Home খবরবঙ্গের ভোট রঙ্গ “আমার নিরাপত্তা চাই!” — যিনি নিজে সুরক্ষিত, তাঁর অভিযোগের মহাকাব্য

“আমার নিরাপত্তা চাই!” — যিনি নিজে সুরক্ষিত, তাঁর অভিযোগের মহাকাব্য

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কেন্দ্রীয় বাহিনী-বিরোধী নালিশ এবং নিজের রাজ্য-পুলিশি বর্ম — এক অতুলনীয় বৈপরীত্যের কাহিনী

0 comments 8 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: বাংলার রাজনীতিতে একটি অলিখিত নিয়ম আছে — যাঁর গলা যত উঁচু, তাঁর যুক্তি তত কম। সেই সুবর্ণ ঐতিহ্য মেনে তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা, ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সম্প্রতি একটি চাঞ্চল্যকর দাবি করেছেন। তাঁর মতে, অধীর চৌধুরী, নৌশাদ সিদ্দিকি এবং হুমায়ুন কবীর — এই তিন বিরোধী নেতা কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা পাচ্ছেন কারণ তাঁরা গোপনে বিজেপির সঙ্গে “আঁতাত” করেছেন। এই ঘোষণায় বাংলার মানুষ থমকে গেছেন বটে — তবে অবাক হওয়ার কারণটা অন্য।

প্রশ্নটা সহজ। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় একজন সাংসদ। ভারতীয় সংসদে পাঁচশোরও বেশি সদস্য আছেন, তাঁদের বিশাল অংশ হেঁটে বাজার যান, বাসে চড়েন, নিজে গাড়ি চালান। কিন্তু অভিষেকবাবুর ক্ষেত্রে চিত্রটা সম্পূর্ণ আলাদা। রাজ্য পুলিশের পাইলট গাড়ি, সশস্ত্র এসকর্ট, বুলেটপ্রুফ নিরাপত্তা — সব মিলিয়ে এক অভূতপূর্ব “সাধারণ সাংসদ”-এর প্রাত্যহিক জীবনযাত্রা।

এবার একটু হিসাব কষা যাক। কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা অর্থাৎ সিআরপিএফ বা সিআইএসএফ — কোনো নেতাকে দেওয়া হয় গোয়েন্দা সংস্থার নির্দিষ্ট হুমকি-মূল্যায়নের ভিত্তিতে, কোনো রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়। তাহলে অভিষেকবাবুর দাবি কোথায় গিয়ে ঠেকছে? তিন বিরোধী নেতার কেন্দ্রীয় সুরক্ষা পাওয়াকেই তিনি বিজেপি-সংযোগের প্রমাণ হিসেবে দেখাচ্ছেন। কিন্তু এই যুক্তি একটি অদ্ভুত প্রশ্ন তৈরি করে — কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিরাপত্তা পাওয়া যদি বিজেপির ঘনিষ্ঠতার চিহ্ন হয়, তাহলে রাজ্য পুলিশের বিশেষ সুরক্ষা পাওয়া কি তৃণমূলের আনুগত্যের প্রমাণ? এই প্রশ্নের মুখে অভিষেকবাবু কী বলবেন, ভাবলেই কৌতূহল জাগে।

অধীর চৌধুরী একজন দীর্ঘদিনের কংগ্রেস নেতা, বহরমপুরের প্রাক্তন সাংসদ, তৃণমূলের অন্যতম কড়া সমালোচক। নৌশাদ সিদ্দিকি আইএসএফ নেতা, যিনি ভাঙড় অঞ্চলে প্রকাশ্যে তৃণমূলকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। হুমায়ুন কবীর বিজেপির নেতা। এই তিনজনের মধ্যে আঁতাতের গল্প খুঁজে বের করেছেন অভিষেক। কিন্তু এটা কি একবারও ভাবা হচ্ছে যে শাসকদলের বিরুদ্ধে যাঁরা সরব, তাঁদের নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকাটা স্বাভাবিক? এই সহজ সম্ভাবনাটি অভিষেকবাবু এড়িয়ে যাচ্ছেন, নাকি দেখেও না দেখার ভান করছেন — সেটাও একটি প্রশ্ন।

এখানেই বিদ্রূপটা সবচেয়ে তীক্ষ্ণ। মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপো, তিনবারের সাংসদ অভিষেকবাবু হাই-প্রোফাইল ব্যক্তিত্ব, তাঁর নিরাপত্তার প্রয়োজন আছে, এ নিয়ে কারও দ্বিমত নেই। কিন্তু একজন সাংসদের জন্য রাজ্যের তহবিল থেকে এত বিশাল নিরাপত্তা-বহর কোন নিয়মে বরাদ্দ হয়? কোন হুমকি-প্রতিবেদনের ভিত্তিতে?  কোন স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়? এই প্রশ্নগুলোর কোনো সদুত্তর নেই। আর সেই নীরবতাই আসলে সবচেয়ে স্পষ্ট জবাব।

ভারতীয় রাজনীতিতে “whataboutism” বা “ওটা কী?” কৌশলটি বহু পুরনো। নিজের প্রশ্ন এলে পাল্টা প্রশ্ন ছোড়ো, দায় এড়াও। অভিষেকবাবু সেই কৌশলেরই মাস্টারক্লাস দিচ্ছেন। তাঁর বিরোধীরা কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিরাপত্তা পাচ্ছেন — এটা নিয়ে তিনি যতটা সোচ্চার, নিজের অস্বাভাবিক রাজ্য-পুলিশি নিরাপত্তা নিয়ে ততটাই নিশ্চুপ। যিনি নিজে বিপুল নিরাপত্তার সুবিধাভোগী, তিনিই অন্যের সুরক্ষাকে অপরাধের রং দিচ্ছেন — এই স্ববিরোধিতার একটি বিশেষ নাম আছে। ভদ্র ভাষায় তাকে বলে দ্বিচারিতা।

কেউ বলতে পারেন, রাজনীতিতে এসব চলেই। ঠিকই। কিন্তু সমস্যা তখনই বাধে যখন কেউ নৈতিকতার আসনে বসে বক্তৃতা দেন, আর সেই বক্তৃতার ফাঁদে নিজেই আটকে পড়েন। কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা পাওয়া মানে বিজেপির ছাতার নিচে থাকা — এই দাবি মানলে রাজ্য পুলিশের বিশেষ সুরক্ষা পাওয়া কি তৃণমূলের ছাতার নিচে থাকার প্রমাণ নয়? উত্তর অভিষেকবাবু দেবেন না, তবে প্রশ্নটা থেকেই যায়।

এই বিতর্কের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে। বাংলার বিরোধী দলের নেতারা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, রাজনৈতিক সহিংসতার পরিবেশে রাজ্যে তাঁদের প্রাণ বিপদে। পঞ্চায়েত থেকে বিধানসভা — প্রতিটি ভোটে হামলার অভিযোগ, মামলা, রক্তপাত। সেই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তার দাবিকে “আঁতাতের প্রমাণ” বলা শুধু রাজনৈতিক চাতুর্য নয় — এটি আসলে একটি অসতর্ক স্বীকারোক্তি। কেননা বিরোধীদের কেন্দ্রীয় সুরক্ষার প্রয়োজন হচ্ছে কেন? রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা কি তবে এতটাই ভঙ্গুর? এই প্রশ্নের সৎ উত্তর দিতে গেলে অভিষেকবাবুকে নিজের সরকারকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হয়।

এবার সবচেয়ে স্বাভাবিক প্রশ্নে আসা যাক — অভিষেকবাবু কি সত্যিই মনে করেন যে তাঁর এই অভিযোগ বাংলার মানুষ বিশ্বাস করছেন? তৃণমূল কংগ্রেসের জন্মলগ্ন থেকে রাজ্য পুলিশকে দলীয় কাজে ব্যবহারের অভিযোগ নতুন নয়। সেই পুলিশের বিশেষ নিরাপত্তায় যিনি নিজে মোড়া, তিনি যখন কেন্দ্রীয় বাহিনীর সুরক্ষাকে “রাজনৈতিক পক্ষপাত” বলছেন, তখন বিদ্রূপের সংজ্ঞাটাই বদলে যায়। শেক্সপিয়রের ভাষায় — “The lady doth protest too much” — অর্থাৎ যিনি এত বেশি প্রতিবাদ করছেন, তাঁর প্রতিবাদের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আসল স্বীকারোক্তি।

শেষে একটি পরিচিত বাংলা প্রবচন মনে আসে — “চোরের মায়ের বড় গলা।” এই প্রবচনের রাজনৈতিক প্রয়োগ এখানে করা হচ্ছে না, কারণ সরাসরি অভিযোগ করার দায়িত্ব প্রতিবেদকের নয়। তবে প্রশ্নটা রইল: নিজের নিরাপত্তার ন্যায্যতা যাঁর কাছে নেই, তিনি কি অন্যের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে নৈতিক সওয়াল করতে পারেন? অন্যকে প্রশ্ন করার আগে নিজের হিসাব পরিষ্কার রাখাটাও ন্যূনতম সততার দাবি। বাংলার মানুষ উত্তরটা জানেন — কেবল জিজ্ঞেস করার জায়গাটুকু পান না।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী, গণমাধ্যমে প্রভাবশালী, দলে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু ক্ষমতার উঁচু আসনে বসে অসহায়ের অভিনয় করা, নিজে সুবিধা নিতে নিতে অন্যের সুবিধাকে দোষ দেওয়া — এই খেলা বেশিদিন চলে না। ইতিহাস বলে, যাঁরা আয়নার মুখোমুখি হতে ভয় পান, আয়না একদিন তাঁদেরই খুঁজে নেয়। তাই, অভিষেকবাবু — পরের বার বিরোধীদের নিরাপত্তা নিয়ে মুখ খোলার আগে একবার নিজের কনভয়টার দিকে ফিরে তাকান। জবাবটা সেখানেই আছে।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles