Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একটানা ২১ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা ম্যারাথন আলোচনায় মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স যে ছাড় আদায় করতে চেয়েছিলেন, তা পাননি। এতে বিশেষ বিস্ময়ের কিছু নেই — কিন্তু প্রশ্ন হলো, এবার সামনে পথ কী?
অস্বস্তিকর বিকল্পের মুখে ট্রাম্প প্রশাসন
এই ব্যর্থতার ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে দুটি কঠিন বিকল্প। একদিকে তেহরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল আলোচনা — ইরানের ভবিষ্যৎ পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে। অন্যদিকে আবার যুদ্ধ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা, যে যুদ্ধ ইতিমধ্যেই আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জ্বালানি সংকট তৈরি করেছে এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘ সংঘর্ষের আশঙ্কা জন্ম দিয়েছে।
হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে তা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পই ঘোষণা করবেন। সপ্তাহান্তে তিনি ফ্লোরিডায় একটি আলটিমেট ফাইটিং চ্যাম্পিয়নশিপ (UFC) ম্যাচ দেখতে গেছেন। তবে সামনে যে পথগুলো খোলা আছে, প্রতিটিরই কৌশলগত ও রাজনৈতিক মূল্য অনেক।
আলোচনায় কী ঘটল
ভ্যান্স আলোচনায় ঠিক কী ঘটেছে সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি। তবে তাঁর বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, তিনি ইরানের সামনে একটি স্পষ্ট শর্ত রেখেছিলেন — পারমাণবিক কর্মসূচি চিরতরে বন্ধ করতে হবে, না হলে কোনও চুক্তি নয়। ইরান সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।
ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা খুব স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছি আমাদের রেড লাইন কোথায়, কোন বিষয়ে আমরা ছাড় দিতে প্রস্তুত।” তারপর যোগ করেন, “তারা আমাদের শর্ত মানতে রাজি হয়নি।”
ফেব্রুয়ারির ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
এই অচলাবস্থা আসলে নতুন নয়। গত ফেব্রুয়ারির শেষে জেনেভায় একইভাবে আলোচনা ভেস্তে গিয়েছিল। তখন নেতৃত্বে ছিলেন ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনার, যাঁরা এবারের ইসলামাবাদ বৈঠকেও উপস্থিত ছিলেন। সেই অচলাবস্থার পরই ট্রাম্প ৩৮ দিনের ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলার নির্দেশ দেন। লক্ষ্য ছিল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার, সামরিক ঘাঁটি এবং নতুন অস্ত্র তৈরির শিল্প অবকাঠামো।
গত এক মাসে ট্রাম্প বারবার বলেছেন, আমেরিকার সামরিক শক্তির বিশাল প্রদর্শন দেখে ইরান শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করবে। পেন্টাগনের হিসাব অনুযায়ী, ১৩ হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। কিন্তু ইরান দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল — মার্কিন বোমা যতই পড়ুক, তারা মাথা নত করবে না।
ভ্যান্স খালি হাতে দেশে ফেরার পথে যখন সামরিক বিমানঘাঁটির দিকে রওনা হচ্ছিলেন, তখন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবৃতিতে জানায়, তাদের প্রবীণ ও সহনাগরিকদের বিরাট ক্ষতি তাদের সংকল্পকে আরও দৃঢ় করেছে — ইরানি জাতির অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় তারা আগের চেয়ে অনেক বেশি অটল।
“নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ” বনাম বাস্তবতা
ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে একটি স্পষ্ট অনীহা কাজ করছে । কোনো দীর্ঘ, জটিল, বহুস্তরীয় আলোচনায় জড়িয়ে পড়তে তারা চায় না। ট্রাম্প মনে করেন এই সংঘর্ষে তিনিই বিজয়ী। তাই তাঁর বিশেষ দূত উইটকফের ভাষায়, ইরানের উচিত “নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ” করা।
কিন্তু অতীত বলছে ভিন্ন কথা। ওবামা প্রশাসনের সময় তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে শেষ বড় চুক্তি হতে দু’বছর সময় লেগেছিল। সেই চুক্তিতে বহু সমঝোতা ছিল — ইরানকে সীমিত পারমাণবিক মজুত রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, ধীরে ধীরে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের পরিকল্পনা ছিল, এবং ২০৩০ সালের পর পারমাণবিক অস্ত্র-নিষেধ চুক্তির আওতায় অনুমোদিত যেকোনো পারমাণবিক কার্যকলাপের সুযোগ রাখা হয়েছিল।
মূল জট: পারমাণবিক সক্ষমতা
এবারের আলোচনাও ভেঙে পড়েছে সেই একই জটে। ইরান প্রস্তাব দিয়েছিল কয়েক বছরের জন্য পারমাণবিক কার্যক্রম “স্থগিত” রাখার। কিন্তু তারা প্রায় অস্ত্রমানের ইউরেনিয়াম মজুত ছাড়তে এবং নিজেদের মাটিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের ক্ষমতা স্থায়ীভাবে ত্যাগ করতে রাজি নয়।
ইরানের কাছে এটি তাদের ন্যায্য অধিকার — তারা পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির সদস্য, যা তাদের অস্ত্র না বানানোর অঙ্গীকারে বাধ্য করে। কিন্তু আমেরিকার কাছে এটাই সন্দেহের মূল কারণ। উইটকফের ভাষায়, এটি একটি “ইঙ্গিত” — ইরান সবসময় এমন একটি সক্ষমতা ধরে রাখতে চায়, যাতে চাইলে দ্রুত বোমা বানাতে পারে। ৩৮ দিনের যুদ্ধ এই মনোভাবকে নরম করেনি, বরং আরও কঠোর করেছে।
যুদ্ধের হুমকি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা
এখন ট্রাম্পের প্রধান চাপের অস্ত্র হলো আবার যুদ্ধ শুরুর হুমকি, কারণ ভঙ্গুর দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি শেষ হচ্ছে ২১ এপ্রিল। কিন্তু এই হুমকি যতই উচ্চারিত হোক, বাস্তবে বড় আকারে যুদ্ধ ফের শুরু করা ট্রাম্পের পক্ষে রাজনৈতিকভাবে সহজ নয় আর ইরানও তা জানে।
গত সপ্তাহে ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছিলেন মূলত এক কারণেই — বিশ্বের ২০ শতাংশ তেলের সরবরাহ বন্ধ হওয়ার ফলে পেট্রোলের দাম দ্রুত বাড়ছিল, সারের ঘাটতি তৈরি হচ্ছিল, এমনকি সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের জন্য জরুরি হিলিয়ামের সংকট দেখা দিচ্ছিল। যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনায় বাজারে উল্লাস দেখা দিয়েছিল — অসম্পূর্ণ চুক্তি হলেও বাজার স্বস্তি পেয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধ আবার শুরু হলে বাজার পড়ে যাবে, এবং ইতিমধ্যেই ৩.৩ শতাংশে ওঠা মুদ্রাস্ফীতি আরও বাড়বে, এ প্রায় নিশ্চিত।
হরমুজ: ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার
সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হরমুজ প্রণালি আবার খুলবে কি না। ইরানের বর্ণনায় এটিই আলোচনার প্রথম বিষয়। তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হরমুজ প্রণালি, পারমাণবিক ইস্যু, যুদ্ধক্ষতিপূরণ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সম্পূর্ণ অবসান — এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
এই তালিকা তাৎপর্যপূর্ণ। যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করা কোনো ইস্যুই ছিল না। যুদ্ধ শুরুর পরই ইরান বুঝতে পারে — এটাই তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনৈতিক অস্ত্র। এখন এই জলপথ খুলে দেওয়া জড়িয়ে গেছে মার্কিন হামলায় হওয়া ক্ষতির ক্ষতিপূরণ এবং দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চাপানো নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবির সঙ্গে। যুক্তরাষ্ট্র প্রথম দাবিটি সরাসরি নাকচ করেছে। দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে বলেছে — ইরান নিজের শর্ত পূরণ করলে ধীরে ধীরে তা হতে পারে।
উভয় পক্ষই দাবি করছে জয়
ভ্যান্সের সফর অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে — উভয় পক্ষই মনে করছে প্রথম রাউন্ডে তারাই জিতেছে। আমেরিকার মতে, বিপুল বোমাবর্ষণের মাধ্যমে তারা শক্তি দেখিয়েছে। ইরানের মতে, টিকে থেকেই তারা বিজয়ী। এই মুহূর্তে কোনো পক্ষই আপসের মেজাজে নেই।