বাংলাস্ফিয়ার: ইসলামাবাদে এখন এক অদ্ভুত, প্রায় নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে—একদিকে কূটনীতি, অন্যদিকে আতঙ্ক; একদিকে বিশ্বশক্তির প্রতিনিধিরা, অন্যদিকে অনিশ্চয়তায় ভরা এক যুদ্ধবিরতির ছায়া। পাকিস্তান এমন এক দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে, যাকে অনেক কূটনীতিক প্রায় অসম্ভব মিশন বলেই মনে করছেন—ইরান ও আমেরিকার মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা, এমন এক সময়ে যখন বিশ্ব অর্থনীতি হরমুজ প্রণালীর অচলাবস্থার কারণে টালমাটাল, আর যুদ্ধবিরতি নিজেই ভঙ্গুর।

পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ গত কয়েক সপ্তাহ ধরে নিরবচ্ছিন্ন কূটনৈতিক তৎপরতায় লিপ্ত ছিলেন। কারণ তাঁদের কাছে বিষয়টি শুধু আন্তর্জাতিক কূটনীতি নয়, সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন। ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত, তার পাশেই আফগানিস্তান—এই দুই প্রতিবেশীর সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে সংঘর্ষ ও উত্তেজনা পাকিস্তানকে এমনিতেই অস্থির করে তুলেছে। এই অবস্থায় ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তার অভিঘাত পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্তে আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে ইসলামাবাদ শহর কার্যত দুর্গে পরিণত হয়েছে। ইরানি প্রতিনিধিরা যখন পৌঁছলেন, তখন থেকেই রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলি কঠোর নিরাপত্তার বলয়ে ঢেকে ফেলা হয়। মার্কিন প্রতিনিধিদল যার নেতৃত্বে রয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়। শহরের বিলাসবহুল সেরেনা হোটেল, যেখানে আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে, সেটিকে প্রায় পুরোপুরি খালি করে সরকার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। আশপাশের রাস্তা বন্ধ, সর্বত্র চেকপোস্ট, ব্যারিকেড, টহল—সব মিলিয়ে রাজধানী যেন এক অদৃশ্য চাপের নিচে নিঃশ্বাস নিচ্ছে।

এই অতিরিক্ত সতর্কতার পেছনে রয়েছে পাকিস্তানের গভীর আশঙ্কা। শুধু জঙ্গি হামলার ভয় নয়, বরং যে কোনও অঘটনই এই সূক্ষ্ম কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে ভেঙে দিতে পারে। যদিও বড় শহরগুলিতে হামলার সংখ্যা কমেছে, আফগান সীমান্তে তালিবান ক্ষমতায় ফেরার পর জঙ্গি কার্যকলাপ আবার বেড়েছে। ফেব্রুয়ারিতে ইসলামাবাদে আত্মঘাতী হামলার ঘটনাও পরিস্থিতিকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে। সেই ঘটনার পর পাকিস্তান আফগানিস্তানে বিমান হামলা চালায়, এবং কয়েক সপ্তাহ ধরে সংঘর্ষ চলে যা এক সময়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককেও টানাপোড়েনে ফেলে দেয়।

এই প্রেক্ষাপটে ইসলামাবাদের বৈঠক শুধু একটি কূটনৈতিক অনুষ্ঠান নয়, বরং এক অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ উদ্যোগ। স্টিমসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়া প্রোগ্রামের পরিচালক এলিজাবেথ থ্রেলকেল্ডের মতে, এত কম প্রস্তুতির সময়, এত উচ্চপ্রোফাইল প্রতিনিধিদল, এবং এত বড় ঝুঁকি—সব মিলিয়ে এটি নিরাপত্তার দিক থেকে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং একটি আয়োজন। এতে বোঝা যায়, পাকিস্তান প্রশাসন এই আলোচনাকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে।

কিন্তু পাকিস্তানের চ্যালেঞ্জ কেবল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নয়। আরও বড় প্রশ্ন—এই আলোচনাকে কীভাবে বাস্তব ফলাফলের দিকে এগিয়ে নেওয়া যায়। বিশ্লেষক জাহিদ হুসেনের কথায়, শুধু বৈঠক রক্ষা করাই যথেষ্ট নয়; বাইরের শক্তিগুলির প্রভাব যাতে আলোচনাকে বিপথে না নিয়ে যায়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে ইজরায়েলের অবস্থান—যে যুদ্ধবিরতি তারা শর্তসাপেক্ষে মেনে নিয়েছে—যে কোনও সময় পরিস্থিতিকে আবার উত্তপ্ত করে তুলতে পারে।

এই পরিস্থিতির মধ্যে পাকিস্তানের ভূমিকা সত্যিই উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। মাত্র এক বছর আগেও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে প্রায় প্রান্তিক হয়ে থাকা দেশটি হঠাৎ করেই একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় উঠে এসেছে। যদি এই আলোচনা সফল হয়, তাহলে পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক মর্যাদা আরও দৃঢ় হবে। কিন্তু যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে যে রাজনৈতিক পুঁজি তারা বিনিয়োগ করেছে, সেটি উল্টে গিয়ে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।

অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির নিরাপত্তা বিশ্লেষক মুহাম্মদ ফয়সালের মতে, পাকিস্তান প্রকাশ্যে এই মধ্যস্থতায় নিজেদের রাজনৈতিক গুরুত্ব বাজি রেখেছে। ফলে আলোচনার ভেঙে পড়া মানে হবে অতিরিক্ত প্রতিশ্রুতি দিয়ে কম ফল দেখানো—যা ভবিষ্যতে তাদের কূটনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে দিতে পারে।

তবুও পাকিস্তান এই ঝুঁকি নিচ্ছে, কারণ তাদের হাতে এখন একটি বিরল সুযোগ এসেছে। বিশ্লেষক কামরান বুখারির মতে, পাকিস্তান এখন কেবল বার্তাবাহক নয়, বরং সক্রিয় আলোচক। তারা একদিকে ইরানের সঙ্গে ঐতিহাসিক ও কৌশলগত সম্পর্ক কাজে লাগাতে পারছে, অন্যদিকে আমেরিকার কাছেও একটি গ্রহণযোগ্য সেতু হয়ে উঠছে। এই দ্বৈত আস্থার জায়গা থেকেই পাকিস্তান উভয় পক্ষের চিন্তাভাবনায় প্রভাব ফেলতে পারছে।

তবে সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট। পাকিস্তান আলোচনার টেবিলে সবাইকে বসাতে পারে, আলোচনাকে চালিয়ে রাখতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সমাধান চাপিয়ে দেওয়ার মতো শক্তি তাদের নেই। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া যা এই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু—সেটি নিশ্চিত করার মতো বাস্তব ক্ষমতা পাকিস্তানের হাতে নেই। যদি আমেরিকা ও ইরান নিজেদের অবস্থান থেকে সরে না আসে, তাহলে পাকিস্তানের কূটনৈতিক দক্ষতাও সেখানে থেমে যেতে বাধ্য।

তারপরও ইসলামাবাদের এই মুহূর্তটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি শুধু একটি যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নয়, বরং একটি দেশের কূটনৈতিক পুনর্জন্মেরও পরীক্ষা। সফল হলে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক রাজনীতির নতুন খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। ব্যর্থ হলে—এই মুহূর্তটি হয়তো ইতিহাসে একটি ক্ষণস্থায়ী উত্থান হিসেবেই থেকে যাবে।