Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে যুদ্ধবিরতিকে “পশ্চিম এশিয়ার জন্য সোনালি যুগের সূচনা” বলে বর্ণনা করেছেন, তার প্রথম দিনটিই পরিণত হয়েছে এই সংঘাতের অন্যতম রক্তাক্ত দিনে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এতটা তীব্র সহিংসতা আর দেখা যায়নি বলে জানাচ্ছেন বিশ্লেষকরা।
৮ এপ্রিল নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার মাত্র ৯০ মিনিট আগে ট্রাম্প আচমকা দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন। এর আগে টানা দুই সপ্তাহ তিনি ইরানের ওপর চাপ বজায় রেখেছিলেন — হরমুজ প্রণালী খুলে না দিলে দেশটির বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দিয়েছিলেন, এমনকি ইরানি সভ্যতা ধ্বংস করে দেওয়ার মতো চরম হুমকিও দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত সেই অবস্থান থেকে সরে এসে তিনি যুদ্ধবিরতির পথ বেছে নেন, যা আন্তর্জাতিক মহলে সাময়িক স্বস্তি এনে দেয়।
এখন দুই দেশের প্রতিনিধিরা স্থায়ী শান্তির পথ খুঁজতে আলোচনায় বসবেন। আলোচনার প্রথম পর্ব আগামীকাল, ১০ এপ্রিল, পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই সংঘাতে পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে।
উপসাগরীয় দেশগুলির ক্ষতি সবচেয়ে বেশি
এই যুদ্ধে সবচেয়ে বড় মাশুল দিতে হয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলোকে। তেল ও গ্যাসের আয়ের ক্ষতি, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ধ্বংস এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ব্যয় মিলিয়ে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ কয়েক দশক বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
তবে অর্থনৈতিক ক্ষতির চেয়েও গুরুতর হয়ে উঠেছে কৌশলগত দুর্বলতার প্রশ্ন। এই যুদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোর দুটি মৌলিক দুর্বলতা নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে।
প্রথম দুর্বলতা: হরমুজ প্রণালীর ওপর অপরিহার্য নির্ভরতা। এই জলপথটি উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য বিশ্ববাজারের সঙ্গে প্রধান, বহু ক্ষেত্রে একমাত্র সংযোগ। এখান দিয়েই তারা তেল ও গ্যাস রপ্তানি করে এবং খাদ্যশস্য থেকে গাড়ি পর্যন্ত সবকিছু আমদানি করে। ইরান চাইলেই এই প্রণালী বন্ধ করে দিয়ে তাদের অর্থনীতিতে সরাসরি আঘাত করতে পারে।
বিকল্প পথের কথা ভাবছে উপসাগরীয় দেশগুলো। বাইডেন প্রশাসনের আমলে রেলপথ ও পাইপলাইনের মাধ্যমে ইজরায়েল পর্যন্ত একটি করিডর তৈরির প্রস্তাব ছিল। আরেকটি প্রস্তাবে সিরিয়া হয়ে পথ বের করার কথা রয়েছে। এছাড়া লোহিত সাগর বা ওমান উপসাগর পর্যন্ত পাইপলাইন বিস্তারের পরিকল্পনাও আলোচনায় এসেছে।
কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব বিকল্প দ্রুত বা নির্ভরযোগ্য সমাধান নয়। পাইপলাইন নির্মাণে বছরের পর বছর লাগে এবং হামলার ঝুঁকি থাকে, সাম্প্রতিক যুদ্ধে সৌদি আরবের ক্ষেত্রে তা স্পষ্ট হয়েছে। এছাড়া উপসাগরীয় তেলের প্রধান ক্রেতারা এশিয়ায় অবস্থিত, আর বড় তেলবাহী জাহাজ পুরো বোঝাই অবস্থায় সুয়েজ খাল পার হতে পারে না। ফলে ভূমধ্যসাগর হয়ে তেল পাঠানো অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ।
দ্বিতীয় দুর্বলতা: একটি ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে ওঠা আমেরিকার ওপর নির্ভরতা। বহু দশক ধরে আরব উপদ্বীপে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ছিল বাইরের আক্রমণ ঠেকানোর ঢাল। কিন্তু ট্রাম্পের এই যুদ্ধ সেই সমীকরণ উল্টে দিয়েছে — আমেরিকা এবার সংঘর্ষ প্রতিরোধের পরিবর্তে নিজেই তা উসকে দিয়েছে।
প্রকাশ্যে উপসাগরীয় নেতারা বলছেন, এই যুদ্ধ আমেরিকার সঙ্গে তাদের সম্পর্কে চিড় ধরাবে না। কিন্তু কূটনৈতিক সূত্র জানাচ্ছে, অনেক নেতা ব্যক্তিগতভাবে ভিন্ন মত পোষণ করছেন। মাত্র এক বছর আগে ট্রাম্প সৌদি আরবে দাঁড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যে “হস্তক্ষেপমূলক যুদ্ধের” ইতি টানার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে নিজেই এখন যুদ্ধ পরিচালনা করছেন বলে আফসোস করছেন কেউ কেউ।
বিকল্প মিত্র খুঁজছে উপসাগরীয় দেশগুলো
আমেরিকার বিকল্প এখনও অনিশ্চিত। ব্রিটেন ও ফ্রান্স কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহিকে ড্রোন প্রতিরোধে সহায়তা করছে, কিন্তু যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালীতে স্থায়ী সামরিক ভূমিকা নিতে তারা অনিচ্ছুক। উপসাগরীয় দেশগুলোর দৃষ্টিতে ইউরোপ এখনও সত্যিকারের সামরিক শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে পারেনি।
কিছু নতুন অংশীদারিত্ব গড়ে উঠছে। কাতার তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার পথে হাঁটছে। তুরস্ক ২০১৭ সাল থেকেই সেখানে সেনা মোতায়েন রেখেছে। সৌদি আরব পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি জোরদার করার পরিকল্পনা করছে। আর এই যুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়া সংযুক্ত আরব আমিরশাহিকে দ্রুততার সঙ্গে একটি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহ করেছে, যা দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তবে এসব মধ্যম শক্তি কোনোভাবেই একটি পরাশক্তির শূন্যতা পূরণ করতে সক্ষম নয়।
রাশিয়া-চীনের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ
রাশিয়ার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সূত্র জানাচ্ছে, ইরানকে আরব দেশগুলোতে হামলার জন্য রাশিয়া স্যাটেলাইট তথ্য সরবরাহ করেছে। অথচ ইউক্রেন যুদ্ধের সময় পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলো নিরপেক্ষ থেকেছিল। সেই সৌজন্য রাশিয়া দেখায়নি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন একাধিক আঞ্চলিক কর্মকর্তা। উল্লেখযোগ্যভাবে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি উপসাগরীয় দেশগুলোকে ড্রোন প্রতিরোধে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন কারণ ইরানের তৈরি শাহেদ ড্রোনই রাশিয়া ইউক্রেনে ব্যবহার করে আসছে।
চীনের ভূমিকা নিয়েও অসন্তোষ কম নয়। বেইজিং ইরানকে যুদ্ধবিরতি মানতে কিছুটা চাপ দিলেও, একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে মিলে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে হরমুজে সামরিক অভিযান অনুমোদনের প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের জন্যও রাশিয়া ও চীন শক্তিশালী মিত্র হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করতে পারেনি — রাশিয়া সীমিত সামরিক তথ্য দিয়েছে মাত্র, আর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা না উঠলে চীনও যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনে বড় ভূমিকা রাখবে না।
ইজরায়েল প্রশ্নে বাড়ছে সংশয়
একসময়ের সম্ভাব্য মিত্র ইজরায়েলকেও এখন সন্দেহের চোখে দেখছে অনেক আরব দেশ। তাদের অভিযোগ, ইজরায়েল ট্রাম্পকে ভুল তথ্য দিয়ে এই যুদ্ধে টেনে এনেছে, এই বিশ্বাসে যে ইরানের সরকার সহজেই উৎখাত করা যাবে। এছাড়া ৮ এপ্রিল বৈরুতে ইজরায়েলের তীব্র বোমাবর্ষণকে আঞ্চলিক পর্যবেক্ষকরা ইচ্ছাকৃতভাবে যুদ্ধবিরতি ভেস্তে দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে মূল্যায়ন করছেন।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
১০ এপ্রিলের আলোচনা কোন পথে যাবে, তার ওপরই নির্ভর করছে গোটা অঞ্চলের ভবিষ্যৎ। বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি মার্কিন-ইরান উত্তেজনা অব্যাহত থাকে, তাহলে উপসাগরীয় দেশগুলোকে আরও সংঘর্ষের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। কিন্তু স্থায়ী চুক্তি হলে ভবিষ্যতে ইরান সামরিক হুমকির পরিবর্তে একটি বাণিজ্যিক প্রতিযোগী হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।
কয়েক বছর আগেও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে “বহুমেরু বিশ্ব”-এর স্বপ্ন বুনছিলেন অনেকে। আরব দেশগুলো বিশ্বাস করেছিল, তারা পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার বাইরে থেকে সবার সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে পারবে। কিন্তু এই যুদ্ধ সেই ধারণার ইতি টেনে দিয়েছে। বাস্তবে দেখা গেছে, ভালো হোক বা মন্দ, আমেরিকাই এখনও সব কিছুর কেন্দ্রে, বাকিরা প্রান্তে।