Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার আর্টেমিস II অভিযানের চার মহাকাশচারীকে নিয়ে ‘ওরিয়ন’ ক্যাপসুলটি শুক্রবার (স্থানীয় সময়) রাত ৮টার কিছু পরেই নিরাপদে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করেছে। এর মাধ্যমে চাঁদ ঘিরে তাদের ঐতিহাসিক সফরের সফল সমাপ্তি হল।
নাসার আর্টেমিস কর্মসূচির বড় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ
এই সফল অবতরণ নাসার ‘আর্টেমিস’ কর্মসূচির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে ধরা হচ্ছে। এই কর্মসূচির লক্ষ্য হলো আবার মানুষকে চাঁদের মাটিতে পাঠানো এবং ভবিষ্যতে আরও দূরের মহাকাশ অভিযানের পথ তৈরি করা। ‘আর্টেমিস II’ ছিল প্রথম মানবসহ অভিযান যেখানে নাসার শক্তিশালী রকেট ও ‘ওরিয়ন’ মহাকাশযান ব্যবহার করা হয়েছে; যা প্রমাণ করল, মানুষকে পৃথিবীর কক্ষপথের বাইরে নিয়ে গিয়ে নিরাপদে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
হিট শিল্ডের সফল পরীক্ষা
এই অভিযানে বিশেষ নজর ছিল ‘ওরিয়ন’-এর হিট শিল্ড বা তাপরোধী আবরণের উপর। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ফেরার সময় এটি মহাকাশচারীদের প্রচণ্ড তাপ থেকে রক্ষা করে। ২০২২ সালের একটি পরীক্ষামূলক উড্ডয়নে এই আবরণে সমস্যা দেখা দিয়েছিল—গ্যাস জমে এর কিছু অংশ ভেঙে পড়ে। তবে এবার নাসা প্রবেশপথের কৌশল বদলে দেয়, এবং প্রায় ৫,০০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপ সহ্য করেও হিট শিল্ড সফলভাবে কাজ করেছে।
যাঁরা ছিলেন এই ঐতিহাসিক অভিযানে
১০ দিনের এই যাত্রায় মহাকাশচারীরা এমন দূরত্বে গিয়েছিলেন, যা আগে কোনও মানুষ যায়নি। এই দলে ছিলেন পাইলট ভিক্টর গ্লোভার, কমান্ডার রিড উইজম্যান, এবং মিশন বিশেষজ্ঞ জেরেমি হ্যানসেন ও ক্রিস্টিনা কচ। গ্লোভার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি যিনি নিম্ন-পৃথিবী কক্ষপথের বাইরে গিয়েছেন, কচ প্রথম নারী, এবং কানাডার হ্যানসেন প্রথম অ-মার্কিন নাগরিক যিনি চাঁদের এত কাছে পৌঁছেছেন।
মানবদেহে মহাকাশের প্রভাব নিয়ে গবেষণা
অভিযানের সময় শুধু যন্ত্রপাতি নয়, মহাকাশচারীদের শরীরের উপরও গবেষণা করা হয়েছে। তাদের শরীরে ক্ষুদ্র চিপ বসানো হয়েছিল, যাতে জানা যায় গভীর মহাকাশ মানুষের শরীরে কী প্রভাব ফেলে। তারা চাঁদের এমন অংশও দেখেছেন, যা আগে কোনও মানুষ সরাসরি চোখে দেখেনি—বিশেষ করে চাঁদের অদেখা দূর দিক।চাঁদের আড়ালে চলে যাওয়ার ফলে এক সময় প্রায় ৪০ মিনিট যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। সেই নীরবতা কাটিয়ে ফিরে এসে ক্রিস্টিনা কচ বলেছিলেন—মহাকাশ থেকে পৃথিবীর নীল-সাদা দৃশ্যের মতো সুন্দর আর কিছু নেই। তার কথায়, “আমরা আবার ফিরব, নতুন জাহাজ বানাব, আরও অনুসন্ধান করব—কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা পৃথিবীকেই বেছে নেব, একে অপরকেই বেছে নেব।”
পৃথিবীতে ফেরার কঠিন মুহূর্ত
মহাকাশযানের পৃথিবীতে ফেরার ধাপটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। প্রায় ১৩ মিনিটের এই অবতরণের সময় ‘ওরিয়ন’ ঘণ্টায় প্রায় ৩৫ হাজার ফুট গতিতে চলছিল এবং মহাকাশচারীদের শরীরের উপর পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের চার গুণ চাপ পড়ে।
যদি মহাকাশযান খুব খাড়া কোণে প্রবেশ করত, তাহলে অতিরিক্ত ঘর্ষণে সেটি ভেঙে পড়তে পারত। আবার কোণ কম হলে এটি বায়ুমণ্ডল ছুঁয়ে ফিরে যেতে পারত, যেমন জলে পাথর ছুঁড়লে লাফায়। তাই অত্যন্ত নিখুঁতভাবে এই প্রবেশপথ ঠিক করতে হয়।
এইবার নাসা সরাসরি প্রবেশের পথ বেছে নেয়, যাতে তাপের সংস্পর্শ কম সময়ের জন্য থাকে। বায়ুমণ্ডলে ঢোকার মাত্র ২৪ সেকেন্ডের মধ্যেই মহাকাশযানের চারপাশের বাতাস প্লাজমায় পরিণত হয়। এই অবস্থায় কোনও রেডিও সংকেত বাইরে যেতে পারে না। ফলে কিছু সময়ের জন্য সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
প্রায় ছয় মিনিট পর যখন যোগাযোগ ফিরে আসে, তখন মিশন কন্ট্রোল সেন্টারে আনন্দধ্বনি ওঠে।
এরপর একের পর এক প্যারাসুট খুলে যায়, যা গতি কমিয়ে মহাকাশযানকে নিরাপদে নামায়। শেষ পর্যন্ত প্রশান্ত মহাসাগরে ধীরে ভেসে পড়ে ‘ওরিয়ন’। তখনই শোনা যায় বহু প্রতীক্ষিত বার্তা—“হিউস্টন, স্প্ল্যাশডাউন।”
উদ্ধার অভিযান ও পরবর্তী পদক্ষেপ
অবতরণের পর মার্কিন নৌবাহিনীর ইউএসএস জন পি. মার্থা জাহাজটি মহাকাশচারীদের উদ্ধার করে। ডুবুরিরা এসে ক্যাপসুলের দরজা খোলেন, তারপর হেলিকপ্টারে করে তাদের জাহাজে নিয়ে যাওয়া হয়।
অভিযান শেষ হলেও কাজ শেষ নয়। এখন বিজ্ঞানীরা খতিয়ে দেখবেন মহাকাশযানটি ঠিক কীভাবে কাজ করেছে। যাত্রার সময় কিছু প্রযুক্তিগত সমস্যা, বিশেষ করে একটি ভালভ লিক ধরা পড়েছে, যা ভবিষ্যতের অভিযানের আগে ঠিক করতে হবে।
পরবর্তী পরিকল্পনা: চাঁদের মাটিতে ফের মানুষ
নাসার পরবর্তী পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালে আবার একটি অভিযান হবে, যেখানে চাঁদের কক্ষপথে গিয়ে নতুন প্রযুক্তির পরীক্ষা করা হবে। আর ২০২৮ সালে পরিকল্পনা রয়েছে মানুষকে আবার চাঁদের মাটিতে নামানোর, যা শেষবার হয়েছিল ১৯৭২ সালে, অ্যাপোলো প্রোগ্রামের সময়।
এইভাবে ‘আর্টেমিস II’ শুধু একটি সফল মহাকাশযাত্রা নয়—এটি ভবিষ্যতের চাঁদ ও আরও দূরের মহাকাশ অভিযানের পথ খুলে দিল।