তাকে আবার প্রশ্ন করতে শিখতে হবে—আমরা কেন বিশ্বাস করি, কাকে বিশ্বাস করি, আর বিশ্বাসের বিনিময়ে কী হারাই।
দার্শনিক নীৎশে বলেছিলেন, “যে দানবের সঙ্গে লড়বে, সে নিজেই যেন দানব না হয়ে যায়; কারণ যখন তুমি অতলে তাকাও, অতলও তোমার দিকে তাকায়।” মিথ্যা আইকনের বিরুদ্ধে লড়াইয়েও এই সতর্কতা প্রয়োজন। কারণ মিথ্যার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়ে সমাজ যেন নতুন মিথ্যা না বানায়। সত্যের সন্ধান মানে কেবল মিথ্যা ভাঙা নয়, আত্মপরিচয়ের পুনর্গঠন।
ভারতের পরম্পরায় এই আত্মজিজ্ঞাসার ঐতিহ্য ছিল গভীর। উপনিষদে মানুষ নিজেকে প্রশ্ন করত, “কে আমি?” এই প্রশ্নই সত্যের উৎস। রবীন্দ্রনাথ এই পরম্পরাকে আধুনিক অর্থে পুনর্জীবিত করেছিলেন। তাঁর কবিতায়, গানে, প্রবন্ধে বারবার ফিরে এসেছে সেই বোধ—“যেখানে মস্তিষ্ক ভয়হীন, যেখানে যুক্তি মাথা তুলে দাঁড়ায়।” কিন্তু আজকের সমাজ সেই প্রার্থনা ভুলে গেছে। এখন ভয়ই রাজনীতির জ্বালানি, আর যুক্তি মাথা নোয়ায় জনপ্রিয়তার সামনে।
কিন্তু ইতিহাস বলে, মানুষ শেষ পর্যন্ত জাগে। সেই জাগরণ কখনও হঠাৎ ঘটে না, ঘটে ধীরে—এক একজন লেখকের কলমে, শিল্পীর ক্যানভাসে, নাগরিকের প্রশ্নে। ছোট ছোট সত্যের কণিকাগুলো একসময় পাহাড় হয়ে ওঠে। যেমন এক সময় দক্ষিণ আফ্রিকায় নেলসন ম্যান্ডেলার কারাবাস ছিল নিঃশব্দ, পরে তা স্বাধীনতার প্রতীক হলো। সত্যের শিকড় যত গভীরে যায়, তত দেরিতে তার প্রকাশ পায়, কিন্তু ততই সে আগুনে পোড়া লোহার মতো স্থায়ী হয়।
এই কারণেই মিথ্যা আইকনের সমাজ যতই আড়ম্বরপূর্ণ হোক, সে ভেতরে ভেতরে শূন্য। তার মঞ্চ যত বড় হয়, তার আত্মা তত ক্ষুদ্র হয়। তার ভাষণ যত উচ্চকণ্ঠ, তার বিবেক তত নিঃশব্দ। সেই নিঃশব্দতার ভেতরই ইতিহাস নতুন ভাষা খোঁজে।
সমাজের আত্মমুক্তি শুরু হয় আত্মস্মরণ দিয়ে। মানুষকে আবার মনে করতে হবে, নায়ক বা দেবতা নয়, ধারণাই শ্রেষ্ঠ। যে সমাজ ধারণার প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে কোনও মিথ্যা নায়কের বন্দী হয় না। জার্মানির পুনর্জাগরণ হয়েছিল হিটলারের পতনের পর, কিন্তু সেই পুনর্জাগরণের চালিকাশক্তি ছিল চিন্তা—হান্না অ্যারেন্ট, আডর্নো, ব্রেখট। তারা মানুষকে শেখালেন, লজ্জা থেকেও আলো ফোটে।
আজ ভারতের, কিংবা যে কোনও জাতির জন্যও এই আত্মজাগরণ অপরিহার্য। সত্যিকার পরিবর্তন শুরু হয় তখনই, যখন সমাজ তার আইকনদের নয়, তার আদর্শকে বিচার করতে শেখে। যে সমাজ নেতার নাম উচ্চারণের চেয়ে ধারণার অর্থ বোঝায় বেশি আগ্রহী, সেই সমাজ টিকে থাকে।
একটি ছোট গল্প আছে প্রাচীন চীনের। সম্রাটের উপদেষ্টা তাঁকে বলেছিল, “প্রভু, জনগণ আপনাকে ভালোবাসে।” সম্রাট হেসে বললেন, “তারা আমাকে নয়, আমার ভয়ের প্রতিফলনকে ভালোবাসে।” ইতিহাসের প্রতিটি মিথ্যা আইকন এই সত্য জানত, কিন্তু সে নিজেও তা অস্বীকার করত, কারণ দেবতা হতে হলে মানুষ হারাতে হয়।
যে সমাজ এই দেবতাকে পূজা করে, সে নিজেও আর মানুষ থাকেনা।। সে আর যুক্তিসম্পন্ন সত্তা নয়, সে এক ভক্তসমষ্টি—যাদের সবচেয়ে বড় ভয় সত্য। কিন্তু এই ভয়ই একদিন ক্লান্ত হয়। মানুষ একদিন জেগে ওঠে এবং বলে, “আমরা আর অন্ধ নই।” সেই দিনেই শেষ হয় মিথ্যা আইকনের রাজত্ব।
তাই উপসংহারে বলা যায়, মিথ্যা আইকনের পূজা কোনও যুগের সমাপ্তি নয়, বরং তার রূপান্তরের সূচনা। সমাজের এই অন্ধত্ব স্থায়ী নয়; এটি এক আবর্তন, এক প্রয়োজনীয় শিক্ষা। মানুষ বারবার পতিত হয়, আবার উঠে দাঁড়ায়। কিন্তু প্রতিবারই কিছু বেশি জ্ঞানী, কিছু বেশি সতর্ক।
থমাস কার্লাইলের সেই অমর উক্তি মনে রাখা দরকার—“আমাকে বলো কাকে তোমরা পূজা করো, আমি বলে দেব তোমরা কে।” সমাজ যদি মিথ্যা পূজা করে, তবে তার সত্য মৃত। কিন্তু যতদিন না মানুষ নিজেকে ভুলতে ভুলে যায়, ততদিন সে পুনর্জন্মের সম্ভাবনা রাখে। সত্য হয়তো নীরব, কিন্তু সে অমর।
এ কারণেই প্রতিটি সভ্যতার শেষ বাক্য কখনও ‘আমি জিতেছি’ নয়, বরং ‘আমি বুঝেছি’। এবং যে সমাজ এই বোঝার ক্ষমতা রাখে, সে কখনও পুরোপুরি হারায় না।
মিথ্যা আইকনের যুগও একদিন শেষ হবে, কারণ মানুষ একসময় আয়নায় নিজের চোখের দিকে তাকাবে এবং জিজ্ঞেস করবে—আমি কি এই মুখকে সত্যিই চিনি? সেই প্রশ্নই মুক্তির সূচনা!
বাঙালির সব চিন্তার স্রোত শেষে যে মোহানায় গিয়ে মেশে সেই রবি ঠাকুরই বহুকাল আগে আমাদের সাবধান করে দিয়ে লিখেছিলেন- যদি পূজা করি মিছা দেবতার, শিরে ধরি যদি মিথ্যা আচার, যদি পাপমনে করি অবিচার কাহারো ‘পরে, আমার বিচার তুমি করো তব আপন করে।”।