বাংলাস্ফিয়ার: ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে যখন ছোট্ট কেজে মুলডুন জন্মায়, তখনই তার বাবা-মাকে জানানো হয় এক ভয়াবহ সত্য। তার এমন একটি রোগ হয়েছে, যা এতটাই বিরল যে প্রতি ১৩ লক্ষ নবজাতকের মধ্যে মাত্র একজন এতে আক্রান্ত হয়—CPS1 এনজাইমের তীব্র ঘাটতি। এই রোগে শরীর প্রোটিন ভাঙতে পারে না, ফলে রক্তে জমতে থাকে বিষাক্ত পদার্থ—যা মস্তিষ্কের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে, এমনকি মৃত্যুও ডেকে আনতে পারে।
একমাত্র স্থায়ী সমাধান ছিল লিভার প্রতিস্থাপন। কিন্তু কেজে তখন এতটাই ছোট ও দুর্বল যে সেই অপারেশন সম্ভব ছিল না। দিন যত যাচ্ছিল, তার মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতির ঝুঁকি ততই বাড়ছিল।
এরপর যা ঘটল, তা হয়তো এই দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাবিজ্ঞানের গল্প।
মাত্র ছয় মাসের মধ্যে ফিলাডেলফিয়ার চিলড্রেন’স হাসপাতাল ও পেন মেডিসিনের একদল চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী কেজের জন্য সম্পূর্ণ ব্যক্তিগতভাবে একটি চিকিৎসা পদ্ধতি তৈরি করেন—লক্ষ্য ছিল তার ডিএনএ-র একটি ভুল অক্ষর শুধরে দেওয়া। এর জন্য ব্যবহার করা হয় আধুনিক জিন-সম্পাদনার প্রযুক্তি CRISPR। আর সেই সংশোধনী শরীরের কোষে পৌঁছে দিতে কাজে লাগানো হয় mRNA প্রযুক্তি—যে একই প্রযুক্তি কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনে ব্যবহৃত হয়েছিল। কেজের বয়স যখন ছয় মাস, তখন দেওয়া হয় প্রথম ডোজ। এক বছর পর সে হাঁটছে, কথা বলছে, পরিবারের সঙ্গে স্বাভাবিক জীবন কাটাচ্ছে।
আমরা এই রোগগুলিকে “বিরল” বলি, কিন্তু এদের যন্ত্রণা মোটেও বিরল নয়। আমেরিকায় প্রায় ২ কোটি ৫০ লক্ষ মানুষ—প্রতি ১৩ জনে একজন—কোনো না কোনো বিরল জেনেটিক রোগে ভোগেন। তাদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি শিশু, যাদের অনেকেই পাঁচ বছর বয়স পার করতে পারে না। এই পরিবারগুলি বছরের পর বছর সঠিক রোগ নির্ণয়ের জন্য লড়াই করে, ভুল চিকিৎসার চক্রে ঘুরতে থাকে, অর্থনৈতিকভাবে ভেঙে পড়ে। অথচ এই রোগগুলির চিকিৎসায় বছরে প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়—যা ক্যানসার বা অ্যালঝাইমারের সমতুল্য। তবু মাত্র ৫ শতাংশেরও কম রোগের জন্য সরকারিভাবে অনুমোদিত চিকিৎসা রয়েছে।
কারণটা সহজ—ওষুধ তৈরির অর্থনীতি ছোট রোগীর সংখ্যা নিয়ে কাজ করতে রাজি নয়। যে রোগ মাত্র কয়েকশো বা কয়েক হাজার মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ, তার জন্য বড় ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করা কঠিন, বিনিয়োগের লাভও নেই। ফলে একসঙ্গে দেখলে এই রোগগুলি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অপূর্ণ চিকিৎসার ক্ষেত্রগুলির একটি।
কিন্তু পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। mRNA ও CRISPR প্রযুক্তির বিশেষত্ব হলো—একবার পুরো সিস্টেম তৈরি হয়ে গেলে, শুধু একটি ছোট জেনেটিক কোড বদলালেই সেটি অন্য রোগে ব্যবহার করা যায়। একই প্ল্যাটফর্ম, ভিন্ন ভিন্ন রোগের সমাধান।
কিন্তু কেজের চিকিৎসায় যা হয়েছে তা ছিল অসাধারণ এক সম্মিলিত প্রচেষ্টা—বহু প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞদের একত্রিত করা হয়েছিল, বছরের পর বছরের গবেষণার কাজ কয়েক মাসে সম্পন্ন করা হয়েছিল, পরীক্ষামূলক চিকিৎসার অনুমোদন মিলেছিল মাত্র এক সপ্তাহে। প্রতিটি রোগীর জন্য এই ধরনের “নায়কোচিত” প্রচেষ্টা কোনো স্বাস্থ্যব্যবস্থার পক্ষেই টেকসই নয়।
বাস্তবতার আরেকটি দিকও স্বীকার করতে হবে। আমরা জানি কীভাবে mRNA-কে ক্ষুদ্র চর্বির আবরণে মুড়ে লিভারে পৌঁছানো যায়—কেজের সমস্যা সেখানেই ছিল। কিন্তু মস্তিষ্ক, হৃদযন্ত্র বা ফুসফুসে এই প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়া এখনও বড় বৈজ্ঞানিক চ্যালেঞ্জ। একাধিক জেনেটিক কারণে যেসব রোগ হয়, সেগুলি আরও জটিল।
সবচেয়ে বড় বাধাটি আসলে প্রযুক্তিগত নয়—গঠনগত। আমাদের নিয়মনীতি ও বাণিজ্যিক ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল এমন ওষুধের কথা মাথায় রেখে, যা লক্ষ লক্ষ মানুষ একইভাবে ব্যবহার করবে। কিন্তু এই নতুন চিকিৎসায় প্রতিটি রোগীর জন্য দরকার আলাদা সমাধান।
এখানে সার্জারির সঙ্গে একটি তুলনা প্রাসঙ্গিক। একজন সার্জন হৃদযন্ত্রের ভালভ মেরামত করেন—প্রতিটি রোগীর শরীর আলাদা হলেও তাকে প্রতিবার নতুন ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করতে হয় না। পদ্ধতিটি যাচাই করা, হাসপাতাল অনুমোদিত—চিকিৎসা হয় রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী। যদি mRNA-CRISPR চিকিৎসাকে “ওষুধ” না ভেবে “মলিকিউলার সার্জারি” হিসেবে ভাবা যায়, তাহলে হয়তো পথ সহজ হবে।
কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ অবশ্য দেখা যাচ্ছে। আমেরিকার FDA এমন একটি নতুন কাঠামোর প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে বিরল রোগের ব্যক্তিগত চিকিৎসা দ্রুত অনুমোদন পেতে পারে—বড় ট্রায়ালের বদলে প্রযুক্তির কার্যকারিতার ওপর ভিত্তি করে। চিলড্রেন’স হাসপাতাল ও পেন মেডিসিন এমন একটি ট্রায়াল শুরু করতে চায়, যেখানে কেজের জন্য তৈরি জিন-এডিটর অন্য রোগীদের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা যাবে। জনস হপকিন্স, মায়ো ক্লিনিকসহ আরও কিছু প্রতিষ্ঠান মিলে একটি উদ্যোগ নিয়েছে—উৎপাদন প্রক্রিয়া মানসম্মত করতে, নিয়মনীতি ভাগ করে নিতে এবং বড় পরিসরে এই চিকিৎসা পৌঁছে দিতে।
তবু অনেক প্রশ্ন অমীমাংসিত। প্রতিটি ব্যক্তিগত চিকিৎসায় উৎপাদনের মান কীভাবে নিশ্চিত হবে? নিয়ম অতিরিক্ত কঠোর হলে প্রযুক্তির বিস্তার বাধাগ্রস্ত হবে। আর বাণিজ্যিকভাবে—কোনো ওষুধ কোম্পানি মাত্র ১২ জন রোগীর জন্য আলাদা উৎপাদন লাইন তৈরি করতে চাইবে না। একক গবেষণার সাফল্য থেকে নিয়মিত চিকিৎসা পরিষেবায় পৌঁছানোর সেতুটি এখনও তৈরি হয়নি—না অর্থে, না কাঠামোয়।
নতুন বিজ্ঞান আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। কিন্তু সেই দরজা পার হতে হলে বদলাতে হবে আমাদের ভাবনার ধরনও—চিকিৎসা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করি, কীভাবে তৈরি করি, কোথা থেকে অর্থ আসে, কীভাবে মানুষের কাছে পৌঁছায়।
দশ বছর পরেও যদি দেখা যায় এমন রোগে শিশুরা মারা যাচ্ছে, যার চিকিৎসা আমরা জানি—তার কারণ হবে না বিজ্ঞানের ব্যর্থতা। কারণ হবে আমাদের কল্পনাশক্তির অভাব।
কেজের গল্প নিঃসন্দেহে এক অলৌকিক ঘটনা। কিন্তু সেটি শুধু অলৌকিক হয়ে থাকলে চলবে না—এটিকেই হতে হবে ভবিষ্যতের পথনির্দেশ।