Home খবরবঙ্গের ভোট রঙ্গ ঋণের ভারে নুয়ে পশ্চিমবঙ্গ, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন

ঋণের ভারে নুয়ে পশ্চিমবঙ্গ, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন

0 comments 2 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গের আর্থিক সংকট এমন একটি জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের সামর্থ্য নিয়েই এখন মৌলিক প্রশ্ন উঠছে — তৃণমূল কংগ্রেস হোক বা বিজেপি, কোনো দলই এই প্রশ্নের বাইরে নয়।

রাজ্যের মোট সঞ্চিত ঋণ ২০২৫ সালের মার্চ নাগাদ ৬ লক্ষ ৯৩ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তুলনায় উল্লেখযোগ্য, ২০১১ সালে বাম আমলের শেষ বছরে এই ঋণ ছিল মাত্র ১ লক্ষ ৯০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ চোদ্দ বছরে রাজ্যের ঋণ সাড়ে তিন গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

রাজকোষের হাল

নীতি আয়োগের ফিসকাল হেলথ ইনডেক্স ২০২৫-এ ১৮টি রাজ্যের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের স্থান হয়েছে ১৬তম। রাজ্যের মোট রাজস্ব আয়ের ২০.৪৭ শতাংশ চলে যাচ্ছে কেবল সুদ পরিশোধেই — অর্থাৎ প্রতি পাঁচ টাকা আয়ের মধ্যে এক টাকার বেশি ব্যয় হচ্ছে পুরনো ঋণের সুদ মেটাতে, উন্নয়নের প্রসঙ্গ ওঠার আগেই।

পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে ক্যাগের সাম্প্রতিক রিপোর্ট। তাতে দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে নেট ঋণ গ্রহণের অর্ধেকেরও বেশি ব্যবহার হচ্ছে বেতন, পেনশন ও ভর্তুকি মেটাতে, পরিকাঠামো নির্মাণে নয়। ভবিষ্যতের উপর দায় চাপিয়ে বর্তমানের চলতি খরচ সামলানোর এই চক্র বিপজ্জনক বলেই মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

দুই দলের প্রতিশ্রুতি

এই পটভূমিতে দুই প্রধান দলের নির্বাচনী ইস্তেহার বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তৃণমূল কংগ্রেস লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পে মাসিক ৫০০ টাকা বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে — সাধারণ মহিলারা পাবেন ১,৫০০ টাকা এবং তফসিলি জাতি ও উপজাতি মহিলারা ১,৭০০ টাকা। পাশাপাশি বেকার যুবকদের জন্য মাসিক ১,৫০০ টাকার বাংলার যুব-সাথী প্রকল্প এবং কৃষি খাতে ৩০,০০০ কোটি টাকার বিশেষ বাজেটের ঘোষণাও করা হয়েছে।

অন্যদিকে বিজেপি মহিলাদের জন্য মাসিক ৩,০০০ টাকা এবং বেকার যুবকদের জন্যও সমান ভাতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা তৃণমূলের প্রস্তাবের প্রায় দ্বিগুণ। এর বাইরে রয়েছে সপ্তম বেতন কমিশন বাস্তবায়ন, আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের সম্প্রসারণ এবং উত্তরবঙ্গে নতুন এইমস, আইআইটি ও আইআইএম স্থাপনের পরিকল্পনা।

রাজস্বের বাস্তবতা

কিন্তু এই প্রতিশ্রুতিগুলি পূরণ করতে যে রাজস্ব ভিত্তি দরকার, তা রাজ্যের কাছে বর্তমানে নেই। রাজ্যের নিজস্ব কর রাজস্ব বৃদ্ধির হার মাত্র ৯ শতাংশ প্রক্ষেপিত, গত পাঁচ বছরে এসজিএসটি সংগ্রহ গড়ে ৬.৬ শতাংশ হারে বেড়েছে, এবং অকর রাজস্ব ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে।

মূলধনী বিনিয়োগের ছবিটিও একই রকম উদ্বেগজনক। ওড়িশা বা মধ্যপ্রদেশ যেখানে উন্নয়নমূলক ব্যয়ের ২৭ শতাংশ মূলধনী খাতে ব্যয় করে, পশ্চিমবঙ্গ সেখানে বরাদ্দ করে মাত্র ১০ শতাংশ। কম পুঁজি বিনিয়োগ মানেই কম শিল্প, কম কর্মসংস্থান, কম কর আদায় এবং শেষমেশ আবার ঋণের শরণ।

পাল্টা প্রশ্ন ও রাজনৈতিক বিতর্ক

তৃণমূল প্রশ্ন তুলেছে যে একদিকে ১ কোটি চাকরি সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি এবং অন্যদিকে বেকার ভাতা — এই দুটি একসঙ্গে কীভাবে সম্ভব। প্রশ্নটি যৌক্তিক, তবে তৃণমূলও একই যুক্তির মুখে পড়ে। যে রাজ্যে ঋণের সুদ মেটাতেই রাজস্বের পঞ্চমাংশ চলে যায়, সেখানে প্রতিটি নতুন কল্যাণ প্রকল্পের অর্থ হয় আরও বেশি ঋণ, নয়তো অন্য খাতে কাটছাঁট।

অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন, দ্রুত রাজকোষ সংস্কার না হলে রাজ্য ধীরে ধীরে ঋণের ফাঁদে আটকে পড়বে। নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে প্রতিশ্রুতির প্রতিযোগিতা জারি আছে — কিন্তু ভোটের পরে যে রাজ্যটি থাকবে, তার ভাঁড়ারে টাকা রাখার দায়িত্ব কোনো দলের ইস্তেহারেই স্পষ্টভাবে নেই।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles